একদিন পার্কে দেখা হয়ে গেল ঘোড়সওয়ার এক পুলিসের সঙ্গে, পুলিসটি তার কর্তৃত্ব দেখাতে তৎপর হয়ে উঠলো।
‘এভাবে কুকুরের শিকল খুলে নিয়ে পার্কে বেড়াচ্ছেন কেন?’ সে আমায় বেশ ধমক দিয়েই বললো। জানেন না এটা বেআইনী?
হ্যাঁ, তা জানি’, আমি স্বরেই বললাম। তবে ও কারও ক্ষতি করবে না, তাই–।’
‘আপনি ভাবেননি! আঁ! আপনি কি ভাবেন তা নিয়ে আইন মাথা ঘামায় না। কুকুরটা কোন কাঠবিড়ালীকে মেরে ফেলতে পারে বা কোন বাচ্চাকে কামড়াতে পারে। যাক, এবারের মত আপনাকে ছেড়ে দিচ্ছি। ভবিষ্যতে কোনদিন আপনার কুকুরকে শিকল ভোলা দেখলে আপনাকে জজের কাছে আপনার কথা বোঝোতে হবে।’
আমি ভীরু গলায় হুকুম তামিল করবো জানালাম।
তামিল করেছিলাম বটে–তবে মাত্র কয়েকবার। কিন্তু রেক্স শিকল পছন্দ করতো না, আর আমিও তাই। অতএব, আগের মত শিকল খুলেই রেক্সকে নিয়ে বেড়াতে লাগলাম। প্রথম প্রথম ভালোই কাটল। তারপর একদিন ফাঁদে পড়ে গেলাম। একদিন বিকেলে একটা পাহাড়ের কোলে আইন রক্ষক ভদ্রলোকের মুখোমুখি হয়ে পড়লাম। সে ঘোড়ার পিঠেই ছিল। রেক্স খোলা অবস্থায় সোজা সেই অফিসারের সামনে।
আমি তৈরি ছিলাম। জানতাম কি ঘটবে। অতএব পুলিশকে আর কথা আরম্ভ করার সুযোগ দিলাম, আমিই তা শুরু করলাম। আমি বললাম : ‘অফিসার, আপনি আমায় হাতে হাতেই ধরেছেন। আমি দোষী। আমার কোন অজুহাতই নেই, কোন ওজরও নেই। আপনি আমায় গত সপ্তাহে সাবধান করেছিলেন যে রেক্সকে যেন শিকল দিয়ে বেঁধে রাখি। না হলে জরিমানা করবেন।’
পুলিশ কর্তাটি নরম গলায় বললেন, ‘ঠিক আছে। আমি বুঝতে পারছি এই রকম ছোট্ট কোন কুকুর ছেড়ে রাখার লোভ সামলানো যায় না, যখন বিশেষ করে কেউ থাকে না।‘
‘হ্যাঁ, লোভ বলতে পারেন, আমি জবাব দিলাম। তবে এটা আইনের নিয়মে।‘
‘যাকগে, এরকম কুকুর কারও ক্ষতি করবে না’, পুলিশটি জানালেন।
‘না’ তবে সে কাঠবিড়ালী মারতে পারে, আমি বললাম।
তিনি বললেন বুঝেছি, ‘আপনি ব্যাপারটায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন, ‘কি করবেন আমি বলে দিচ্ছি। ওকে পাহাড়ের কাছে ছুটোছুটি করতে দিন আমি যাতে না দেখি–তাহলে সব ভুলে যাব।’
পুলিশটি মানুষ হওয়াতেই একটু আত্মগরিমা দেখাতে চাইছিলেন, তাই আমি যখন নিজেকে দোষী বলতে লাগলাম তখনই তিনি নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বোঝানোর জন্যেই দয়া প্রদর্শন করলেন।
কিন্তু ধরুন আমি যদি আত্মপক্ষ সমর্থন করতে চাইতাম-তাহলে ব্যাপারটা কেমন দাঁড়াত? পুলিশের সঙ্গে আপনারা কখনও তর্ক করেছেন?
