দুদিন পরে বোস্টন হেরাল্ডের প্রকাশক ডঃ বি কে একটা চিঠি লিখেছিলেন। ডঃ বি–চিঠিখানা আমার ক্লাসে যোগদান করে আমাকে দেন। ডঃ বি-সেটা প্রায় ত্রিশ বছর রেখেছিলেন। সেটা এই কাহিনী লেখার সময় আমার সামনেই রয়েছে। এই চিঠির তারিখ হলো ১৩ই অক্টোবর ১৯০৪।
এ. বি. এইচ–, এম. ডি.
বোস্টন, মাস।
প্রিয় মহাশয়,
আপনার এ মাসের ১১ তারিখের চিঠির জন্যে আমি অত্যন্ত বাধিত। আপনি সম্পাদককে চিঠিটি লিখলেও আমিই জবাব দিচ্ছি। এই কাগজের তত্ত্বাবধানে থাকার পর থেকেই একটি সিদ্ধান্ত নেবার কথা আমাকে চিন্তা করতে হচ্ছিল।
সোমবার থেকে দি বোস্টন হেরাল্ডে সবরকম আপত্তিকর বিজ্ঞাপন প্রকাশ না করার যথাসাধ্য চেষ্টা করা হবে। কোন রকম বাজে ডাক্তারি বিজ্ঞাপন আর কোন ভাবেই প্রকাশ করা হবে না। যে সব বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হবে তা সংশোধন ও পরীক্ষা করেই ছাপা হবে।
আবার আপনাকে আপনার চিঠির জন্য ধন্যবাদ জানাই। এ চিঠি আমাদের নানাভাবে সাহায্য করেছে।
আপনার বিশ্বস্ত,
ড. এ. ন্যাসকেল
প্রকাশক।
.
ঈশপ ছিলেন একজন গ্রীক ক্রীতদাস। তিনি ক্রোসাসের রাজসভায় থেকে খ্রীষ্টের জন্মের প্রায় ৬০০ বছর আগে অমর কিছু নীতি গল্প লিখেছিলেন। তা সত্ত্বেও যে সত্য তিনি মানব চরিত্র সম্পর্কে লিখে গেছেন তা আজ এথেন্সের ২৫ শতক পরেও বোস্টন বা বার্মিংহামের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সূর্য ঢের বেশি তাড়াতাড়ি আপনার কোট খুলে নিতে পারে–তেমনই আবার দয়ার্দ্রতা, বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার বা প্রশংসা ও অন্যান্য যে কোন উপায়ের চেয়ে ঢের দ্রুত কাজ করে মানুষের মন পরিবর্তন করতে পারে।
লিঙ্কন কি বলেছিলেন মনে রাখবেন : ‘এক ফোঁটা মধু এক গ্যালন তেতো জিনিসের চেয়ে বেশি মাছিকে আকর্ষণ করে।’
যখন মানুষকে নিজের মতে আনতে চাইবেন তখন চার নম্বর নীতিটি ভুলবেন না :
‘বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার দিয়েই শুরু করবেন।‘
১৪. সক্রেটিসের রহস্য
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ
সক্রেটিসের রহস্য
মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা বলার সময় যে সব ব্যাপারে আপনার মতের মিল হবে না কখনই সেইরকম কিছু দিয়ে শুরু করবেন না। প্রথমেই যে বিষয়ে আপনার মতের মিল হয় তা দিয়েই আরম্ভ করে বার বার সেটাই বলতে থাকুন বারবার জানান মোটামুটি সব ব্যাপারই আপনাদের মত একুই, শুধু উপায় সম্বন্ধে দ্বিমত থাকতে পারে।
অন্য লোকটিকে গোড়াতেই ‘হ্যাঁ’ বলতে দিন। যতদূর সম্ভব তাকে ‘না’ বলতে দেবেন না।
এ ব্যাপারে অধ্যাপক ওভারস্ট্রীট তার বই ‘ইনফ্লুয়েন্সিং হিউম্যান বিহেভিয়ার’-এ বলেছেন যে, ‘না’ কথাটা একবার বললে তাকে কাটানো কঠিন কাজ। কোন লোক না বললে তার সব আত্ম অহমিকাই তাকে ওটাই আঁকড়ে থাকতে বলে। সে হয়তো পরে বুঝতে পারে ‘না’ বলাটা ঠিক হয়নি। তা সত্ত্বেও তার অহমিকাই তাকে তার মত বদলাতে দেয় না। একবার কিছু বললে সে সেটাই আঁকড়ে থাকতে চায়। তাই এটা অত্যন্ত জরুরী যে আমরা কাউকে সায় দেয়াতে পারলেই ভাল।
