‘আমরা মাঝে মাঝে কোন রকম বাধা বা বড় রকমের কোন আবেগ ছাড়াই আমাদের মন বদলে ফেলি। কিন্তু আমাদের যদি বলা হয় আমরা ভুল করছি তাহলে আমরা সেই কথায় বেশ আপত্তি প্রকাশ করি আর আমাদের হৃদয়ও বেশ কঠিন হয়ে ওঠে! আমরা আমাদের বিশ্বাস গড়ে ওঠার ব্যাপারে অবিশ্বাস্য রকম অমনোযোগী থাকি অথচ আমরাই আবার এর প্রতি দুরন্ত রকম আকর্ষণ দেখাই কেউ যদি সেটা কেড়ে নিতে চায়। আসলে এটা পরিষ্কার যে এই ধারণাগুলো কোনভাবেই আমাদের একান্ত আপনার নয়, বরং সেটা হলো আমাদের অহং ভাবটা যা বিপদের সামনে পড়ে যায়… আমার এই ছোট্ট কথাটা মানুষের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আর এটা উপলব্ধির মধ্যেই রয়েছে প্রাজ্ঞতার পথ। এটাতে একই রকম তীব্রতা থেকে যায় তা আপনি ‘আমার’ আহার, ‘আমার’ কুকুর, ‘আমার’ বাড়ি, ‘আমার’ বাবা, ‘আমার’ দেশ, ‘আমার’ ইশ্বর যাই বলুন না কেন। এছাড়াও আসল রহস্য হলো পৃথিবীর জানা বিষয়ে আমাদের ধারণা বা বিশ্বাস নিয়ে কেউ আপত্তি তুললেই আমরা রেগে যাই বা অসন্তোষ প্রকাশ করি…আমরা সেই সব সত্যি বলে বিশ্বাস করে চলতে চাই, চিরকাল আমরা যা সত্যি ভেবে এসেছি। আর এ বিষয়ে কোন রকম সন্দেহের প্রকাশ ঘটলেই আমরা যত রকমে পারি আমাদের বিশ্বাস আঁকড়ে ধরতে চাই। এর ফল হলো আমাদের বেশির ভাগ তথাকথিত যুক্তিবোধের মধ্যে কেবল খুঁজে ফিরতে চাই আমাদেরই কথার প্রমাণ।
আমি একবার একজন ঘরসাজানোয় দক্ষ মানুষকে আমার বাড়ি সাজানোর দায়িত্ব দিই। যখন বিল পেলাম আমার চোখ কপালে উঠে গিয়েছিল।
কদিন পরে আমার একজন বন্ধু এসে সব দেখে গেলেন। কথায় কথায় দামের কথা উঠতেই তিনি আঁৎকে উঠে বললেন : ‘বলো কি? এ যে সাংঘাতিক। আমার মনে হচ্ছে লোকটা তোমাকে বেশ ঠকিয়েছে।’
কথাটা সত্যি? হ্যাঁ, তা সত্যি; বন্ধু ঠিকই বলেছিলেন। কিন্তু বেশির ভাগ লোকই কথাটা স্বীকার করতে চায় না যেটায় তাদের বুদ্ধি বিবেচনায় ধাক্কা লাগতে পারে। অতএব মানুষ বানাই আমি, নিজে যে ঠিক সেটাই প্রমাণ করার চেষ্টা চালালাম। আমি বললাম সবসেরা জিনিস সবচেয়ে সস্তায় মেলে না। আর
কারও পক্ষেই ভালো রুচিসম্মত জিনিস ফুটপাথের মত সস্তায় কখনও পাওয়া যাবে না। ইত্যাদি।
পরের দিন আর একজন বন্ধু এলেন। তিনি সব জিনিস দেখে বেশ প্রশংসা করতে লাগলেন। মনের খুশিতে টগবগ করে তিনি বলেও ফেললেন এই রকম চমৎকার জিনিস তিনিও তার বাড়ির জন্য কিনবেন ভাবছেন। এবার কিন্তু আমার প্রতিক্রিয়া হলো অন্য রকম। আমি বললাম : ‘মানে, সত্যি কথা বললে এ সব খরচ আমার সাধ্যের বাইরে। বড় বেশি খরচ করেছি। এগুলো কিনে ভুলই করেছি।’
