অ্যাডামসন শুধু এইটুকুই চাইছিলেন।
তাকে যখন ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো তিনি দেখলেন মিঃ ইস্টম্যান তাঁর ডেক্সের সামনে কিছু কাগজের উপর ঝুঁকে পড়ে দেখছেন। একটু পরেই মুখ তুললেন মিঃ ইস্টম্যান তারপর চশমা খুলে স্থপতি আর মিঃ অ্যাডমসনের দিকে এগিয়ে এলেন।
সুপ্রভাত, ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের জন্য কি করতে পারি? তিনি বললেন।
স্থপতি তার পরিচয় দিতেই মি. অ্যাডামসন বললেন : ‘আপনার জন্য অপেক্ষা করার ফাঁকে আপনার চমৎকার অফিসের তারিফ করছিলাম। সুযোগ পেলে এরকম একটা ঘরে কাজ করতে পারলে খুব ভালো লাগতো। আপনি বোধ হয় শুনে থাকবেন আমি বাড়ি সাজানোর কাজ করি। জীবনে এতো সুন্দর সাজানো অফিস আমি কখনও দেখিনি।’
জর্জ ইস্টম্যান জবাবে বললেন : আপনি এমন কিছু মনে করিয়ে দিলেন যে কথা একেবারে ভুলেই গিয়েছিলাম। এটা সুন্দর বলেছেন, তাই না? এটা যখন প্রথম বানানো হয় তখন সত্যিই এটা উপভোগ করতাম। কিন্তু আজকাল এত রকম কাজে ব্যস্ত থাকতে হয় যে কয়েক সপ্তাহ ধরেই হয়তো ঘরটার দিকে তাকানোই হয়ে ওঠে না।
অ্যাডামসন এগিয়ে গিয়ে একটা প্যানেলে হাত রাখলেন। এটা ইংলিশ ওক কাঠে বানানো তাই না? ইতালীয় ওকের চেয়ে এর খাজগুলো আলাদা।
‘হ্যাঁ, ইস্টম্যান জবাব দিলেন। এটা ইংল্যান্ড থেকে আমদানি করা ওক। কাঠের বিষয়ে অভিজ্ঞ আমার একজন বন্ধুই এটা বেছে দিয়ে ছিলেন।
এরপর ইস্টম্যান অ্যাডামসনকে ঘরে ঘুরতে ঘুরতে নানা জিনিসপত্র, রঙ, হাতের কাজ ইত্যাদি দেখাতে লাগলেন যেগুলো তাঁরই ইচ্ছেমত বানানো হয়।
ঘরটায় ঘুরতে ঘুরতে তারা একটা জানালার সামনে এসে দাঁড়ালেন। জর্জ ইস্টম্যান এবার খুব আস্তে আস্তে তার স্বভাবসিদ্ধ বিনয়ের সঙ্গে তাঁর কিছু জনদরদী কাজের নমুনা দিচ্ছিলেন। এসবের মধ্যে ছিল রচেষ্টার বিশ্ববিদ্যালয়, জেনারেল হাসপাতাল, ফ্রেণ্ডলি হোম, শিশু হাসপাতাল ইত্যাদি। মিঃ অ্যাডামসন তাঁকে আন্তরিকভাবেই তাঁর মানবদরদী কাজে অর্থব্যয় করার জন্যে অভিনন্দন জানালেন। একটু পরেই জর্জ ইস্টম্যান একটা কাঁচের বাক্স খুলে একটা ক্যামেরা বের করলেন, একজন ইংরেজের কাছ থেকে কেনা এই ক্যামেরাটি তিনি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন।
.
