‘আমার আরও সাবধান হওয়া উচিত ছিল, আমি বলে চলোম। আপনি আমায় প্রচুর কাজ দেন, আপনি সেরা জিনিসই চাইবেন। তাই সব আবার আমি নতুন করেই এঁকে দেব।’
‘না! না!’ তিনি বলে উঠলেন। ‘তোমায় আবার একাজ করতে দিতে পারি না, তিনি আমার কাজের প্রশংসা করে বললেন, সামান্য একটু অদল বদল করলেই চলবে। আমার সামান্য ভুলে কোন অর্থ ক্ষতি হয়নি। সামান্য ব্যাপার–এতে চিন্তার কিছু নেই।’
নিজেকে সমালোচনা করতেই ভদ্রলোকের সব রাগ জল হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত তিনি আমায় মধ্যাহ্নভোজে নিয়ে গেলেন। আমি বিদায় নেবার আগে আমাকে তিনি একটা চেক আর কমিশনও দিলেন।
বোকারাই কেবল নিজের ভুল সমর্থন করতে চায় না–বেশির ভাগ বোকারাই তাই করে। কিন্তু নিজের ভুল মেনে নিতে মহত্বই প্রকাশ পায় আর তাতে কাজও হয়। একটা উদাহরণ রাখছি। ইতিহাসে রবার্ট লী’য়ের সম্বন্ধে রয়েছে যে তিনি যে ভাবে গেটিসবার্গ আক্রমণের ব্যর্থতা নিজের কাঁধে নেন সেকথার তুলনা নেই, তাতে তিনি অতি মহৎ হয়েই আছেন। এ ব্যর্থতা আসে পিকেটের আক্রমণে।
পশ্চিমী দুনিয়ায় পিকেটের আক্রমণ হয়ে আছে সবচেয়ে দর্শনীয় আর আশ্চর্যজনক কোন আক্রমণ। পিকেট নিজে ছিলেন অত্যন্ত রূপবান। তাঁর মাথার পাশে ঢল নামতে থোকা থোকা চুল, প্রায় কাঁধ অবধি নামতো সে চুল। ইতালি আক্রমণের সময় নেপোলিয়ন যেরকম করতেন পিকেটও তেমনি যুদ্ধক্ষেত্রে রোজই প্রেমপত্র লিখতেন। সেনাবাহিনীর প্রত্যেকেই বিনা প্রতিবাদে মেনে চলতো তাঁর আদেশ।
পিকেটের সেনাবাহিনী শক্রব্যুহ আক্রমণ করার জন্য এগিয়ে চলতেই আচমকা শত্রুপক্ষ লুকনো জায়গা থেকে ওই সেনাবাহিনীকে আক্রমণ করে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। পিকেটের পাঁচ হাজার সেনার প্রায় পাঁচভাগের চার ভাগই তাতে ধ্বংস হয়ে যায়। সামান্য ভুলে আর অসতর্কতার ফলেই এমন মারাত্মক ব্যাপার ঘটে যায়।
পিকেটের এই আক্রমণ ইতিহাসে সোনার অক্ষরেই লেখা আছে-বীরত্বপূর্ণ যে সংগ্রামের তুলনা নেই। লী ব্যর্থ হলেন এইভাবেই। উত্তরে এগুনোর পথ ছিল না–দক্ষিণের অবস্থাও তাই।
লী নিদারুণ শোকাহত আর দুঃখিত হলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই প্রেসিডেন্ট জেফারসন ডেভিসের কাছে পদত্যাগ পত্র পাঠিয়ে দিলেন। তিনি তাতে লিখেছিলেন তার জায়গায় একজন তরুণ আর যোগ্য ব্যক্তিকেই যেন নিয়োগ করা হয়। লী যদি পিকেটের ব্যর্থতার জন্য কাউকে দোষারোপ করতে চাইতেন তাহলে সেরকম সুযোগ তিনি প্রচুর পেতেন। তার নিচের কিছু সেনাপতিরাই ব্যর্থ হন। ঘোড়সওয়ার বাহিনী পদাতিক বাহিনীকে সাহায্য করতে সময়মত আসেনি। এতেই ভুল মারাত্মক হয়ে ওঠে।
