প্রেসিডেন্ট ব্ল্যাকের ওই বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহারের ফলে যা হয় তাই হয়েছিল–তাতে অনেকেই তাঁর বন্ধু হয়ে পড়ে। এরপরেই ধর্মঘটীরা ঝাঁটা, বুরুশ এনে কারখানা সাফাই করতে শুরু করলো। একবার ব্যাপারটা ভাবুন! ধর্মঘটীরা বেশি মাইনে আর ইউনিয়নের স্বীকৃতি দাবী করেও কারখানা সাফাই শুরু করেছে। আমেরিকার শ্রমিক ধর্মঘটের ইতিহাসে এমন ব্যাপার আর কোনদিনই শোনা যায়নি। এক সপ্তাহের মধ্যেই মিটমাট হয়ে সব ঝামেলা দূর হলো–কোনরকম মনোমালিন্য বা বিদ্বেষ ছাড়াই এটা হয়।
ড্যানিয়েল ওয়েবস্টার, যিনি দেবতার মত সুপুরুষ ছিলেন আর জিহোভার মতই কথা বলতেন, তিনি ছিলেন একজন অতি বিখ্যাত আর সফল আইনবিদ। তা সত্ত্বেও তিনি সওয়াল করতেন এই রকম বন্ধুত্বপূর্ণ পথে : ‘এটা জুরীদের বিচার করে দেখতে হবে, অথবা ‘ভদ্রমহোদয়েরা এই ব্যাপারটি ভেবে দেখলে বোধহয় ভাল হয়, বা এই ব্যাপারগুলি আশাকরি আপনাদের খেয়াল থাকবে’, বা আপনাদের মনুষ্যচরিত্র সম্পর্কে জ্ঞানের জন্যে নিশ্চয়ই এই ঘটনাগুলির গুরুত্ব অনুধাবন করবেন। কোনরকম জোর বা চাপ দিয়ে নয়। নিজের মতামত কোনবারেই তিনি অপরের উপর চাপিয়ে দিতে চাননি। ওয়েবস্টার কাজে লাগান তাঁর শান্ত, বন্ধুত্বপূর্ণ ভঙ্গীকেই, আর তাই তাঁকে খ্যাতিমান হয়ে উঠতে সাহায্য করে।
আপনাকে কখনও হয়তো কোন ধর্মঘট মীমাংসার জন্য বা কোন জুরীকে কিছু বোঝানোর জন্য যেতে হবে না, তবে আপনি হয়তো আপনার বাড়িভাড়া কমাতে চাইতে পারেন। তাতে কি এই বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার কাজে আসবে? আসুন সেটাই একবার দেখা যাক।
ও. এল. ঐব একজন ইঞ্জিনিয়ার। তিনি তাঁর ভাড়া কমাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর বেশ ভালোমতই জানা ছিল তাঁর বাড়িওয়ালাটি বেশ পোড় খাওয়া মানুষ। মিঃ ঐব লিখেছিলেন যে কথা তিনি আমার প্লানে বলেন, আমি তাঁকে লিখেছিলাম যে আমার লীজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমার এ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে দেব। আসল সত্যটা হল আমি ছাড়তে ইচ্ছুক ছিলাম না। ভাড়া যদি কমানো যায়। আমি থেকে যেতেই চাইছিলাম। তবে অবস্থাটা নিরাশব্যঞ্জকই ছিল। বাকি ভাড়াটিয়ারা চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। প্রত্যেকেই আমায় জানায় যে ওই মালিকের সঙ্গে কথা বলাই শক্ত। কিন্তু আমি নিজেকে বললাম : ‘আমি মানুষের সঙ্গে ব্যবহারের কৌশল শিখেছি, ব্যাপারটা ওঁরই উপর কাজে লাগাতে চেষ্টা করব। দেখতে হবে ফল কি হয়।
তিনি আর তার সেক্রেটারি আমার চিঠি পেয়েই দেখা করতে এলেন। আমি তাদের চার্লি শোয়াবের কায়দাতেই দরজার সামনে অভ্যর্থনা জানালাম। বলতে গেলে তাদের অভ্যর্থনার জোয়ারে ভাসিয়ে দিলাম। আমি একবারও বললাম না ভাড়া বড় বেশি। আমি শুরু করলাম তাঁর বাড়িটা কত আরামের এই কথা বলেই। বিশ্বাস করুন আমি সহৃদয়তার সঙ্গে আন্তরিক প্রশংসা করলাম, বাড়িটা তিনি যেভাবে রেখেছেন তার প্রশংসাও করলাম। আমি বললাম আরও একবছর আমার থাকার ইচ্ছে ছিল কিন্তু আমার সামর্থ্য নেই।
‘কোন ভাড়াটের কাছ থেকে এমন অভ্যর্থনা পাবেন তিনি মোটেও আশা করেন নি। একজন চৌদ্দটা চিঠি লিখেছিল। তার কয়েকটা আবার রীতিমত অপমানজনক। আর একজন লিখেছিলেন লীজ ছেড়ে দেবেন তিনি যদি না উপরের তলায় ভাড়াটিয়ার নাক ডাকা বন্ধ না করতে পারেন। আপনার মত ভদ্র ভাড়াটে পাওয়া অত্যন্ত আনন্দের’ ভদ্রলোক বললেন। এরপর আমি না চাইতেই তিনি আমার ভাড়া কিছুটা কমিয়ে দিলেন। আমি আরও চাইছিলাম, তাই একটা টাকার অঙ্ক বলতেই তিনি বিনা প্রতিবাদে তা মেনে নিলেন।
তিনি বিদায় নেবার সময় হঠাৎ ফিরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার ঘর কি রকম সাজালে ভালো হয়?
