সেই রাতে বাড়ি ফেরার সময় আমি গ্যামণ্ডকে বললাম : ‘ফ্রাঙ্ক, তুমি জানতে ওই উদ্ধৃতিটা শেক্সপীয়ার থেকে নেওয়া।’
তিনি জবাব দিলেন, হ্যাঁ, জানতাম বইকি, ‘হ্যামলেটের পঞ্চর পর্ব দ্বিতীয় দৃশ্য। কিন্তু প্রিয় ডেল আমরা একটা আনন্দ অনুষ্ঠানের অতিথি। লোকটি যে ভুল বলছে কেন তা প্রমাণ করব? তাতে কি তিনি তোমায় পছন্দ করতেন? তাঁর মুখ রক্ষা করতে দেওয়াই উচিত, তাই না? সে তোমার কোন মতামত চায়নি, তাহলে তাঁর সঙ্গে তর্কের দরকার কি? সব সময় বাঁকা পথ এড়িয়ে চলবে।
‘সব সময় বাঁকা পথ এড়িয়ে চলবে।’ কথাটা যিনি বলেছিলেন তিনি আজ আর বেঁচে নেই। কিন্তু যে শিক্ষা তাঁর কাছ থেকে পেয়েছি তা আজও ভুলিনি।
এরকম একটা শিক্ষা আমার দরকার ছিল কারণ আমি প্রায়ই এরকম তর্ক করতাম। ছেলেবেলায় আমার ভাইয়ের সঙ্গে নানা রকম তর্ক করতাম। যখন কলেজে ভর্তি হলাম, তখন আমার একটা বিষয় ছিল তর্কশাস্ত্র। অতএব তর্ক করতে আমার ভালই লাগত, তাই বিতর্ক সভাতেও যোগ দিতাম। আমার জন্ম হয় মিসৌরীতে। আমি পরে তর্ক নিয়ে পড়াই। বলতে লজ্জা করছে এ নিয়ে আমার একটা বই লেখার ইচ্ছেও ছিল। তখন থেকেই আমি কথাবার্তা শুনেছি, সমালোচনা করেছি আর হাজার হাজার মানুষের উপর তার প্রতিক্রিয়াও লক্ষ্য করেছি। তার ফলশ্রুতিতে আমি এটাই উপলব্ধি করেছি যে তর্ক থেকে সবসেরা যে ফল লাভ করা যায় তা হল সেটা এড়িয়ে চলা। তাই তর্ক ব্যাপারটা বিষধর সাপ বা ভূমিকম্পের মত এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।
দশ বারের মধ্যে নবারই কোন তর্কের শেষ পরিণতিতে দুপক্ষই আরও জোরের সঙ্গে ভেবে নেয় তাদের কথাটাই ঠিক।
আপনি তর্কে কখনই জিততে পারবেন না। পারবেন না তার কারণ হল আপনি হেরে গেলে তো হেরেই গেলেন কিন্তু আপনি জিতলেও হারবেন। সেটা কিভাবে? আপনি যদি প্রমাণ করেন কারও কথা ষোল আনাই ভুল তাতেই বা কি হবে? আপনার দারুণ ভাল লাগবে। কিন্তু অপর লোকটার কি রকম হবে? তাকে আপনি ছোট প্রমাণিত করেছেন। আপনি তাঁর অহমিকায় আঘাত করেছেন। সে আপনার ওই জয় মেনে নেবে না। তাছাড়া একটা কবিতাতেই বলা আছে–
কোন ব্যক্তিকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু মেনে নিতে বাধ্য করলেও সে তার মত পাল্টায় না।
পেন মিউচুয়াল বীমা প্রতিষ্ঠান তাদের বিক্রেতাদের জন্য একটা বিশেষ নীতি ঠিক করে দিয়েছে—’কখনও তর্ক করবেন না।’
সত্যিকার বিক্রেতার কাজ কিন্তু তর্ক করা নয়। তর্কের কাছাকাছিও নয়। তর্ক করে মানুষের মন বদলান যায় না।
