‘পুরুষ মানুষ’ জেনারেল মার্ক ক্লার্ক আমাকে বলেছিলেন যুদ্ধের সময় তিনি রোজই হট মডেল প্রার্থনা করতেন। এই রকমই করতেন জেনারেল চিয়াং কাইশেক আর জেনারেল মন্টগোমারী –এল অ্যালামিনের মন্টি। ট্রাফলগারের যুদ্ধে লর্ড নেলসন ঠিক এমনই করতেন। এই ভাবেই করেছিলেন জেনারেল ওয়াশিংটন, রবার্ট ই. লী. স্টোনওয়াল, জ্যাকসন এবং আরও অসংখ্য বিখ্যাত সেনাপতিরা।
এই সব ‘পুরুষরা’ উইলিয়াম জেমসের কথার সারমর্ম আবিষ্কার করেছিলেন : ঈশ্বর আর আমাদের কাজ একই সঙ্গে, আর এই উপলব্ধির মধ্য দিয়ে আমরা তার অনুগত থাকলেই আমাদের মনস্কামনা পূর্ণ হয়।
বহু পুরুষই আজ বেশি করে ধর্মের দিকে ঝুঁকছেন। তেমনই ঝুঁকছেন বিজ্ঞানীরাও। যেমন ধরুন বিজ্ঞানী ডঃ ক্যারেল রিডার্স ডাইজেস্টে এক প্রবন্ধে লেখেন : প্রার্থনার মধ্য দিয়েই একজন মানুষ বিরাট শক্তি তৈরি করতে পারে। এ এমন এক শক্তি যা মহাজাগতিক শক্তির মতই বাস্তব। একজন চিকিৎসক হিসেবে আমরা দেখেছি যখন অন্য সব চিকিৎসা ব্যর্থ হয় তখন প্রার্থনার শক্তিই সব কিছু ঠিক করে দেয়…প্রার্থনা রেডিয়ামের মতই আলোকময়, স্বতনিঃসরিত এক শক্তি…। প্রার্থনার মধ্য দিয়ে মানুষ তাদের সীমিত শক্তি দিয়ে অসীম শক্তিকে ডেকে তাদের শক্তি বাড়ায়। যখন আমরা প্রার্থনা করি যেন ওই শক্তির কিছুটা আমরা পাই…। আমরা যখন ঈশ্বরকে একাগ্রতায় প্রার্থনা জানাই তখন আমরা দেহ মনকে আরও ভালো করে তুলি। এটা কখনই হয় না যে কেউ এক মুহূর্ত প্রার্থনা করলেন অথচ কোন ভালো ফল পেলেন না।
অ্যাডমিরাল বার্ড জানেন আমাদের বিশ্ব নিয়ন্ত্রক শক্তির সঙ্গে সংযোগ কথাটার অর্থ কি? এটা করার ক্ষমতাই তাঁকে তাঁর জীবনের কঠিনতম পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করে। তিনি একাকী নামে লেখা বইতে সেকথা বলেছেন। ১৯৩৪ সালে তিনি পাঁচ মাস দক্ষিণ মেরুর বরফ স্তূপে ডুবে থাকা একটা তাবুতে বন ব্যারিয়ারে বাস করেছিলেন । ৭৮ ডিগ্রী দ্রাঘিমায় তিনিই ছিলেন একমাত্র জীবিত প্রাণী। তার ছাউনির উপর বয়ে যেত তুষার ঝড়–ঠাণ্ডা সেখানে শূন্যের ৮২ ডিগ্রীর নিচে। সমস্ত সময় ঘিরে থাকতো অন্ধকার। আচমকা একদিন তিনি সভয়ে আবিষ্কার করলেন তাঁর স্টোভ থেকে কার্বন মনক্সাইড বেরিয়ে তাঁকে তিলে মারতে চলেছে। তিনি কি করতে পারেন? কাছাকাছি সাহায্য রয়েছে ১২৪ মাইল দূরে–কয়েক মাসেও হয়তো তারা আসতে পারবে না। তিনি স্টোভ সারাতে চেষ্টা করলেন কিন্তু তবু গ্যাস বেরোতে লাগল। তাতে মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে যেতেন। খেতে পারতেন না, ঘুমোতে পারতেন না। তিনি এতই দুর্বল হয়ে পড়লেন যে বাঙ্ক ছেড়ে বেরোতে পারতেন না। তার প্রায়ই ভয় হত সকাল অবধি হয়তো বাঁচবেন না। তিনি নিশ্চিত ছিলেন এই কেবিনেই তাঁর মৃত্যু ঘটবে আর অনন্ত তুষার তাকে ঢেকে রাখবে।
