প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের অর্থ সচিব উইলিয়াম জি ম্যাকাড়ু একবার বলেন যে রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন কোন অজ্ঞকে কোনভাবেই তর্ক করে হারানো যায় না।
‘কোন অজ্ঞকে? আপনি খুব নরম করেই বলেছেন মিঃ ম্যাকাণ্ডু। আমার অভিজ্ঞতা হলো–যে কোন লোককেই–তার বুদ্ধির মান যাই হোক না কেন–তর্ক করে হারানো যায় না।
যেমন ধরুন ফ্রেডারিক এস, পার্সন নামে আয়করের একজন অভিজ্ঞ মানুষ একবার একঘন্টা ধরে সরকারী কোন পরিদর্শকের সঙ্গে তর্ক করছিলেন। প্রায় ন’ হাজার ডলার এতে জড়িত ছিল। মিঃ পার্সন বোঝাতে চাইছিলেন ওই ন’ হাজার ডলার তার দেবার কথা নয়–কারণ এ টাকা তিনি পাননি আর পাবেনও না অতএব সেটা কর হিসেবে ধরা হবে কেন?
‘পাওয়া যাবে না! বাজেকথা। এ টাকা দিতেই হবে!’ পরিদর্শকও তর্ক জুড়লেন।
ভদ্রলোকটি বেশ ঠাণ্ডা মাথার এবং কড়া প্রকৃতিরই লোক ছিলেন; অহঙ্কারী মি. পার্সন ঘটনাটির কথা আমার ক্লাসে বলেছিলেন। তাই যুক্তির ব্যাপার যতই বলি কাজে আসবে না…যতই তর্ক করবো ততই উনি একগুঁয়ে হয়ে উঠবেন। আমি তাই ঠিক করলাম বিষয়বস্তু পরিবর্তন করে ওর প্রশংসা করব।
আমি তাই বললাম, আমরা তুচ্ছ ব্যাপারেই তর্ক করছি। বরং আপনাকে অনেক জরুরী কাজ করতে হবে। কঠিন কাজও বটে। আমি নিজে করের ব্যাপারে নিয়ে পড়াশোনা করেছি, বইতেও পেয়েছি। অথচ আপনি সরাসরি কাজের থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। মাঝে মাঝে ভাবি আপনার মত কাজ পেলে করতাম, তাতে অনেক শিখতে পারতাম। আন্তরিকতার সঙ্গেই কথাগুলো বললাম।
‘পরিদর্শক তাঁর চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন। ঝুঁকে পড়ে তাঁর কাজ সম্পর্কে আমায় অনেক কথা শোনালেন। কত রকম জালিয়াতি দেখেছেন তাও জানালেন। আস্তে আস্তে তার গলার স্বর বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে এলো। তিনি এবার তাঁর ছেলেমেয়েদের কথাও বললেন। যাওয়ার সময় তিনি বলে গেলেন আমার সমস্যা নিয়ে ভেবে চিন্তে তাঁর মতামত কদিন পরে জানাবেন।
‘তিনি তিনদিন পরে আমাকে এসে জানালেন আমার আয়করের রিটার্ন যেমন দিয়েছি তাই মেনে নিচ্ছেন।’
এই আয়কর পরিদর্শক যা করেছেন সেটা সাধারণ মানুষের দুর্বলতা অনুযায়ীই করেছেন। তিনি চাইছিলেন নিজের গুরুত্ব বোঝাতে। যতক্ষণ মি. পার্সন তর্ক করেছেন ততক্ষণ তিনিও ছাড়েননি নিজের গুরুত্ব বোঝাতে। কিন্তু যখনই তার গুরুত্ব মেনে নেওয়া হলো, তর্কেরও শেষ হল, আর তিনি সন্তুষ্ট হয়ে সহৃদয়ভাবে কথা বলতে লাগলেন।
সম্রাট নেপোলিয়নের প্রধান ভূত্য কনস্টান্ট প্রায়ই জোসেফাইনের সঙ্গে বিলিয়ার্ড খেলত। সে তার লেখা ‘নেপোলিয়নের’ ব্যক্তিগত জীবনীতে লিখে গেছে যে, সে ওই খেলায় দক্ষ হলেও ইচ্ছে করেই জোসেফাইনের কাছে হার স্বীকার করতো। আর তাতে জোসেফাইন আনন্দ পেতেন।
.
