কখনই এই ভাবে শুরু করতে চাইবেন না, এ ব্যাপারটা আমি আপনাকে প্রমাণ করে দিচ্ছি, আসুন। এটা অত্যন্ত খারাপ। এটা অনেকটা এই রকম বলা হয় : দেখুন, আমি আপনার চেয়ে চালাক চতুর। আমি আপনাকে কিছু জ্ঞান দিয়ে আপনার মত পাল্টানোর ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
এটা কিছুটা দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করার মত। এতে বিরোধিতা জাগিয়ে তোলা হয়, আপনার শ্রোতা আপনি কিছু শুরু করার আগেই আপনার সঙ্গে লড়াইতে নামতে চায়।
মানুষের মন বদলানো বেশ কঠিন কাজ। অতএব তাকে আরও কঠিন করে তুলে লাভ কি? নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত করবেনই বা কেন?
আপনি যদি কোন কিছু প্রমাণ করতে চান তাহলে কাউকে সেটা জানতে দেবেন না। এ কাজ এমন গোপনে, কৌশলে করতে হবে কেউ যেন তা বুঝতে না পারে আপনি সেটা করে চলেছেন।
নিচের এই উদ্ধৃতিটা লক্ষ করুন :
মানুষকে এমনভাবে শেখাতে চান, সে যেন না বোঝে আপনি তাকে শেখাতে চাইছেন। লর্ড চেষ্টারফিল্ড তাঁর ছেলেকে বলেছিলেন :
‘অন্য কারও চেয়ে যদি পারো জ্ঞানী হও, তবে সে কথা তাকে বলো না।’
বিশ বছর আগে আমি যা বিশ্বাস করতাম–একমাত্র অঙ্ক ছাড়া আর বোধহয় কিছুই বিশ্বাস করি –তাছাড়া যখন আইনস্টাইনের লেখা পড়ি তখন তাও আবার বিশ্বাস হয় না। আরও বিশ বছর পরে আমি এ বইটায় যা বলেছি সেটাও হয়তো বিশ্বাস করতে চাইব না। আগে যে সব বিষয় সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলাম এখন সে সম্বন্ধে ততটা নিশ্চিত আমি নই। সক্রেটিস এথেন্সে তাঁর শিষ্যদের বারবার বলতেন : আমি একটা ব্যাপারই জানি, আর সেটা হলো আমি কিছুই জানি না। যাই হোক আমি সক্রেটিসের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান বলে নিজেকে ভাবি না, আর তাই কাউকে বলতে চাই না, সে ভুল করছে। আমি লক্ষ্য করে দেখেছি। তাতে আখেরে কাজ হয়।
কোন মানুষ কোন কথা বললে সেটা যদি আপনার ভুল বলে মনে হয়-হ্যাঁ, প্রকৃতই ভুল কিন্তু–তাহলে এভাবেই সুরু করলে ভালো হয় না কি : হ্যাঁ, এবার শুনুন! আমার অন্যরকম মনে হয়েছিল। তবে আমারও ভুল হতে পারে। কারণ আমার প্রায়ই ভুল হয়। আর আমার ভুল হলেই সে ভুলটা শুধরে নিতে চাই। তাহলে আপনার ব্যাপারটাও একটু দেখা যাক, কি বলেন?
