আমার ভুলের ফিরিস্তিগুলো মাঝে মাঝেই পড়ি আমি, যাতে আমার সমস্যার সমাধান করতে পারি।
আমার সব ঝামেলার জন্য আগে আমি অন্য সকলকে দোষী করতাম, কিন্তু যত বয়স হয়েছে জ্ঞান লাভ হয়েছে, আমি অনুধাবন করেছি সব দোষ আমার নিজেরই। বহু লোকই বয়স বাড়লে সেটা বুঝেছেন। যেমন নেপোলিয়ান সেন্ট হেলেনায় বলেছিলেন, আমায় পতনের জন্য অন্য কেউ নয় আমি নিজেই দায়ী। আমিই আমার সবচেয়ে বড় শত্রু–আমার এই দুর্ভাগ্যের কারণ আমিই!
আমি একজনের কথা শোনাব যিনি আত্মসমালোচনার শিল্পীই বলা যায়। তাঁর নাম এইচ পি। হাওয়েল। ১৯৪৪ সালে তার মৃত্যু সংবাদ বিদ্যুতের মতই ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি ছিলেন অর্থনীতির এক দিকপাল। অল্পস্বল্প শিক্ষাতেই তিনি বড় হন–সামান্য কেরানীর চাকরি করার পর একদিন হয়ে ওঠেন ইস্পাত শিল্পের বড় ম্যানেজার। তিনি ক্রমশঃ উন্নতি করেছিলেন। তাঁর সাফল্যের কারণ সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন, বহু বছর ধরেই আমি একখানা ডায়েরি রেখেছি যাতে থাকত কার কার সাথে দেখা হয়েছে। আমার বাড়ির লোকেরা শনিবার আমার জন্য কোন কাজ রাখত না, কারণ তারা জানত আমি শনিবার রাতে ভাবতে বসি সারা সপ্তাহ কি করেছি।
.
ডিনারের পর আমি খাতাটা খুলে বসি তারপর সোমবার সকাল থেকে কার কার সঙ্গে দেখা হয় ভাবতে থাকি। নিজেকে জিজ্ঞাসা করি : সারা সপ্তাহে কি কি ভুল করেছি? কোনটা ঠিক করেছি, আর কি করলে তা আরও ভালো হত? এ থেকে কি অভিজ্ঞতা লাভ করলাম? মাঝে মাঝে দেখেছি ওই সাপ্তাহিক সমালোচনায় বেশ অসুখী হতে হয়। মাঝে মাঝে নিজের বোকামিতে নিজেই অবাক হই। অবশ্য ক্রমে বোকামির মাত্রা কমে এসেছিল। এই আত্মবিশ্লেষণ আমায় সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে।
খুব সম্ভব হাওয়েল এই কৌশল বেন ফ্রাঙ্কলিনের কাছ থেকে ধার করেছিলেন। ফ্রাঙ্কলিন শুধু শনিবারের সন্ধের জন্য অপেক্ষা করতেন না। তিনি প্রতি রাত্রেই নিজেকে বেশ চাপকানি দিতেন। তিনি আবিষ্কার করনে তাঁর তিনটে মারাত্মক দোষ আছে। এক, সময় নষ্ট করা, দুই, সামান্য ব্যাপারে ঝামেলা করা, আর তিন, লোকের সঙ্গে তর্ক করা। বুদ্ধিমান বেন ফ্রাঙ্কলিন বুঝেছিলেন ওই ব্যাপারগুলো দূর করতে না পারলে বেশি এগোতে পারবেন না। তাই সপ্তাহের প্রতিদিন তিনি এই দোষ সংশোধনের চেষ্টা করতেন আর লিখে রাখতেন লড়াইয়ে কে জিতল। পরের সপ্তাহে অন্য দোষ নিয়ে একই রকম করতেন তিনি। ফ্রাঙ্কলিন এইভাবে দুবছর নিজের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যান।
আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই এদেশে তিনি হয়ে ওঠেন সবচেয়ে প্রিয় আর ক্ষমতাবান মানুষ।
এলবার্ট হাবার্ড বলেছিলেন : প্রত্যেক মানুষই দৈনিক অন্তত পাঁচ মিনিটের জন্য হয়ে যায় নেহাত বোকা।
সাধারণ মানুষ সামান্য সমালোচনাতেই ক্ষেপে ওঠে, কিন্তু বুদ্ধিমান ব্যক্তি; যারা তাঁর সমালোচনা করে তাদের কাছ থেকে কারণ জানতে চান। ওয়াল্ট হুইটম্যান এ সম্পর্কে বলেছেন : আপনি কি শুধু আপনার একান্ত অনুগতদের কথাই শুনেছেন? যারা আপনার অনুগত নয়, যাদের সরিয়ে দিয়েছেন, আপনার বিরুদ্ধবাদী করে তুলেছেন; তাদের কথাটায় কখনও কান দিয়েছেন?
