উড্রো উইলসনের এই বক্তব্যের সঙ্গে জন, ডি, রকফেলার জুনিয়রের চেয়ে আর বেশি কেউ একমত হননি। সেটা ১৯১৫ সাল, রকফেলার ছিলেন কলোরাডোর সবচেয়ে ঘৃণিত মানুষ! আমেরিকার শিল্পজগতের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তাক্ত এক ধর্মঘট দুবছর ধরে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল। কলোরাডোর কলহপ্রিয় শ্রমিকরা কলোরাডো লৌহ প্রতিষ্ঠানের কাছে অতিরিক্ত মজুরি দাবি করে চলেছিল। রকফেলার ওই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন। বহু সম্পত্তি এতে ধ্বংস হয়, সৈন্যবাহিনীকেও ডাকতে হয়। প্রচুর রক্তপাত ঘটে, ধর্মঘটীদের দেহ গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায়।
এই রকম সময়ে, আকাশ বাতাস যখন ঘৃণায় আচ্ছন্ন রকফেলার ধর্মঘটিদের নিজের মতে আনতে চাইছিলেন। আর তিনি তা পেরেও ছিলেন। কিভাবে? সেই কাহিনীই এখানে বলছি। কয়েক সপ্তাহ বন্ধুত্ব করে রকফেলার ধর্মঘটিদের প্রতিনিধিদের কাছে বক্তৃতা দিলেন। সেই বক্তৃতাকে অনেক অর্থেই একটা অপূর্ব সৃষ্টি বলা যেতে পারে। এতে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল পাওয়া যায়। এতে রকফেলারের চারপাশে যে ঘৃণার বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল সেই ভাবটি সম্পূর্ণ দূর হয়ে যায়। এর ফলে তার কিছু আবার স্তাবকও জুটে গেল। এতে এমন সুন্দর বন্ধুত্বপূর্ণভাবে সব বলা হয়েছিল যে, ধর্মঘটিরা যে মজুরি বৃদ্ধির মধ্যে ওই রক্তাক্ত পথে লড়াই করেছিল সে সম্পর্কে উচ্চবাচ্য না করেই কাজে যোগদান করল।
নিচে সেই অপূর্ব বক্তৃতার গোড়াটি উদ্ধৃত করছি। লক্ষ করবেন কীভাবে এটা ক্রমশ বন্ধুত্বের আলো ছড়াতে শুরু করেছিল।
মনে রাখবেন রকফেলার যাদের সামনে কথা বলেছিলেন সেইসব মানুষ কয়েকদিন আগে তাঁকে একটা টক আপেল গাছে গলায় ফাঁস দিয়ে মারার কথা বলেছিল। তা সত্তেও রকফেলার যা ব্যবহার করেন তার চেয়ে ভাল কিছু আর আশা করা যায় না–তিনি যেন একদল স্বেচ্ছাসেবক ডাক্তারের সভায় কথা বলছেন। তাঁর বক্তৃতায় পাওয়া যায় এমন সব কথা, যেমন–এখানে আসতে পেরে আমি গর্বিত বোধ করছি। আপনাদের বাড়িতে গিয়ে, আপনাদের স্ত্রী ছেলেমেয়েদের সঙ্গে পরিচিতি হয়ে, আমি এখানে আজ অপরিচিত অবস্থায় আসি নি, আমি এসেছি বন্ধু হিসেবে পারস্পরিক বন্ধুত্ব, সাধারণ স্বার্থ আর আপনাদের দয়াতেই আমি এখানে এসেছি।
‘এ আমার জীবনের এক স্মরণীয় দিন’, রকফেলার শুরু করেন এইভাবে। জীবনে এই প্রথম এই প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের প্রতিনিধি, অফিসার আর সুপারিন্টেন্ডেন্টদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেলাম। আমি আপনাদের কথা দিতে পারি আমি এখানে এসে আজ গর্বিত আর যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন একথা আমি মনে রাখব। এই সভা যদি মাত্র দু’সপ্তাহ আগে অনুষ্ঠিত হতো তাহলে আমি এখানে থাকলে মাত্র কয়েকজনকেই বোধহয় চিনতে পারতাম। দক্ষিণের কয়লাখনি অঞ্চলের সমস্ত শিবিরগুলি গত সপ্তাহে ভ্রমণ করার সুযোগ পাওয়ায় একমাত্র যারা ছিল না তারা ছাড়া, ব্যক্তিগতভাবে সমস্ত প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ করে আমরা এখানে অপরিচিত অবস্থায় আসিনি, এসেছি বন্ধুভাবে। আর এই পারস্পরিক বন্ধুত্বের মধ্যেই আমি খুশি যে আমাদের সব রকম সমস্যার বিষয়ে আলোচনা করতে পারব।
