বেন ফ্রাঙ্কলিক সম্পর্কে আমি যে চমৎকার জিনিসটা জানি তা হলো তিনি কি সুন্দর ভাবেই না এই তিরস্কার গ্রহণ করেন। এটা বোঝার মত তার যথেষ্ট বয়স হয়েছিল যে ব্যাপারটা সত্যিই, তিনি এটাও বুঝতে পেরেছিলেন যে এভাবে বলার অর্থ তিনি ব্যর্থ হবেন আর সামাজিক ভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বেন। তাই তিনি সময়মত নিজেকে সংশোধন করে নিলেন। তারপর থেকেই তিনি তাঁর সেই উদ্ধত স্বভাব বদলে ফেলেন।
বেন ফ্রাঙ্কলিন লিখেছিলেন, ‘আমি নিয়ম করে ফেললাম অন্যের বিরক্তি ঘটিয়ে কোন রকম সরাসরি তর্কে জড়িয়ে পড়ব না আর নিজের মতামত জাহির করতেও চাইব না। তাছাড়াও আমি ঠিক করলাম কথাবার্তায় এমন কোন কথা বলবো না যাতে নিজের মতামত জানানো হয়। যেমন, ‘নিশ্চয়ই’ ‘নিঃসন্দেহে’ ইত্যাদি। এর বদলে ঠিক করলাম ব্যবহার করবো ‘আমার মনে হয়’, ‘আমার ধারণা, ‘আমি ভাবছি’ এই সব। অন্য কেউ যদি কিছু বলে উঠতে চাইতো আমি সরাসরি তাঁর কথায় বাধা না দিয়ে বা তাঁর কথা অস্বীকার না করে বলতাম তাঁর কথা হয়তো কোন কোন ক্ষেত্রে সঠিক হতেও পারে, তবে এ ব্যাপারে মনে হয় যেন অন্য কিছু হতে পারে, ইত্যাদি। আমি এরপর থেকেই এরকম কাজে তফাত বুঝতে পারলাম–আর বেশ সহজ ভাবেই সব ঘটে চলল। যেরকম বিনম্রতায় আমি আমার মতামত জানাতে শুরু করলাম তাতে কোন বাধা না পেয়েই তা গৃহীত হতে লাগল। আমার ভুল হলেও কম আশ্চর্য হতাম আর বেশ সহজেই অন্যেরা ভুল করলেও তাদের স্বমতে আনতে বেগ পেতে হতো না।
‘এই রকম রীতিনীতি আমি এমন স্বাভাবিক ভাবেই আয়ত্ত করে ফেললাম যে সেটা বেশ সহজেই হয়ে এলো। গত পঞ্চাশ বছরেও কেউ কোন ঝগড়া হতে পারে এমন কথা আমার মুখ থেকে শোনেনি। আর আমার এই অভ্যাসের জন্যই (আমার সততা নিয়েও) মনে হয় আমি জনগণের উপর এমন প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিলাম যে পুরাতন বদল করে নতুন কিছু করতেও পারতাম। যদিও বক্তা হিসেবে আমি মোটেই ভাল ছিলাম না। নিজের কথা বা বক্তব্য তেমন করে বোঝাতেও পারতাম না তবুও আমি সাধারণভাবে সাফল্য অর্জন করেছিলাম।‘
বেন ফ্রাঙ্কলিনের এমন কৌশল ব্যবসায় ক্ষেত্রে কেমন কাজে লাগে? দুটো উদাহরণ দেওয়া যাক।
নিউ ইয়র্কের ১১৪ লিবার্টি স্ট্রিটের এফ জে. ম্যাহনি তেল ব্যবসা সংক্রান্ত যন্ত্রাদি বিক্রি করে থাকেন। তিনি লং আইল্যাণ্ডের একজন বড় মক্কেলের জন্য কাজের বায়না ধরেছিলেন। কাজটির জন্য একটা খসড়াও দেওয়া হয় আর সেটা গৃহীত হলে কাজ করাও আরম্ভ হয়। তারপরেই একটা দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার ঘটে যায়। ক্রেতা ভদ্রলোক তার বন্ধুদের সঙ্গে কাজটা নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁরা তাঁকে সাবধান করে দিয়ে বলে তিনি মারাত্মক ভুল করেছেন। তার উপর ভুল কিছু জিনিস চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটা নাকি ছোট, এটা নাকি সেরকম, এরকম এই সব তাঁকে নানারকম বোঝায়। বন্ধুদের কথায় ভদ্রলোকের মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার যোগাড়। তিনি মি. ম্যাহনিকে ফোন করে জানিয়ে দেন যে, যা বায়না দিয়েছেন তিনি সে জিনিস নিতে পারবেন না।