যারা দক্ষ বক্তা তারা গোড়াতেই বার কযেক ‘হ্যাঁ’ বলাতে পারেন। তিনি এতে তাঁর শ্রোতাদের মানসিক দিক থেকে স্বমতে আনার পথেই নিয়ে আসেন। এটা অনেকটা বিলিয়ার্ড বলের মত। বলটাকে জোরে ধাক্কা মারুন। সেটা একদিকে ধাক্কা খেয়ে সহজেই বিপরীত দিকে চলে যায়।
এতে মনস্তাত্বিক ব্যাপারটা সহজেই বোঝা যায়। কোন লোক যখন ‘না’ বলে, সে ওই ছোট্ট কথাটার চেয়ে অনেক বেশি কিছুই করে। তার সমস্ত শারীরিক যন্ত্রই, স্নায়ু, পেশী–সব কিছুই বাতিল করতে তৈরী থাকে। সাধারণতঃ ক্ষুদ্র হলেও শারীরিক যেসব পরিবর্তন হয় তার কিছু প্রকাশ প্রত্যক্ষও করা যায়। শরীরের সমস্ত রকম অনুভূতিই বাধা দিতে যেন তৈরি হয়ে যায়। অন্যদিকে কেউ ‘হ্যাঁ’ বললে ওই বাধা দেবার ব্যাপারটার অস্তিত্বই থাকে না। সমস্তই শরীরের কোষগুলো গ্রহণ করার জন্য এগুতে চায়। তাই গোড়াতেই ‘হ্যাঁ’ বললে আমরা সহজেই অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেও সফল হতে পারি।
এই ব্যাপারটা–অর্থাৎ এই হ্যাঁ বলা কৌশল খুবই সহজ ব্যাপার। অথচ এটাকে কতটাই বা অবজ্ঞা করা হয়। এতে যেন মনে হয় মানুষ গোড়াতেই যেন অন্যকে ক্রুদ্ধ করে নিজের গুরুত্ব প্রমান করার প্রয়াসী। বিপ্লবীদের সঙ্গে রক্ষণশীলদের কথাবর্তায় গোড়াতেই তারা একে অন্যকে চটিয়ে দেয়। এতে কি ভালো কাজ সমাধা হতে পারে? যদি অবশ্য কিছুটা আনন্দ উপভোগের জন্য করতে চান তাহলে আলাদা কথা। কিন্তু সে যদি এটা করে কিছু করতে চায় তাহলে তাকে মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে একেবারে মূর্খই বলতে হয়!
কোন ছাত্র, ক্রেতা, শিশু, স্বামী বা স্ত্রীকে গোড়াতেই ‘না’ বলতে দিন, দেখবেন হাজার ধৈর্য বা অধ্যবসায়তেও তাকে আর নিজের মতাবলম্বী করতে পারবেন না।
এই ‘হ্যাঁ হ্যাঁ বলার কৌশলে নিউইয়র্কের গ্রীনউইচ সেভিংস ব্যাঙ্কের জেমস এভারসন একজন বিখ্যাত মক্কেলকে হারাতে হারাতে আবার স্বমতে এনেছিলেন।
ঐ ভদ্রলোক ব্যাঙ্কে একটা অ্যাকাউন্ট খুলতে এসেছিলেন। মিঃ এভারসন লিখেছিলেন, আমি তাকে একটা ফরম ভর্তি করতে দিয়েছিলাম। কোন কোন প্রশ্নের তিনি আনন্দেই উত্তর লিখলেন, তবে কয়েকটার উত্তর তিনি কিছুতেই দিতে রাজি হলেন না।
মানবিক সম্পর্ক নিয়ে পড়াশোনা আরম্ভ করার আগে, আমি হয়তো বলতাম যে তিনি যদি ব্যাঙ্ককে এইসব জবাব না দেন তাহলে তার অ্যাকাউন্ট খুলতে আমরা অপারগ। আমি বলতে লজ্জা পাচ্ছি অতীতে এই কাজই আমি করেছি। স্বভাবতই ওই রকম শেষ কথা বলে আমি বেশ আনন্দ পেতাম। আমি তাদের দেখাতাম আসল কর্তা কে আর ব্যাঙ্কের নিয়ম বদলানো যাবে না। কিন্তু ওই ধরনের মনোভাবকে নিশ্চয়ই যে আমাদের সাহায্য করতে চায় সে গ্রহণ করবে না।