যেহেতু এটি প্রতিষ্ঠানের অফিসার এবং কর্মচারি প্রতিনিধিদের সভা, অতএব আপনাদের অনুগ্রহেই আমি এখানে এসেছি, যেহেতু আমি এর কোনটি হওয়ার মত সৌভাগ্যবান হতে পারিনি। তা সত্ত্বেও আমি অনুভব করি আমি আপনাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবেই জড়িত, যেহেতু বলতে গেলে আমি স্টকের মালিক আর অংশীদারদের পক্ষে এসেছি।
শত্রুদের বন্ধু করে তোলার জন্য এই কৌশলটা কি চমৎকার কোন উদাহরণ নয়? ধরুন রকফেলার যদি অন্য কোন পথ নিতেন? ধরুন তিনি শ্রমিকদের সঙ্গে তর্ক জুড়ে দিয়ে তাদের মারাত্মক বাস্তব ঘটনাগুলো তাদের সামনে মেলে ধরতেন? ধরা যাক তিনি তার কথাবার্তায় তাদের ইঙ্গিত করতেন তাদের ভুল হচ্ছে। এটাও ধরুন তর্কশাস্ত্র অনুযায়ী তিনি প্রমাণও করতে পারলেন তাদের ভুল হয়েছে, তাহলে কি ঘটতো? এতে জন্মাত আরও ক্রোধ, আরও ঘৃণা আরও বিরোধিতা।
আপনার প্রতি যদি কোন মানুষের ভালো ধারণা থাকে, তাহলে কখনই আপনি তাকে নিজের মত কোন তর্কশাস্ত্রের সাহায্যেই আনতে পারবেন না। ধমকদানকারী বাবা-মা, হুকুমকারী মালিক আর স্বামী বা ঘ্যানঘ্যানে স্ত্রীদের বোঝা দরকার যে মানুষ কখনই তাদের মন বদলাতে চায় না। তাদের কোনভাবেই জোর করে আপনার বা আমার মতের বশবর্তী করা যাবে না। কিন্তু বন্ধুত্বপূর্ণ নম্র ব্যবহার করলে তাদের হয়তো কিছুটা নমনীয় করতে পারা যাবে।
ঠিক এই কথাটাই প্রায় একশ বছর আগে বলেছিলেন আব্রাহাম লিঙ্কন :
‘এটা একটা পুরনো প্রবাদ যে, এক গ্যালন দুর্গন্ধ পদার্থে যত মাছি এসে বসে তার চেয়ে ঢের বেশি বসে এক ফোঁটা মধুর উপর। অতএব মানুষের ক্ষেত্রেও এটা সত্যি। আপনি যদি কোন মানুষকে আপনার মতের বশবর্তী করতে চান তাহলে প্রথমেই তাকে বুঝিয়ে দিন আপনি তার প্রকত বন্ধু। এর মধ্যেকার এক ফোঁটা মধুই তার হৃদয় আকর্ষণ করবে। আর এটাই তার হৃদয়ে পৌঁছবার একমাত্র পথ।
ব্যবসায়ীরা আজ বুঝতে পারছেন ধর্মঘটীদের সঙ্গে বন্ধুর মত ব্যবহার করলে আখেরে কাজ দেয়। যেমন উদাহরণ হিসেবে, হোয়াইট মোটরকার কোম্পানির আড়াই হাজার কর্মচারি যখন মাইনে বাড়ানোর দাবীতে ধর্মঘট করে, সেই কোম্পানির প্রেসিডেন্ট রবার্ট এফ, ব্ল্যাক কখনই তাদের সম্পর্কে কোন নিন্দাবাদ করেননি বা ভীতি প্রদর্শন বা কমিউনিষ্ট আখ্যাও দেননি। বরং তিনি ধর্মঘটীদের প্রশংসাই করেন। তিনি ক্লীভল্যাণ্ডের খবরের কাগজে একটা বিজ্ঞাপন প্রচার করে জানান, কি শান্তিপূর্ণ পথেই না তারা তাদের কাজের যন্ত্র নামিয়ে রেখেছে। ধর্মঘটী পাহারাদারদের একটু আয়েসী হতে দেখে তিনি তাদের কয়েক ডজন বেসবল ব্যাট আর দস্তানা কিনে দিয়ে ফাঁকা এক মাঠে তাদের খেলতে আহ্বান জানান।