আমি যদি অন্য ভাড়াটেদের কৌশলে ভাড়া কমাবার চেষ্টা করতাম, তাহলে আমি নিশ্চিত যে অন্যরা যেমন ব্যর্থ হয়েছেন আমিও তাই হতাম। আমার নির্দিষ্ট ওই বন্ধুত্বপূর্ণ, সহানুভূতিসম্পন্ন, প্রশংসাময় কথার জন্যেই জয়ী হলাম।
আর একটা উদাহরণ দিচ্ছি। এবার একজন মহিলার ব্যাপার। তিনি লঙ আইল্যাণ্ডের গার্ডেন সিটির নামী সামাজিক এক মহিলা, নাম মিসেস ডরোথী ডে।
মিসেস ডে লিখেছিলেন, ‘আমি সম্প্রতি কিছু বন্ধুকে এক ভোজসভায় নিমন্ত্রণ করি। কাজটা আমার পক্ষে খুবই জরুরী ছিল। আমি সব কিছু ভালভাবে মিটুক তাই চাইছিলাম। তাই নামকরা হোটেলের প্রধান পাঁচক এমিলকেই আমায় সাহায্য করার জন্য লাগাতাম। কিন্তু এবার সে আমায় ডুবিয়ে দিল। এমিলকে কোথাও পেলাম না। ভোজটা মোটেই ভালো হলো না। সে শুধু একজন পরিবেশনকারীকে পাঠিয়েছিল কাজের জন্য। লোকটার প্রথম শ্রেণীর কাজে কোন অভিজ্ঞতাই ছিল না। সে আমার প্রধান মানী অতিথিকে সবার শেষে পরিবেশন করেছিল। একবার সে বেশ অখাদ্য খাবার মস্ত এক ডিসে পরিবেশন করলো তাঁকে। মাংসটাও বেশ শক্ত আর আলুগুলোও আঠালো। যাচ্ছেতাই ব্যাপার, আমি রেগে আগুন হয়ে গেলাম। প্রাণপণ চেষ্টায় কোন রকমে হাসিমুখে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেলাম। কিন্তু মনে মনে বলতে লাগলাম, এমিলকে একবার পাই। মনের সুখে তাকে গায়ের ঝাল ঝাড়বো’।
ব্যাপারটা ঘটে বুধবার। পরের রাতেই মানবিক সম্পর্ক নিয়ে একটা বক্তৃতা শুনলাম। শুনতে শুনতে বুঝতে পারলাম এমিলকে গালাগাল দিয়ে কিছুই আসে যাবে না। এতে কেবল সে গম্ভীর হয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে থাকবে। এর ফলে ভবিষ্যতে তার কাছ থেকে আমি আর কোনরকম সাহায্য পাব না। আমি ব্যাপারটা তার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে চাইলাম। সে খাবার কেনেনি বা রান্নাও করেনি। তার কিছু পরিবেশনকারী বোকা হওয়ার জন্য সে দায়ী নয়। সম্ভবত আমি একটু তাড়াহুড়ো করেই সব ভেবে বসেছিলাম। তাই তার সমালোচনা করার বদলে আমি বন্ধুত্বের স্বরেই কথা বলতে শুরু করলাম। আমি ঠিক করলাম ওর প্রশংসা করেই শুরু করবো। এইরকম ভঙ্গীতে চমৎকার কাজ হল। পরের দিন এমিলের সঙ্গে দেখা হল আমার। এমিল মনে মনে বেশ রেগে লড়াই করার জন্যেই তৈরি ছিল। আমি বললাম, ‘দেখ, এমিল, তুমি হচ্ছে নিউ ইয়র্কের সবার সেরা পাঁচক। অবশ্য, আমি বুঝতে পারছি খাবার তুমি কেনোনি বা নিজে রান্নাও করোনি। বুধবার যা ঘটেছে তার জন্য তুমি কোনভাবেই দায়ী নও। আমি চাই তুমি ভবিষ্যতে আমায় সাহায্য করবে।‘
