মিঃ ক্রাউলে দেখলেন তর্কে তিনি জিতলেও তার প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার ডলার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই এবার তিনি তাঁর কাজের কৌশল পাল্টাবেন ঠিক করলেন। আর তর্ক করবেন না। ফল কি হল? তাঁর নিজের মুখেই শুনুন :
এক সকালে আমার অফিসে টেলিফোন বেজে উঠল। ওপাশ থেকে শোনা গেল বেশ উত্তেজিত, অসন্তুষ্ট কণ্ঠস্বর। তিনি বললেন, আমরা যে তার কারখানায় একগাড়ি কাঠ পাঠিয়েছি সেগুলো একদম বাজে। তাঁর প্রতিষ্ঠান ট্রাক থেকে মাল নামানো বন্ধ করে দিয়েছে। আর আমরা যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সব কাঠ তার চাতাল থেকে সরিয়ে নিই।’ ট্রাকের মাল একচতুর্থাংশ নামানো হতে তাদের কাঠ পরিদর্শক জানান যে কাঠের মান শতকরা ৫৫ ভাগ নিচে। এ অবস্থায় তারা তা নিতে অস্বীকার করছে।
আমি সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে রওয়ানা হলাম আর রাস্তায় যেতে যেতে ঠিক করে নিলাম কিভাবে সব সামাল দেব। সাধারণ অবস্থায় পড়লে আমি কাঠ বাছাই করার নিয়ম উল্লেখ করতাম আর ওই কাঠ পরিদর্শককে অবশ্যই বোঝাতে চাইতাম কাঠ ঠিক আছে এবং তার মান ঠিক, এটা তারই ভুল হচ্ছে। তিনি ভুল নিয়ম প্রয়োগ করছেন। অবশ্য আমি ঠিক করলাম এই শিক্ষায় যে নিয়ম শিখেছি তাই কাজে লাগাব।
কারখানার কাছে যখন পৌঁছালাম, তখন সেই ভদ্রলোক আর কাঠ পরিদর্শন বেশ বদমেজাজেই তৈরি হয়ে আছেন, লড়াই করতে তারা প্রস্তুত। আমরা এবার যে গাড়ি থেকে কাঠ নামানো হচ্ছিল সেখানে গেলাম। আমি তাঁদের অনুরোধ করলাম সব কাঠ নামাতে দেওয়া হোক যাতে ব্যাপারটা বুঝতে পারি। পরিদর্শককে আমি এও বললাম তিনি বাতিল কাঠগুলো এক জায়গায় আর ভালোগুলো অন্য জায়গায় রাখুন।
‘বেশ কিছুক্ষণ লক্ষ করেই বুঝলাম পরিদর্শক ভদ্রলোক বড় বেশি রকম কড়া, আর বাছাই করার নিয়ম তিনি মানছেন না। এই কাঠগুলো ছিল বিশেষ জাতের সাদা পাইন কাঠ-আমি এও বুঝলাম পরিদর্শক শক্ত কাঠ সম্পর্কে বেশ শিক্ষা পেয়েছেন বটে তবে সাদা পাইন সম্বন্ধে কিছুই জানেন না। সাদা কাঠে আমার অভিজ্ঞতা দারুণ এটা আমার বিষয়–তা বলে কি তিনি যেভাবে সব বাছাই করছিলেন তাতে আপত্তি করলাম? মোটেই না। আমি শুধু সব দেখতে দেখতে মাঝে মাঝে দু-চারটে প্রশ্ন করতে লাগলাম ‘কোন কাঠ কেন খারাপ-একবারের জন্যেও আমি বলিনি পরিদর্শক মশাই ভুল করছেন। আমি কেবল বোঝাতে চাইলাম আমার জানার উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতে পাঠানোর সময় যাতে তাদের পছন্দসই কাঠ পাঠাতে পারি।’
বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ পথে আর সহযোগিতার ভঙ্গীতেই আমি বারবার বললাম, তাদের কাজে লাগবে না এমন কাঠ তারা অবশ্যই সরিয়ে নেবেন। কথাবার্তার মাঝখানে ভদ্রলোককে বেশ মোলায়েম করে তুলোম আর আমাদের মধ্যেকার তিক্তভাব অনেকটাই কেটে গেল। আমার সতর্ক কয়েকটা উক্তিতে ভদ্রলোক বুঝলেন বাতিল কাঠগুলোর কিছু হয়তো সত্যিই ঠিক আছে আর আসলে তাদের দরকার আরও দামী কিছু। আমি সর্তক ছিলাম যাতে তিনি না ভাবেন আমি এ নিয়ে কোন কথা তুলছি।