‘আমি সব ব্যাপারটা সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করে দেখতে পেলাম আমরা যা করছি সেটাই ঠিক। মিঃ ম্যাহনি আমায় জানিয়েছিলেন। তাছাড়াও আমি জানতাম ওঁর বন্ধুরা এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না বা বোঝেন না, তবে আমি বুঝলাম একথা তাঁকে বললে ফল মারাত্মক হবে। আমি লং আইল্যাণ্ডে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে তাঁর অফিসে ঢুকতেই ভদ্রলোক প্রায় লাফিয়ে উঠে দ্রুত কথা বলতে বলতে আমার দিকে এগিয়ে এলেন। তিনি এমন উত্তেজিত যে প্রায় ঘুসি পাকাতেও চাইছিলেন। তিনি আমায় ঢের বকাবকি করে কথাটা শেষ করলেন এই বলে : বলুন এব্যাপারে কি করতে চাইছেন?
আমি তাঁকে বেশ শান্তস্বরেই বললাম, তিনি যা চাইবেন তাই করবো। আপনি এর দাম দিচ্ছেন, অতএব পছন্দসই জিনিস চাইবার অধিকার আপনার আছে। তা যাই হোক কাউকে দায়িত্ব নিতে হবেই। আপনি যদি মনে করেন আপনিই ঠিক তাহলে আপনার ব্লুপ্রিন্ট দিন যদিও আমরা ইতিমধ্যে ২০০০ হাজার ডলার খরচ করেছি, তাহলেও কাজটা বাতিল করবো। এ দুহাজার আমরা আপনাকে খুশি করার জন্যই ব্যয় করতে রাজি। তবে আপনাকে একটু সাবধান করে দিতে চাই আপনার কথা মতো জিনিস বানানো হলে সে দায়িত্ব আপনাকেই নিতে হবে, আর আমাদের পরিকল্পনা মত কাজ করতে দিলে দায়িত্ব নেব আমরাই।
ভদ্রলোক ততক্ষণে শান্ত হয়ে এসেছিলেন। তিনি শেষ পর্যন্ত বললেন, ঠিক আছে, কাজ করে যান। তবে পছন্দ না হলে ঈশ্বর আপনাদের সাহায্য করুন।
‘ঠিকই হয়েছিল সব কিছু, ভদ্রলোক আমাদের আরও দুদফা কাজ এ বছরেই দেবেন কথা দিয়েছেন।’
‘ভদ্রলোক আমায় যখন অপমান করেন এবং ঘুসি উঁচিয়ে আসেন আর বলেন আমার কাজ বুঝি না তখন আমার পক্ষে তর্ক না করে আত্মসম্বরণ করা কঠিনই ছিল। তবে সেটা করে ভালোই করি, ওতে কাজও হয়। আমি যদি বলতাম তিনি ভুল করছেন তাহলে একটা তর্ক শুরু হত। হয়তো মামলাও হত, সৃষ্টি হত তিক্ততা, বহু টাকা খরচ হত, আমরা হারাতাম ভাল এক খরিদ্দার। আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে, কেউ ভুল করছে না বলাই ভাল।
আর একটা উদাহরণ-মনে রাখবেন যে সব কথা বলছি তার সবই হাজার হাজার মানুষের বিচিত্র অভিজ্ঞতারই ফসল। আর. ভি. ক্রাউলে নিউ ইয়র্কের বিরাট একটা কাঠের কোম্পানীর সেলসম্যান। তাকে একজন দক্ষ কাঠ পরিদর্শকের সঙ্গে কাজ করতে হয়, তার ভুল হচ্ছে বলতেও হয়। তিনি নিজে তর্কেও জেতেন, তবে তাতে কোন লাভ হয়নি। কারণ এই কাঠ পরিদর্শকরা, মিঃ ক্রাউলে বলেছেন, ‘অনেকটা বেসবল খেলার বিচারকের মত। তারা কোন ধারণা করলে তা আর বদলায় না।