তাঁর জীবন রক্ষা হল কিভাবে? হতাশার মাঝখানে একদিন তিনি তাঁর ডায়েরী নিয়ে তাঁর জীবনদর্শন লিখতে চাইলেন । তিনি লিখলেন, মানুষ পৃথিবীতে একা নয়। তিনি ভাবছিলেন মাথার উপরে রাশি রাশি তারার কথা, আর সূর্যের কথা যা মেরুকেও আলোকিত করে। তাই তিনি লেখেন, আমি একা নই।
তিনি যে একা নন এই চিন্তাটাই রিচার্ড বার্ডকে বাঁচিয়ে দেয়। তিনি তাই লিখেছিলেন, আমি জানি এর ফলেই আমি রক্ষা পাই। খুব কম লোকেই তাদের সমস্ত শক্তি ব্যবহার করেন। মানুষের মধ্যে এমন বহু শক্তির কুয়ো আছে যা ব্যবহৃত হয় না। অ্যাডমিরাল বার্ড সেই কুয়োই ব্যবহার করেন শক্তির জন্য–ঈশ্বরের দিকে ফিরে প্রার্থনা করে।
ইলিনয়ের শস্যক্ষেত্রে ঠিক এটাই বার্ডের মতই আবিষ্কার করেন গ্লেন এ আর্নল্ড । তিনি একজন। বীমার দালাল। তিনি আমায় লিখেছিলেন, আট বছর আগে আমি আমার বাইরের দরজায় তালা লাগিয়ে বেরোই–ভেবেছিলাম সেটাই আমার শেষ যাওয়া। তারপর গাড়িতে উঠে নদীর দিকে চলোম । আমি এক ব্যর্থ মানুষ। গত এক মাসে সারা পৃথিবীই যেন আমার ঘাড়ে ভেঙে পড়েছিল। আমার বৈদ্যুতিক জিনিসের ব্যবসা ধ্বংস হয়ে যায়। বাড়িতে আমার মা মৃত্যু শয্যায়। আমার স্ত্রী সন্তান সম্ভবা। ডাক্তারের পাওনা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। আমাদের নিজস্ব গাড়ী, আসবাব পত্র ইত্যাদি যা কিছু ছিল তা বা দিয়েছিলাম। বীমার পলিসি থেকেও ধার নিলাম এরপর সব আশাই শেষ । আমার আর সহ্য হল না–তাই ঠিক করলাম গাড়িতে চড়ে নদীর জলেই সব দুঃখ শেষ করে দেব। কিছুক্ষণ গ্রাম্য পথে ঘরলাম তারপর এক জায়গায় শিশুর মত কান্নায় ভেঙে পড়লাম। তারপরেই ভাবতে বসলাম। সত্যিই আমার অবস্থা কতটা খারাপ? আরও খারাপ তো হতে পারতো। সত্যিই কি আশাহীন? এ অবস্থা ভালো করতে আর কি করতে পারি?
তখনই ঠিক করলাম সমস্ত কিছু ঈশ্বরের কাছে নিবেদন করব আর তারই সাহায্য চাইব। আমি প্রার্থনা করতে লাগলাম। এমনভাবে প্রার্থনা করতে লাগলাম যেন এর উপরেই আমার জীবন নির্ভর করছে। হঠাৎই মনে অদ্ভুত শান্তি নেমে এল, গত এক মাসে যা ছিল না। কত ঘণ্টা সেখানে ছিলাম জানিনা–তারপর বাড়ি ফিরে শিশুর মতো ঘুমোলাম।
পরদিন আত্মবিশ্বাস নিয়েই জেগে উঠলাম। আর কিছুতেই আমার ভয় নেই আমি পথ প্রদর্শনের জন্য ঈশ্বরের কাছেই আত্মসমর্পণ করেছি। এরপর প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস নিয়ে যে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের দোকানে চাকরির আবেদন করেছি সেখানে ঢুকলাম। আমি জানতাম চাকরিটা পাবই, পেলামও। যুদ্ধের সময়, ওই ব্যবসা নষ্ট না হওয়া পর্যন্ত তাই করলাম। তারপর বীমার কাজ নিলাম–ঈশ্বর তখনও আমার পরিচালক। আমার সব দেনা শোধ করেছি, তিনটি সন্তানসহ আমার সুখের সংসার এখন। আমার নিজের বাড়ি হয়েছে, নতুন গাড়িও হয়েছে আর আছে পঁচিশ হাজার ডলারের বীমা।