একটা উদাহরণ দিচ্ছি। বেশ কবছর আগে একজন তার্কিক আইরিশ আমার ক্লাসে যোগ দেয়, নাম প্যাট্রিক জে, ওহেয়ার। তার লেখাপড়া তেমন ছিল না বটে তবে তর্ক করতে সে বেশ ভালোবাসতো! একসময় সে শোফারের কাজ করতো, সে আমার কাছে এসেছিল এই জন্য যে, সে কিছুট্রাক বিক্রির চেষ্টা করছিল। কথায় কথায় প্রকাশ পেল যে, সে যাদের কাছে ট্রাক বিক্রির চেষ্টা করছিল তাদের সে প্রায় তর্ক করে ওর শত্রু বানিয়ে ফেলেছিল। কেউ যদি তার ট্রাকের কোন নিন্দে করতো তাহলেও ক্ষেপে গিয়ে তার প্রায় গলা টিপতে বাকি রাখত। সে আমায় পরে বলেছে কোন অফিস ছেড়ে আসার সময় ও বলত : ‘ব্যাটাকে আচ্ছা করে কথা শুনিয়ে দিয়েছি, তবে কিছু বিক্রি করতে পারিনি।’
আমার প্রাথমিক সমস্যা অবশ্য প্যাট্রিককে কথা বলানো ছিল না। আমার প্রথম কাজ হল তার কথা বলানো বন্ধ করে তর্ক এড়িয়ে চলার উপদেশ দান।
মিঃ ওহেয়ার এখন নিউ ইয়র্কের হোয়াইট মোটর কোম্পানির একজন সেরা বিক্রেতা। কি করে এটা করলেন তিনি? তাঁর নিজের কথাতেই শুনুন : আমি কোন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে যদি শুনি; কি? সাদা ট্রাক? ওগুলো একটুও ভাল না। বিশ পয়সায় দিলেও নেব না। আমরা অমুক কোম্পানীর লরী কিনব। আমি তার জবাব দিতাম : ভাই একটু শুনুন। ওই ট্রাক সত্যিই ভাল। ওটা কিনলে ভুল করবেন না। ওই কোম্পানীর লোকেরাও চমৎকার।
‘ভদ্রলোক প্রায় বোবা হয়ে যেতেন, তাঁর তর্ক করার আর সুযোগ থাকত না। তিনি যাদের ট্রাক সেরা বললেন আমি সেটাই সমর্থন করলাম। আর তর্ক করার সত্যিই কোন অবকাশ রাখিনি। আমি অপরের জিনিসকেই সেরা ব্যাখ্যা দিয়েছিলাম।
‘আগে কিন্তু এরকম ব্যাপার ঘটতই না, আমি ক্ষেপে উঠতাম, আর তর্ক জুড়ে দিতাম। অন্য কোম্পানীর নিন্দাও করতাম।
‘পুরনো দিনের কথা যখন ভাবি তখন মনে হয় কিভাবে সব বিক্রি করতে পারলাম। তর্ক করতে গিয়েই তো কত বছর অপব্যয় করেছি। এখন আমি মুখ বন্ধ রাখি। তাতে কাজ হয়।
জ্ঞানী বুড়ো বেনজামিন ফ্রাঙ্কলিন যেমন বলতেন :
‘প্রতিবাদ, তর্ক ইত্যাদি করলে মাঝে মাঝে জয় হয় বটে–সে জয় বিরাট শূন্যতায় ভরা, তাতে অপরের হৃদয় পাওয়া যায় না কখনও।’
অতএব হিসেবটা নিজেই করে দেখুন আপনি কোটা চান : সাধারণভাবে নাটকীয় কোন জয় না মানুষের শুভেচ্ছা? দুটো একসঙ্গে কদাচিতই মেলে।
বোস্টন ট্রান্সকিপ্টে একবার একটি কবিতা ছাপা হয়। কবিতাটির মর্মার্থ এই রকম।
‘এখানে সমাধিস্থ রয়েছেন উইলিয়াম জে, যিনি তাঁর পথ চলার অধিকার বজায় রাখতে গিয়ে মারা যান। তিনি নির্ভুল কাজ করেছিলেন-মৃত্যুর মতই নির্ভুল-তবু তিনি মৃত, যেন ভুলই করেছিলেন।‘
.
আপনি হয়তো ঠিক, একদম ঠিক থাকবেন তর্কের পথে চলতে গিয়ে। তবে অপর ব্যক্তির মন নিয়ে কথা বললে সেটা হয়তো একেবারেই নিরর্থক হবে।