কিন্তু লী ছিলেন মহৎ, তিনি অপরকে দোষারোপ করেননি। পিকেটের হতাবশিষ্ট, রক্তাক্ত বাহিনী ফিরে আসতেই লী স্বয়ং তাদের অভ্যর্থনা জানিয়ে বলেন, এ দোষ আমার, আমার নিজের দোষেই এযুদ্ধে আমাদের পরাজয় হয়েছে।’
ইতিহাসে খুব কম সেনাপতিরই এমন স্বীকারোক্তি করার সাহস দেখা গেছে।
এলবার্ট হাভার্ড এমন ধরনের একজন লেখক ছিলেন যে একটা জাতিকেই প্রায় কাঁপিয়ে তুলতেন তাঁর লেখায়। তাঁর লেখার খোঁচায় অনেকের মধ্যেই অসন্তোষ জাগতো। কিন্তু হাভার্ড মানুষের সঙ্গে তাঁর চমৎকার ব্যবহারের গুণে শত্রুকেও বন্ধু করে তুলতেন।
যেমন একটা উদাহরণ দিচ্ছি : একবার এক ক্রুদ্ধ পাঠক জানান যে তিনি হাভার্ডের মতের সঙ্গে একমত নন। তিনি হাভার্ডকে নানা বিশেষণে ভূষিত করেন। হাভার্ড কিন্তু এর জবাব দিলেন এইভাবে :
‘চিন্তা করে দেখলাম, আমার নিজের মত লেখাটার সঙ্গে মেলে না। আগে যা সব লিখেছি আজ সেগুলো আমার অনেকক্ষেত্রেই পছন্দ হয় না। আমি আনন্দিত যে আপনি লেখাটি নিয়ে ভেবেছেন। ভবিষ্যতে এদিকে এলে একবার আমার এখানে যদি আসেন তাহলে লেখাটি নিয়ে আলোচনাও করা যাবে। দূর থেকেই হাত বাড়িয়ে দিচ্ছি।
আপনার বিশ্বস্ত….।
এরকম ব্যবহার যিনি করতে পারেন তাকে কিই বা বলবেন?
যখন আমাদের কথা ঠিক হয় তখন অপরজনকে কৌশলী পথে নিজের মতের অনুসারেই করতে হবে–আর আমাদের যখন ভুল হবে–সেটা আশ্চর্যজনকভাবে প্রায়ই হয়–তখন আসুন নিজেদের ভুল দ্রুত স্বীকার করে ফেলি। এই কৌশলে যে কেবল দ্রুত, ফল দেবে তাই নয় বিশ্বাস করুন এতে খুব মজাও পাবেন আর সেটা আত্মসমর্থনের চেয়েও ভালো।
প্রাচীন সেই প্রবাদটা মনে রাখবেন : ‘লড়াই করে যথেষ্ট পাবেন না, বরং নরম হলে আশাতীতই পেতে পারবেন।‘
অতএব যদি অপরকে নিজের মতে আনতে চান তাহলে ৩নং নিয়মটা মনে রাখবেন :
‘যদি আপনি ভুল করেন, তাড়াতাড়ি বেশ আন্তরিকভাবেই স্বীকার করুন।‘
১৩. শুভবুদ্ধির পথ ধরে
এয়োদশ পরিচ্ছেদ
শুভবুদ্ধির পথ ধরে
আপনার কখনও রাগ হলে অন্যকে দুচার কথা শুনিয়ে দেন আর তাতেই আপনার মনের ভার লাঘব হয়ে যায়। কিন্তু যাকে শোনালেন তার মনের ভাবটা কেমন হয়? সে কি আপনার মত আনন্দ পাবে? আপনার ওই কলহপ্রিয়তা, ক্ষিপ্তভঙ্গী কি তাকে আপনার মতবাদ মেনে নিতে সাহায্য করবে?
‘আপনি যদি আমার দিতে ঘুসি পাকিয়ে আসেন’, উড্রো উইলসন একবার বলেছিলেন, তাহলে কথা দিতে পারি আমাকেও দুগুণ তৈরি দেখতে পাবেন। কিন্তু এর বদলে আপনি যদি এসে বলেন, আসুন, বসে আলোচনা করা যাক, আর আমাদের মতবিরোধ হলে, আসুন জানার চেষ্টা করি আমাদের মতবিরোধ কেন। এতে আমরা দেখতে পাবো আমাদের মধ্যে যে মতবিরোধ আছে তা খুবই কম। দেখা যাবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা একমত। শুধু আমাদের যদি একটু ধৈর্য আর ইচ্ছে থাকে তাহলে একমত হতে অসুবিধা নেই।