অ্যাডামসন এরপর জর্জ ইস্টম্যানকে তাঁর ছেলে বেলার কথা, কি করে তিনি ব্যবসা আরম্ভ করেন সব জিজ্ঞাসা করতেই মি. ইস্টম্যান আন্তরিকভাবে তাঁর ছেলেবেলার দারিদ্র্যময় জীবনের কাহিনী শোনালেন। তিনি জানালেন কিভাবে তার বিধবা মা একটা বোর্ডিং হাউস চালাতেন আর তিনি রোজ মাত্র পঞ্চাশ সেন্ট মাইনেয় একটা বীমা কোম্পানির কেরানির কাজ করতেন। দারিদ্রের ভয়ঙ্কর দিনরাত তাড়া করে চলত, তাই তিনি শপথ করেছিলেন জীবনে অনেক টাকা করবেন যাতে মাকে কখনও বোর্ডিং হাউসের কাজ করে মৃত্যুর দিকে যেতে না হয়। মি. অ্যাডাম আরও প্রশ্ন করে অনেক কিছু আগ্রহ নিয়ে শুনে গেলেন-মিঃ ইস্টম্যান আরও বললেন শুকনো ফটোগ্রাফির প্লেট নিয়ে তিনি কিভাবে কাজ করেছেন। তিনি শোনালেন কিভাবে তিনি দিনরাত পরিশ্রম করে যান; কখনও সারারাত ধরে। কাজের ফাঁকে কখনও বা একটু ঘুমিয়ে নিতেন। একই পোশাক একটু ঘুমিয়ে কখনও বা টানা বাহাত্তর ঘন্টাও কাজ করেছিলেন তিনি।
জেমস অ্যাডামসন জর্জ ইস্টম্যানের ঘরে ঢোকেন দশটা পনেরোয়, তাঁকে জানানো হয়েছিল মাত্র ৫ মিনিটের বেশি সময় পাওয়া যাবে না। কিন্তু এক ঘন্টা কেটে গেল, দুঘন্টাও গেল তারা তখনও কথা বলে যাচ্ছিলেন।
শেষ পর্যন্ত জর্জ ইস্টম্যান অ্যাডামসনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘শেষবার যখন জাপানে যাই কয়েকটা চেয়ার কিনে বাড়ি নিয়ে আসি। সেগুলো বারান্দায় রেখেছি। কিন্তু রোদ্দুরে লেগে রঙ চটে যাওয়ায় আমি রঙ কিনে নিজেই এগুলো রঙ করেছি। আমি কেমন চেয়ার রঙ করতে পারি একবার দেখবেন নাকি? ঠিক আছে, চলুন বাড়ি গিয়ে আমার সঙ্গে মধ্যাহ্ন ভোজ সারবেন তারপর আপনাকে দেখাবো।’
মধ্যাহ্ন ভোজের পর মি. ইস্টম্যান অ্যাডামসনকে তার জাপান থেকে আনা চেয়ার দেখালেন। চেয়ারগুলোর দাম দেড় ডলারের বেশি নয়। কিন্তু জর্জ ইস্টম্যান যিনি ব্যবসাতে একশ কোটি টাকা করেছেন, চেয়ারগুলো নিজেই রঙ করেছেন বলে গর্ববোধ করতেন।
চেয়ারগুলোর জন্য যে অর্ডার দেবার কথা তার মোট দাম প্রায় ৯০,০০০ ডলার ছিল। অর্ডারটা কে পেয়েছিল বলে আপনার ধারণা-জেমস অ্যাডামসন না তার কোন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান?
এরপর থেকে মি, ইস্টম্যানের মৃত্যু পর্যন্ত তিনি আর জেমস অ্যাডমসন ঘনিষ্ট বন্ধু হয়েই ছিলেন।
এবার বলুন দেখি আপনি বা আমি এই প্রশংসা করার ইন্দ্রজাল স্পর্শ কোথা থেকে শুরু করবো? নিজের বাড়িতেই শুরু করুন না কেন? অন্ততঃ আর কোন জায়গার কথা আমার জানা নেই যেখানে এর প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি বা যে জায়গায় সবচেয়ে বেশি অবহেলা করা হয়। আপনার স্ত্রী নিশ্চয়ই কিছু ভালো গুণ আছে–অন্ততঃ সেটা নিশ্চয়ই ভাবতেন, না হলে তাকে বিয়ে করতেন না। কিন্তু কতদিন আগে তার আকর্ষণ সম্পর্কে তারিফ জানিয়েছেন আপনি? কতদিন আগে মনে আছে? বলুন কতদিন হলো?
কয়েক বছর আগে নিউ ব্রানসউইকের মিরামিচির কোন জলাশয়ে মাছ ধরছিলাম। আমি এজন্য কানাডীয় অরণ্য এলাকায় একটা নির্জন তাবুতেই থেকে যাই। পড়বার মতো পেতাম কেবল গ্রামের কোন খবরের কাগজ। কাগজের সবই আমি পড়ে ফেলতাম মায় বিজ্ঞাপন পর্যন্ত আর ডরোথি ডিক্সের একটা প্রবন্ধও। তাঁর প্রবন্ধটা এতই সুন্দর ছিল যে সেটা কেটে রেখে দিই। তার কথা হলো কনেকে দেয়া বক্তৃতা শুনতে শুনতে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর উপদেশ হলো বরকে একপাশে টেনে নিয়ে তাকে এই উপদেশটা কারও দেওয়া উচিত :
