সব মেঘ কেটে গেল। হাসলো এমিল, তারপর বললো সঠিক বলেছেন, মাদাম। গণ্ডগোলটা হয় রান্নাঘরে। এটা আমার দোষ নয়।
অতএব আমি বললাম, আমি অন্য এক পার্টির ব্যবস্থা করেছি, এমিল আমার ইচ্ছা তুমিই আমায় সাহায্য করো। আমি তোমার পরামর্শ চাই। তোমার কি মনে হয় ওই রান্নাঘরে আবার রান্না করতে দেব?’
‘ওহ্ নিশ্চয়ই, মাদাম, অবশ্যই। এরকম ভুল আর হবে না।’
পরের সপ্তাহে আমি আবার একটা মধ্যাহ্নভোজ দিই। এমিল আর আমি মেনু ঠিক করি। আমি আগের ভুলের একবারও উল্লেখ করিনি।
আমরা যখন উপস্থিত হলাম, দেখলাম খাবার টেবিলে দু ডজন চমৎকার লাল আমেরিকান গোলাপ ফুল রাখা আছে। সারাক্ষণই হাজির রইল এমিল। কুইন মেরী অথবা কাল-মহারাণীকে অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করলেও সে বোধহয় এর চেয়ে বেশি যত্ন করতে পারত না। খাবারগুলো যেমন সুস্বাদু আর তেমনই গরম ছিল। পরিবেশনও চমৎকার। একজনের বদলে চারজন পরিবেশন করছিল। শেষ কালে এমিল নিজে আইসক্রীম পরিবেশন করল।
বিদায় নেবার সময় আমার নানা অতিথি বললেন, আপনি কি ওই পাঁচককে বশ করেছেন? এমন চমৎকার পরিবেশন আর যহ তিনি আগে কখনও দেখেন নি।
.
তিনি ঠিকই বলেছিলেন। আমি তাকে বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার আর আন্তরিক প্রশংসা দিয়েই বশ করি।
অনেকদিন আগে আমি যখন খালি পায়ে গ্রামের স্কুলে যাওয়ার সময় মিসৌরীর উত্তর পশ্চিমের কোন জঙ্গল পার হতাম তখন সূর্য আর বাতাসের একটা নীতিগল্প পড়েছিলাম। তারা ঝগড়া করছিল দুজনের মধ্যে কার শক্তি বেশি তাই নিয়ে। বাতাস বলল, আমি প্রমাণ করতে পারি আমারই জোর বেশি। ওই কোট গায়ে বুড়ো লোকটিকে দেখছ। আমি বাজী রাখতে পারি তোমার চেয়ে তাড়াতাড়িই আমি ওর গায়ের কোট খোলাতে পারি।
সূর্য তখন মেঘের আড়ালে সরে গেল আর বাতাস এমন প্রচণ্ড বেগে বইতে লাগল যেন প্রচণ্ড ঝড় উঠেছে। কিন্তু বাতাস যতই জোরে বইতে শুরু করল বুড়ো লোকটি তার কোট ততই চেপে রাখতে চাইল।
শেষ পর্যন্ত বাতাস হতাশ হয়েই হাল ছেড়ে দিল। সূর্য তখন মেঘের আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে এসে দয়ার্দ্র ভঙ্গিতে লোকিটর দিকে তাকিয়ে হাসলো। লোকটি তার কপাল মুছে নিয়ে গায়ের কোট খুলে ফেলল। সূর্য তখন বাতাসকে বলল তা আর দয়ার্দুভাবই ক্রোধ আর শক্তির চেয়ে বেশি ক্ষমতাশালী।
এই নীতিগল্প পড়ার সময় আমি ছেলেমানুষ থাকলেও এর সত্যতা বহুদূরের বোস্টন শহরে প্রমাণিত হয়ে চলেছিল। সংস্কৃতি আর শিক্ষার প্রাচীন যে জায়গাটা আমি স্বপ্নেও কোনদিন দেখব বলে ভাবিনি। এটা বোস্টনে হাতে কলমে দেখাচ্ছিলেন ড. এ. এইচ. বি। তিনি ছিলেন নামকরা একজন চিকিৎসক, ত্রিশ বছর পরে তিনি আমার ছাত্র হয়েছিলেন। এখানে ড. বি-এর বলা কাহিনী শোনাচ্ছি।