তাই তার সঙ্গে তর্ক করার পথে না গিয়ে আমি স্বীকার করলাম তিনিই সম্পূর্ণ ঠিক আর আমি সম্পূর্ণ ভুল করছি। আমি স্বীকারের কাজটা বেশ দ্রুত আর আন্তরিকতার সঙ্গেই করি। আমি ওঁর দিক আর উনি আমার দিকটা নিতেই ব্যাপারটা চমৎকার ভাবেই মিটে গেল। লর্ড চেষ্টারফিল্ডও বোধহয় তত মহত্ত্ব দেখাতে পারতেন না, অথচ একসপ্তাহ আগে তিনিই আমায় আইনের ভয় দেখিয়ে ছিলেন।
এমন অবস্থায় অপর ব্যক্তি বলার আগেই নিজেই দোষ স্বীকার করা ভাল নয় কি? অপরের মুখ থেকে খারাপ কথা শোনার আগে আত্মসমালোচনার কথা নিজে কানে শোনা ভাল তাই না?
অন্যে আপনার সম্বন্ধে যেসব খারাপ কথা ভাবছে বা বলতে চাইছে সেগুলোই নিজে বলে ফেলুন-আর সেটা বলে ফেলুন অন্যে তা বলার আগেই–আর এইভাবেই তার পালের হাওয়া কেড়ে নিন। এমন করলে একশ বারে নিরানব্বই বারই দেখবেন সে বেশ মহত্ব দেখিয়ে ক্ষমা করার পর্যায়ে চলে আসবে, ঠিক পুলিশটি যেমন আমার আর রেক্সের ক্ষেত্রে করেন।
ফার্দিনান্দ ওয়ারেন নামে একজন কমার্শিয়াল আর্টিষ্ট একবার বদমেজাজী একজন ক্রেতাকে এই কৌশলে বশ করেন।
নিজের কাহিনী বলতে গিয়ে তিনি জানান যে বিজ্ঞাপনের আর প্রচারের কাজে ছবি আঁকার সময় অত্যন্ত সতর্ক আর ঠিক থাকতে হয়।
তিনি বলেন : ‘কিছু শিল্প সম্পাদক চান তাদের কাজ সঙ্গে সঙ্গেই করে দেওয়া হোক। এরকম করতে গিয়ে অনেক সময়েই ভুল হয়। একজন এরকম শিল্প সম্পাদককে আমি জানতাম যিনি ছোটখোটো ভুল ধরে আনন্দ পেতেন। প্রায়ই আমি তার অফিস থেকে অতি রেগে বেরিয়ে আসতাম, সেটা সমালোচনার জন্য নয়, বরং তার আক্রমণের পদ্ধতির জন্যেই। সম্প্রতি ওই ভদ্রলোককে আমি খুব দ্রুত কিছু কাজ করে দিই। তিনি হঠাৎ আমায় টেলিফোন করে তার অফিসে যেতে বললেন। তিনি জানালেন কিছু ভুল হয়েছে। আমি পৌঁছতেই ঠিক যা ভেবেছিলাম তাই দেখলাম আর ভয়ও পেলাম। ভদ্রলোক প্রায় ক্ষিপ্ত অবস্থায় আমার উপর একহাত নিতে তৈরি। বেশ গরম হয়েই তিনি বললেন আমি এই করেছি, তাই করেছি। এতদিন যা শিখেছিলাম সেই আত্মসমালোচনা করারই সুযোগ আমার এসে গেল। অতএব আমি বললাম : আপনি যা বলছেন তা সত্য হলে আমারই ভুল হয়েছে, অপরাধের কোন ক্ষমা নেই। বহুঁকাল ধরেই আপনার জন্য ছবি আঁকছি, আমার জানা উচিত ছিল; আমি অত্যন্ত লজ্জিত।
তিনি সঙ্গে সঙ্গে আমার পক্ষ সমর্থন করতে আরম্ভ করলেন। হ্যাঁ, ঠিকই বলেছো। তবে ভুলটা এমন কিছু মারাত্মক নয়। এ হলো শুধু।
‘আমি তাঁকে বাধা দিলাম, যেকোন ভুলেই বাজে খরচ আসবে, তাছাড়া এ অতি বিরক্তিকর।’
‘তিনি কিছু আবার বলতে যেতেই বাধা দিলাম। আমার খুবই ভাল লাগছিল। জীবনে এই প্রথম আমি নিজের সমালোচনা করছিলাম এ আমার ভালোই লাগছিল।‘
