পেছনে দিকে তাকালে এখন ভাবি সর্বস্ব হারিয়েছিলাম সেটা বোধহয় ভাগ্যের জন্যই–কারণ নদীর দিকে গিয়ে ঈশ্বরের উপর নির্ভর করতে শিখেছিলাম। আজ আমার শান্তি আর আত্মবিশ্বাস এতখানি যা কখনও পাব তা ভাবিনি।
ধর্মে বিশ্বাস কি করে এমন প্রশান্তি আর শক্তি আনতে পারে? এর উত্তর উইলিয়াম জেম্সই দিয়েছেন : উপরের ঝড়, ঢেউ সমুদ্রের তলায় পৌঁছয় না। যিনি বিশাল এবং চিরন্তন সত্য উপলব্ধি করেন। তার কাছে প্রতিটি সময়ের রূপান্তর প্রধান হয়ে উঠতে পারে না। প্রকৃত ধার্মিক অবিচল থাকেন আর শান্তভাবেই নিজের কাজ করে চলেন।
আমরা যদি উদ্বিগ্ন আর চিন্তান্বিত হই, তাহলে ঈশ্বরের দিকে ফিরি না কেন? ইমানুয়েল কান্ট যেমন বলেছেন : ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখুন–এ বিশ্বাস আমাদের প্রয়োজন। আসুন না বিশ্বচালক শক্তিতেই নিজেকে যুক্ত করি।
আপনি যদি স্বাভাবিকভাবে ধার্মিক নাও হন–যদি সন্দেহবাদীও হন, তাহলেও প্রার্থনা আপনাকে প্রভূত শক্তি দেবে–কারণ প্রার্থনা হল পরীক্ষিত সত্য। পরীক্ষিত সত্য মানে কি? যা বলতে চাই তা হল এই : প্রার্থনা মানুষের তিনটি মনস্তাত্বিক প্রয়োজন মেটাতে পারে, তারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করুন চাই না করুন।
সে তিনটি হল এই :
১। প্রার্থনার মধ্য দিয়ে আমাদের যা যন্ত্রণা তা কথায় প্রকাশ করা যায় কারণ স্পষ্ট না হলে এর সমাধান করা কঠিন। প্রার্থনা এমনই করতে হবে যাতে আমাদের সমস্যা যেন কাগজে লেখার মতই হয়। ঈশ্বরের কাছেও সাহায্য চাইলে তা কথায় প্রকাশ করা প্রয়োজন।
২। প্রার্থনার মধ্য দিয়ে আমরা ভাবতে পারি সমস্যাটি আমার একার নয়, তা ভাগ করে নিতে পারি। আমাদের মধ্যে অনেকেই এমন দৃঢ়চিত্ত নই যে, নিজেদের সমস্যার ভার একাকী বহন করতে পারব। আবার কখনও এমন সমস্যা ঘটে যা নিজেদের একান্ত আপনার জন বা আত্মীয়দেরও বলা যায় না। এক্ষেত্রে উত্তর হল প্রার্থনা। যে কোন মনস্তাত্বিকই বলবেন সমস্যায় কন্টকিত হয়ে আমরা শক্ত হয়ে পড়লে সে কথা কাউকে বললে ফল ভালোই হয়। যখন তা কাউকে বলতে পারি না তখনই বলা যায় ঈশ্বরকে।
৩। প্রার্থনা কাজ করতেও সাহায্য করে। কাজে নামার এটাই প্রথম ভাগ। আমার সন্দেহ আছে কেউ কোন কিছুর জন্য প্রার্থনা করলে তার পূরণ হয় না । ডঃ অ্যালেক্সি ক্যারেল সে কথাই বলেছেন, সবচেয়ে বড় শক্তি প্রার্থনার কালেই সৃষ্টি হয়। অতএব তাই করুন না কেন? ঈশ্বরই বলুন, আল্লাই বলুন বা যে কোন শক্তিই বলুন; নাম নিয়ে কলহ করে কি লাভ? যতক্ষণ ওই রহস্যময় শক্তি আমাদের সাহায্য করে? এবার বইটা বন্ধ করে শোবার ঘরে হাঁটু মুড়ে ঈশ্বরের কাছে নিজের মন মেলে ধরুন না কেন? যদি সব বিশ্বাস হারিয়ে থাকেন, তাহলে সর্ব শক্তিমান ঈশ্বরের কাছে সেটা ফিরে পেতে চান না কেন? সাতশো বছর আগে আসিসির সাধু ফ্রান্সিস লিখেছিলেন : হে ঈশ্বর, আমাকে শান্তির কাজে নিয়োজিত