আসুন, আমরা কনস্টান্টের কাছ থেকে একটা ধারাবাহিক শিক্ষা নিই। আমাদের খরিদ্দার, প্রেয়সী আর স্বামী এবং স্ত্রীদের কাছে এবার থেকে ছোটোখাটো সমস্ত ব্যাপারে হার স্বীকার করি।
বুদ্ধ বলেছিলেন : ‘ঘৃণাকে কখনও ঘৃণা দিয়ে জয় করা যায় না, যায় ভালোবাসা দিয়ে।‘ এইরকম ভাবে ভুল বোঝাবুঝিও তর্কের মধ্য দিয়ে সমাধান হতে পারে না বরং সেটা হতে পারে কূটনীতি, আলোচনা আর সহানুভূতি দিয়ে অন্যের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে।
লিঙ্কন একবার একজন তরুণ সামরিক অফিসারকে তার সহকর্মীর সঙ্গে প্রচণ্ড তর্ক করার জন্য তীব্র ভর্ৎসনা করেছিলেন। লিঙ্কন বলেছিলেন : ‘যে মানুষ নিজের উন্নতির চেষ্টা করতে ইচ্ছুক তার ব্যক্তিগতভাবে কখনও ঝগড়া করার সময় থাকে না। যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না বা মাথা গরম করে ফেলে তার পক্ষে উন্নতি করা আর ও কঠিন। কোন কুকুরের কামড় খাওয়ার চাইতে তাকে পথ ছেড়ে দেওয়াই ভালো। কারণ কুকুরটাকে মেরে ফেললেও তার কামড় তো আর ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না।
অতএব এক নম্বর নীতি হলো :
তর্কে জেতার সব সেরা উপায় হল তর্ক না করা।
১১. শত্রুতা এড়ানোর উপায়
একাদশ পরিচ্ছেদ
শত্রুতা এড়ানোর উপায়
থিয়োডোর রুজভেল্ট যখন হোয়াইট হাউসে ছিলেন, তিনি স্বীকার করেছিলেন যে তিনি যদি শতকরা ৭৫ ভাগ ঠিক হতেন তাহলে আশাতীত কিছু করতে পেরেছেন বলেই ভাবতেন। বিংশ শতাব্দীর একজন শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিত্বপূর্ণ মানুষের কাছে যদি এটাই সত্য হয়, তাহলে আমি বা আপনি কি পারবো আশা রাখি?
আপনি যদি একশবারের মধ্যে ৫৫ বার ভুল না হয়ে ঠিক হতে পারেন তাহলে আপনি ওয়ালস্ট্রীটে গিয়ে রোজ দশ লক্ষ ডলার আয় করতে পারেন, তার সঙ্গে একখানা প্রমোদতরী কিনে মস্ত গায়িকা কোন মেয়েকে বিয়েও করতে পারেন। আর ৫৫ বার ঠিক হওয়া সম্বন্ধে যদি আপনার কোন সন্দেহ থাকে তাহলে অন্য লোকেরা ভুল করেছে কথাটা বলা আপনার সাজে কি?
কোন মানুষের গলার স্বর, এমন কি অঙ্গভঙ্গী দেখেও আপনি বলতে পারবেন সে ভুল করছে কিনা-ব্যাপারটা আপনি আপনার দৃষ্টি দিয়েই বুঝিয়ে দিতে পারেন কিছু বলার দরকার হবে না। তাকে যদি তার ভুল ধরিয়েও দেন তাহলে কি চাইবেন সে আপনার মত মেনে নিক? কখনই না কারণ এ কাজের মধ্য দিয়ে আপনি তাকে সরাসরি তার বুদ্ধি, বিবেচনা, অহমিকা আর আত্মসম্মানের উপর আঘাত করেছেন। এতে সে চাইবে আপনাকে প্রত্যাখ্যান করতে। অথচ এর জন্য সে কিছুতেই নিজের মত পাল্টাবে না। এরপর আপনি তাকে প্লেটো, ইমানুয়েল কান্ট বা আর যারই হোক দর্শন প্রয়োগ করতে পারেন, কিন্তু তাতে মত বদলাবে না। যেহেতু আপনি তার অনুভূতিকে আঘাত করে বসেছেন।