আমরা যখন ভুল করি, সেগুলো তো নিজেদের কাছে স্বীকার করতে পারি। আমাদের কাছে কৌশলে আর বেশ বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কথাটা তুললে হয়তো অন্যের কাছে তা স্বীকারও করতে পারি, আর তা করে আবার নিজেদের সারল্য আর মানসিক উদারতার জন্য অহমিকাও অনুভব করি। কিন্তু ব্যাপারটা আর তা থাকে না যদি কেউ জোর করে আমাদের এই তিক্ত পাঁচনটা যদি গেলাতে চেষ্টা করে…
গৃহযুদ্ধের সময় আমেরিকার বিখ্যাত সম্পাদক হোরেস গ্রিল লিঙ্কনের নীতির প্রচণ্ড রকম বিরোধী ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন ঠাট্টা, তামাশা, আর তর্কের মধ্য দিয়েই তিনি লিঙ্কনকে তাঁর মত মেনে নিতে বাধ্য করতে পারবেন। তিনি এই তিক্ত ধারণা আর প্রচার মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চালিয়ে গিয়েছিলেন। আসলে যে রাতে বুথ লিঙ্কনকে গুলি করে সেদিনও তিনি প্রেসিডেন্ট লিঙ্কনকে হিংস্রভাবে, ব্যঙ্গাত্মক ব্যক্তিগত আক্রমণ করে লিখেছিলেন।
কিন্তু এই রকম তিক্ততার ফলে কি লিঙ্কন গ্রিলের সঙ্গে একমত হন? মোটেই না, হাস্যাস্পদ করে গালনিন্দে করলে কখনই কাজ হয় না।
মানুষকে নিয়ে চলার ক্ষেত্রে যদি চমৎকার কিছু উপদেশ চান, আর নিজেকে পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যক্তিত্বের উন্নতি ঘটাতে আগ্রহী হন তাহলে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের আত্মজীবনী অবশ্যই পাঠ করবেন-এ আত্মজীবনী হল আজ পর্যন্ত যা লেখা হয়েছে তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ আর আমেরিকার সাহিত্যের এক শ্রেষ্ঠ রত্ন।
ফ্রাঙ্কলিন তাঁর আত্মজীবনীতে লিখে গেছেন কিভাবে তিনি বিরক্তিকর তর্ক করার অভ্যাস ত্যাগ করেন আর নিজেকে কেমন করে আমেরিকার ইতিহাসে অতি ভদ্র, সক্ষম, আর কূটনীতিসম্পন্ন মানুষ করে গড়ে তোলেন।
একদিন বেন ফ্রাঙ্কলিন যে সময় উড়নচণ্ডী যুবক, তখন একজন বহুঁকালের বন্ধুসভার বন্ধু তাঁকে একপাশে টেনে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ কড়া ভাষায় কতকগুলো গায়ে বেঁধে এমন সত্যি কথা শুনিয়ে দেন। কথাগুলো অনেকটা এই রকম :
‘বেন, তোমাকে নিয়ে আর পারা যায় না। তোমার মতে মত দেয় না এমন সব লোককে তুমি প্রায় চড় মারতেই বাকি রাখো। তোমার মত এখন তাই আর কারও পছন্দ নয়। কেউ তা নিতে চায় না। তোমার বন্ধুরা এটা বেশ বুঝতে পেরেছে তুমি ওদের কাছাকাছি না থাকলেই তাদের সময় ভাল কাটে। তুমি এত বেশি জান যে কেউ তোমাকে কিছু শেখাতে পারে না। বাস্তবিকই, কেউ আর সেরকম চেষ্টাও করবে না যেহেতু তাতে শুধু গন্ডগোল আর অযথা খেটে মরতে হয়। অতএব, তুমি আর বেশি কিছু শিখতে পারছনা যেটুকু জান তার চেয়ে তো নয়ই। তাছাড়া যা তুমি জান তাও অতি সামান্য।‘