করুন। যেখানে ঘৃণা আছে, সেখানে আমায় ভালোবাসার জীব বপন করতে দিন। যেখানে আঘাত আছে, সেখানে মার্জনা করতে দিন। যেখানে সন্দেহ, সেখানে দিন বিশ্বাস। যেখানে হতাশা, সেখানে আসুক আশা। যেখানে অন্ধকার, সেখানে আসুক আলোক। হে পবিত্র প্রভু, আমি সান্ত্বনা চাই না–সান্ত্বনা দিতে চাই–ভালোবাসা চাই না, ভালোবাসতে চাই–ক্ষমা করলেই যেহেতু ক্ষমা পাওয়া যায়, তাই মত্যর মধ্যেই ফিরে পাই অনন্ত জীবন।
২০. মনে রাখবেন মরা কুকুরকে কেউ লাথি মারে না
১৯২৯ সালে এমন একটা ব্যাপার ঘটে যার ফলে শিক্ষাবিদ মহলে বেশ একটা জাতীয় আলোড়ন ঘটে যায়। সারা আমেরিকার শিক্ষিত মানুষ ব্যাপারটা দেখার জন্যেই ছুটে যান শিকাগোয়। কয়েক বছর আগে রবার্ট হাচিনসন নামে এক তরুণ ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বেরিয়েছিলেন। এই সময় তিনি ওয়েটার, কাঠুরে, শিক্ষক, কাপড়েরর ফেরিওয়ালা হিসেবেই কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছিলেন। এরপর এখন মাত্র আট বছর পরে, তাঁকেই আমেরিকার চতুর্থ অর্থশালী বিশ্ববিদ্যালয় শিকাগোর প্রেসিডেন্ট পদে বরণ করা হয়েছিলো। তার বয়স? মাত্র ত্রিশ। ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য। অন্যান্য শিক্ষাবিদরা মাথা ঝাঁকাতে চাইলেন। পাহাড় গড়িয়ে পড়া পাথরের স্রোতের মতোই সমালোচনার ঝড় বয়ে গেলো। সকলে নানা ভাবে তার সমালোচনা করে বলতে লাগলেন ‘সে এ–নয়’ ‘তা নয়’ এইসব–তার বয়স বড় কম, অভিজ্ঞতা নেই–শিক্ষার ব্যাপারে তার ধারণা বাঁকা পথে চলে। এমন কি খবরের কাগজগুলো পর্যন্ত সকলের সুরে সুর মেলালো।
তাকে যেদিন প্রেসিডেন্ট পদে বরণ করা হয় সেদিনই হাচিনসনের বাবা রবার্ট মেসার্ড হাচিনসনকে তার এক বন্ধু বললেন, আজ সকালে খবরের কাগজের সম্পাদকীয়তে তোমার ছেলের বিরুদ্ধে বিষোদগার দেখে আমার অত্যন্ত খারাপ লেগেছে।
হ্যাঁ, হাচিনসনের বাবা জবাব দিলেন। খুবই কড়া সমালোচনা, তবে মনে রেখো কেউ মরা কুকুরকে লাথি মারে না।
কথাটা সত্যি। কুকুর যতো নামী হয়, ততই আবার লোকে তাকে লাথি মেরে মানসিক আনন্দ পায় । প্রিন্স অব ওয়েলস, যিনি পরে অষ্টম এডওয়ার্ড হন (এখন ডিউক অব উইন্ডসর) বেশ ভালো রকম লাথি হজম করার কথাটা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি তখন ডেভিনসায়ারে ডার্টমুখ কলেজে শিক্ষা নিচ্ছিলেন। এই কলেজ আনাপেলিনের নৌ অ্যাকাডেমীরই সমতুল্য। প্রিন্সের বয়স তখন প্রায় চৌদ্দ। একদিন জনৈক নৌ–অফিসার তাকে কাঁদতে দেখে তার কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। প্রথমে প্রিন্স কথাটা বলতে চাননি, পরে সত্যি কথাটা বলে ফেললেন। তাকে মৌ–শিক্ষার্থীরা লাথি মেরেছিলো। কলেজের কমোডোর সমস্ত ছেলেদের ডাকলেন। তারপর তাদের তিনি বললেন যে প্রিন্স কোন অভিযোগ করনে নি, তাসত্ত্বেও তিনি জানতে চান তাঁকে এরকম কড় ব্যবহারের জন্য বেছে নেওয়া হলো কেন?