আস্তে আস্তে তার সমস্ত ভাবভঙ্গীই বদলে গেল। তিনি শেষ অবধি আমার কাছে স্বীকার করলেন সাদা পাইন কাঠ সম্বন্ধে তার তেমন অভিজ্ঞতা নেই। গাড়ি থেকে তা নামানোর সময় তিনি আমায় সে সম্বন্ধে প্রশ্ন করতে লাগলেন। আমি তখন ব্যাখ্যা করলাম এ কাঠ কেন পাঠানো হয়েছে, অবশ্য তাঁর পছন্দ না হলে ফেরত নেব। ভদ্রলোকের শেষ পর্যন্ত এমন অবস্থা হলো যে যতবার কাঠ বাতিলের সারিতে রাখা হচ্ছিল, তিনি নিজেকে দোষী ভাবছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি বুঝেছিলেন ভুলটা তাঁদেরই হয়েছে, যেরকম ধরনের কাঠ দরকার ছিল সে ধরনের কাঠের অর্ডার তাঁরা দেন নি।
অবশেষে যা দাঁড়ালো, আমি বিদায় নেবার পর পরিদর্শক গাড়ি বোঝাই সব কাঠ আবার যাচাই করলেন আর সবটাই নিয়ে নিলেন এবং আমরাও পুরো টাকার চেক পেয়ে গেলাম।
‘এই একটা ব্যাপারেই সামান্য একটু কৌশলে কাজ হয়ে গেল। যেহেতু আমি কোনভাবেই অন্যজনকে বলিনি তিনি ভুল করছেন, আর এতে আমাদের প্রতিষ্ঠানের দেড়শ ডলার নগদে লাভ হলো। অবশ্যই টাকার বিনিময়ে আমাদের যে সুনাম নষ্ট হতো তার মূল্যায়ন সম্ভব হয় না।‘
একটা কথা এবার বলতে চাই, এ পরিচ্ছেদে নতুন কিছু আমি বলছি না। উনিশ শতক আগে যীশু বলেছিলেন : ‘তোমার শত্রুর সঙ্গে চট করে একমত হও।
অন্য কথায় বলতে গেলে আপনার মক্কেল, স্বামী বা শত্রুর সঙ্গে তর্ক করবেন না। কখনও বলবেন তার ভুল হচ্ছে, তাঁরকে চটতে দেবেন না। বরং একটু কূটনীতি কাজে লাগান।
যীশু খ্রীষ্টের জন্মের ২,২০০ বছর আগে মিশরের বৃদ্ধ রাজা আখখাঁটি তার ছেলেকে কিছু সুন্দর উপদেশ দিয়েছিলেন-যে উপদেশ আজকের দিনে অত্যন্ত প্রয়োজন। চার হাজার বছর আগে বৃদ্ধ রাজা আখখাঁটি মদ পান করার ফাঁকে তাকে ছেলেকে বলেছিলেন : কৌশলী হও। এতে তোমার সুবিধা হবে।
অতএব, অন্যকে স্বমতে আনতে হলে দু নম্বর নিয়ম হলো :
‘অপরের মতের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। কখনও তাকে বলবেন না সে ভুল করছে।’
১২. ভুল করে থাকলে তা স্বীকার করুন
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
ভুল করে থাকলে তা স্বীকার করুন
আসি বৃহত্তর নিউইয়র্কের প্রায় মাঝখানেই থাকি, তা সত্ত্বেও আমার বাড়ির এক মিনিট হাঁটা পথের দূরত্ব একফালি চমকার জঙ্গল আছে। বসন্তকালে সেখানে চমৎকার জামগাছে ফল ধরে, কাঠবিড়ালীরা এখানে বাসা বেঁধে বাচ্চাদের নিয়ে খেলা করে। এখানে জন্মায় বিরাট ঘোড়ার মাথার সমান উঁচু দীর্ঘ ঘাস। এই সুন্দর অকলঙ্কিত একখণ্ড বনের নাম ফরেষ্ট পার্ক–আর এটা সত্যিই একটা জঙ্গল। কলম্বাস যেদিন বিকেলে আমেরিকা আবিষ্কার করেন তখন এটা যেমন ছিল আজও বোধ হয় তাই রয়ে গেছে। আমি ওই জঙ্গলে আমার ছোট্ট বুলডগ রেক্সকে নিয়ে বেড়াতে যাই। রেক্স অত্যন্ত নিরীহ হাউণ্ড কুকুর। বেড়াতে গিয়ে কারও সঙ্গে দেখা হয় না বলেই রেক্সকে আমি শিকল বেঁধে রাখি না।