শত্রুরা আমাদের সমালোচনা করার আগে আসুন আমরা নিজেদের সমালোচনা করি। আসুন আমরা নিজেদের সবচেয়ে বড় সমালোচনা হয়ে উঠি। আমাদের শত্রুরা কিছু বলার আগে আসুন নিজেদের ক্রটি সংশোধন করি। ঠিক তাই করেন চার্লস্ ডারউইন। পনেরো বছর ধরে তিনি আত্মসমালোচনা করেন। ব্যাপারটা এই রকম : ডারউইন যখন তাঁর অমর সাহিত্য কর্ম অরিজিন অব স্পেসিস–এর পাণ্ডুলিপি তৈরী করেন, তিনি বুঝেছিলেন বইটি সারা দুনিয়া তোলপাড় করে সেকালের ধর্ম আর বুদ্ধিবৃত্তির জগতকে নাড়া দেবে। তাই তিনি নিজেই নিজের সমালোচক হয়ে আরও পনেরো বছর ধরে তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম, উপসংহার ইত্যাদি যাচাই করলেন।
কেউ যদি আপনাকে নিরেট বোকা বলে বসে তাহলে কি করবেন? রেগে যাবেন? পাত্তা দেবেন না? লিঙ্কন যা করতেন তা এইরকম : লিঙ্কনের সামরিক সেক্রেটারি এডওয়ার্ড স্ট্যানটন লিঙ্কনকে একবার ‘নিরেট বোকা’ বলেন। স্ট্যানটন ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন যেহেতু লিঙ্কন স্ট্যানটনের কাজে মাথা গলাচ্ছিলেন। একজন স্বার্থপর রাজনীতিককে সন্তুষ্ট করার জন্য লিঙ্কন একবার কিন্তু সেনা–রেজিমেন্ট অন্যত্র সরানোর আদেশ দেন। স্ট্যানটন শুধু যে লিঙ্কনের আদেশই অমান্য করলেন তা নয় বললেন লিঙ্কন একটা নিরেট বোকা। এর ফলে কি হল? লিঙ্কনকে তখন স্ট্যানটন কি বলেছেন তা জানানো হল। লিঙ্কন শান্তভাবে বললেন : যদি স্ট্যানটন বলে থাকে আমি নিরেট বোকা, আমি নিশ্চয়ই তাই, কারণ ও বড় একটা ভুল করে না। আমি নিজেই একবার বুঝে নিতে চাই।
লিঙ্কন স্ট্যানটনের সঙ্গে দেখা করলেন। স্ট্যানটন তাকে বুঝিয়ে দেন আদেশটা যথার্থ হয়নি। লিঙ্কন তা প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। লিঙ্কন যখন দেখতেন সমালোচনাটা সাহায্যকারী তখন তিনি তার আন্তরিকভাবে বরণ করে নিতেন।
আমার বা আপনারও এরকম সমালোচনা গ্রহণ করা দরকার, চারবারের মধ্যে তিনবার সঠিক হলেও যেমন একবার ভুল হওয়ার সম্ভাবনা। ঠিক এই রকমই ভাবতেন থিয়োডোর রুজভেল্ট যখন হোয়াইট হাউসে ছিলেন। বর্তমানের সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ আইনষ্টাইনও স্বীকার করেছেন শতকরা নিরানব্বই ভাগ তিনি ভুল করতেন।