এই ধরনের কথায়, অর্থাৎ আমারও ভুল হতে পারে। আমার প্রায়ই ভুল হয় ব্যাপারটা একটু দেখা যাক কি বলেন? সত্যিকার দারুণ যাদু থাকে এই সব কথায়।
স্বর্গ, মর্ত, পাতাল কোন জায়গাতেই মানুষ আপনার ঐ ধরনের কথায় কোন প্রতিবাদ করতে চাইবে না।
ঠিক এই রকমই করে থাকেন একজন বিজ্ঞানী। আমি একবার বিখ্যাত আবিষ্কারক আর বিজ্ঞানী স্টেফানসনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। তিনি প্রায় এগারো বছর কাটিয়েছিলেন মেরু অঞ্চলে, তাছাড়াও তিনি দু’বছর কেবলমাত্র মাংস আর জল ছাড়া কিছুই খাননি। তিনি আমায় তার একটা পরীক্ষার বিষয় বলেছিলেন। আমি তাঁকে প্রশ্ন করি তিনি ঐ পরীক্ষায় কি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। আমি কোনদিনই তাঁর উত্তরটা ভুলতে পারবো না। তিনি বলেন : কোন বিজ্ঞানী কখনও কিছু প্রমাণ করতে চান না। তিনি কেবল আসল ব্যাপার খুঁজে বের করার চেষ্টাই করে থাকেন।
আপনিও আপনার চিন্তাধারায় বৈজ্ঞানিক পন্থা কাজে লাগাতে চান, তাই না? বেশ, এ ব্যাপারে আপনি যদি বৈজ্ঞানীকভাবে চিন্তা করতে না পারেন তাহলে কিন্তু দোষ আপনারই।
আপনার যে ভুলও হতে পারে এ কথাটা স্বীকার করলে আপনি কখনই কোন ঝামেলায় পড়বেন না। এরকম করলে সব রকম তর্কের অবসান ঘটবে আর অপর ব্যক্তিকে অনুপ্রাণিত করে আপনি যেরকম পরিষ্কার আর উদার মনোবৃত্তিসম্পন্ন তাকেও সেই রকমই করে তোলে। এর ফলে সে যে ভুল করতে পারে সেটাই স্বীকার করতে চাইবে।
আপনি যদি জানেন কোন লোক ভুল করছে আর আপনি সে কথাটা তাকে মুখের উপরেই বলে ফেললেন, তাহলে কি হতে পারে? আসুন, আপনাদের একটা নির্দিষ্ট ঘটনার উদাহরণ দিই। মিঃ এস, নিউ ইয়র্কের একজন তরুণ অ্যাটনী, একবার আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রীম কোর্টে খুব গুরুত্বপূর্ণ এক মামলায় অংশ গ্রহণ করেছিলেন। বিষয়টাতে প্রচুর টাকা আর গুরুত্বপূর্ণ এক আইনের বিষয় জড়িত ছিল।
বিতর্ক চলার সময়, সুপ্রীম কোর্টের একজন বিচারপতি মিঃ এস-কে বিশেষ একটি আইনের ধারা ছ’বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ এ কথাই বললেন।
মিঃ এস-একটু থমকে বিচারপতির দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ মুখের উপর বলে বসলেন, ‘হুজুর এরকম কোন আইনই নেই।’
ব্যাপারটা সম্বন্ধে মি. এস-পরে লেখকের একটা ক্লাসে বলেছিলেন : আমার কথায় সারা কামরায় নিঃস্তব্ধতা নেমে এলো। মনে হচ্ছিল ঘরের তাপমাত্রা যেন শূন্য ডিগ্রীতেই নেমে গেছে; আমার কথাই ঠিক ছিল। বিচারপতি ভুল কলেছিলেন আর আমি সেই কথাটাই তাঁকে বলে ফেলি। এতে কি তিনি বন্ধুভাবাপন্ন হন? না। আমি এখনও বিশ্বাস করি আইনটা আমারই পক্ষে ছিল আর আমি এও জানতাম সেদিন যেভাবে বিতর্কে অংশ নিয়ে কথা বলি তেমন আর কোনদিন পারিনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি সে মামলায় জিততে পারিনি। আমি দারুণ একটা ভুল করেছিলাম। একজন শিক্ষিত আর জ্ঞানী বিচারপতির মুখের উপর তার ভুল ধরিয়ে দিয়ে।
খুব কম সংখ্যক লোকই যুক্তি মেনে চলে। আমাদের বেশির ভাগই একচোখা আর একপেশে মানুষ। আমাদের বেশির ভাগই আগে থেকে একটা ধারণার বশবর্তী হয়ে থাকি–আর সেটা হয় ঈর্ষা, সন্দেহ, ভীতি, হিংসা এবং অহমিকাবোধ থাকার কারণে। বেশির ভাগ নাগরিকই কিছুতেই তাদের ধর্ম, চুলের ছাঁট, সমাজতন্ত্রবাদ বা ক্লার্ক গেবল সম্বন্ধে ধারণা বদলাতে চান না। অতএব আপনি যদি চান মানুষকে তার ভুল সম্বন্ধে জানিয়ে দেবেন, তাহলে নিচের অংশটা দয়া করে প্রতিদিন সকালে প্রাতরাশের আগে হাঁটু গেড়ে বসে, পড়ে চলুন। এটা প্রফেসর জেমস হার্ভে রবিনসনের আলোকিত একখানা বইয়েরই অংশ। বইটার নাম দি মাইন্ড ইন দ্য মেকিং।‘