বোস্টনে সে সময় সংবাদপত্রে নানা ধরনের বাজে ডাক্তারী বিজ্ঞাপন প্রচুর পরিমাণে ছাপা হত। এইসব বিজ্ঞাপনে মানুষের নানা গোপন রোগ সারানোর কথা ফলাও করে লিখত আর তাদের আহ্বান জানাত। তারা পুরুষত্ব হারাবার ভয় দেখিয়ে আতঙ্কিত করত। তাদের চিকিৎসার পদ্ধতিই ছিল রোগীকে ভীত করে তোলা আর আসলে কোন রকম চিকিৎসাই না করা। এর ফলে বহু লোক মারাও যায়, কিন্তু এজন্য শাস্তি তেমন দেওয়া যায়নি। বেশির ভাগই সামান্য জরিমানা দিয়ে বা রাজনৈতিক প্রভাব খাঁটিয়ে ছাড়া পেয়ে যায়।
অবস্থাটা এমনই গুরুতর পর্যায়ে নেমে আসে যে বোস্টনের সৎ লোকজন একসঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। গির্জায় পাদ্রীরা বক্তৃতা দিতে আরম্ভ করলেন, খবরের কাগজের বিরুদ্ধেও বলে ঈশ্বরকে কাতর প্রার্থনা জানাতে লাগলেন। নাগরিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, মহিলা সমিতি, গির্জা, তরুণদের ক্লাব–সবাই এর বিরুদ্ধে কোন আইন প্রণয়ন সম্ভব হলো না, রাজনৈতিক চাপের ফলে। ডঃ বি-তখন ছিলেন বোস্টনের সৎ নাগরিক সমিতির চেয়ারম্যান। তাঁর সমিতি সব রকম চেষ্টাই করেছিল। এটা ব্যর্থ হয়। ওইসব ডাক্তার অপরাধীদের বিরুদ্ধে সব লড়াই-ই হতাশ বলেই মনে হতে থাকে।
তখন এক রাতে, প্রায় মাঝরাতের পর ডঃ বি–এমন কিছু করতে চাইলেন যা বোস্টনে আগে কেউ কখনও ভাবেনি। তিনি দয়ালুভাব, সহানুভূতি, আর প্রশংসা দিয়ে কাজ করতে চেষ্টা করলেন। তিনি চেষ্টা করলেন যাতে প্রকাশকরা ওই বিজ্ঞাপন প্রকাশ স্থগিত রাখতে চায়। তিনি ‘দি বোস্টন হেরাল্ডে’র সম্পাদককে লিখলেন, কাগজটা তিনি কত ভালবাসেন। তিনি বরাবর এটাই পড়ে এসেছেন, খবরের অংশগুলি পরিচ্ছন্ন, উত্তেজনার ব্যাপারে থাকে না, সম্পাদকীয় তো চমৎকার। কাগজটি পরিবারে পক্ষে আদর্শ। ডঃ বি-জানান যে তাঁর মতে কাগজটি নিউ ইংল্যাণ্ড আর এমন কি আমেরিকার মধ্যেও শ্রেষ্ঠ। তিনি লেখেন, ‘আমার এক বন্ধুর একটি অল্প বয়সের মেয়ে আছে। সে সেদিন একটা বিজ্ঞাপন জোরে জোরে পড়ে তার কিছু অর্থ জানতে চায়! সত্যিই আমার বন্ধুটি একটু বিহ্বল হয়ে পড়েন, কি বলবেন বুঝতে পারেন না। আপনাদের কাগজ বোস্টনের সেরা পরিবারেই যায়। আমার একজন বন্ধুর পরিবারেই যদি এইরকম ঘটে তাহলে আরও কত বাড়িতে যে ঘটছে কে জানে? আপনার যদি কোন অল্পবয়সী মেয়ে থাকে তাহলে কি চাইবেন সে ওই পড় ক? আর পড়ে সে ওই রকম প্রশ্ন করলে কি উত্তর দেবেন?
আমি দুঃখিত যে আপনাদের এমন সুন্দর কাগজ-সবদিক দিয়েই যা আদর্শ–তাতে দেওয়া এমন বিজ্ঞাপন দেখে সবাই আতঙ্কিত। এটাও কি সম্ভব নয় আমার মত আরও পাঠক একই ভয় পাচ্ছেন?’
