বৃদ্ধা এরপর তাকে সারা বাড়ি ঘুরিয়ে দেখাতে লাগলেন। বৃদ্ধ সারাজীবন ধরে নানা দেশ বেড়িয়ে যেসব জিনসপত্র এনে সাজিয়েছেন, সব কিছুরই মি, আর অকুণ্ঠ প্রশংসা করতে লাগলেন। চমৎকার কাজ করা শাল, পুরনো আমলের চায়ের সরঞ্জাম, চীনামটির পাত্র ফ্রেঞ্চ বিছানা আর চেয়ার, ইতালীয় তেলরঙা ছবি, আর রেশমী পর্দা, যেটা কোনকালে ফরাসি দুর্গে শোভা পেত।
আমাকে বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখানোর পর মি. আর বলেছিলেন, বৃদ্ধা আমায় নিয়ে গেলেন একটা গ্যারেজে। সেখানে যত্ন করে রাখা ছিল একটা প্যাকার্ড গাড়ি প্রায় নতুন।
‘আমার স্বামী মারা যাওয়ার অল্পদিন আগেই গাড়িটা কিনেছিলেন’, নরম গলায় বললেন বৃদ্ধা। তাঁর মৃত্যুর পর আমি আর গাড়িটায় চড়িনি … তুমি ভালো জিনিসের কদর বোঝ, তাই তোমাকেই আমি গাড়িটা উপহার দেব।’
‘সেকি পিসীমা’, মিঃ আর বললেন, একি বলছেন। আপনার এ সদাশয়তা সত্যিই চমৎকার। কিন্তু আমি তো তা নিতে পারবো না। আমি তো আপনার কোন আত্মীয়ই নই, তাছাড়া আমার একটা গাড়ি আছে। আপনার কত আত্মীয় আছে তারা গাড়িটা পেলে খুশি হবে।
‘আত্মীয়। বৃদ্ধা বলে উঠলেন। হ্যাঁ, আমার অনেক আত্মীয় আছে, তারা চাইছে আমি মরলে তারা গাড়িটা পাবে। কিন্তু না, তারা গাড়িটা পাচ্ছে না।
কাউকে যদি গাড়িটা না দিতে চান তাহলে যারা পুরনো গাড়ি কেনাবেচা করে তাদের কাছে বিক্রি করতে পারেন,’ মিঃ আর বললেন।
বিক্রি করব! বৃদ্ধা চেঁচিয়ে উঠলেন, তুমি কী করে ভাবলে এ গাড়ি আমি বিক্রি করবো? তুমি কি ভাবছ যে গাড়ি আমার স্বামী আমার জন্য কিনেছিলেন তাতে অচেনা মানুষরা চড়বে সেটা আমি সহ্য করবো? আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না এ গাড়ি বিক্রি করব। আমি এটা তোমাকেই দেব। কারণ তুমি ভালো জিনিসের প্রশংসা কর!
মিঃ আর নানাভাবে উপহারটা না নেবার চেষ্টা করলেন কিন্তু বৃদ্ধার মনে আঘাত লাগবে বলেই তা পারলেন না।
এই বৃদ্ধা বিরাট একটা বাড়িতে তার দামী জিনিসপত্র সেই শাল, ফরাসী ছবি, চায়ের সরঞ্জাম সব কিছু নিয়ে শুধু একটু মর্যাদা আর মমত্ববোধই চেয়েছিলেন। একদিন অতি সুন্দরী আর সবার প্রিয় এক যুবতীই তিনি ছিলেন। একদিন ভালোবাসা দিয়ে একটা বাড়ি তৈরি করে সারা ইউরোপ ঘুরে জিনিস এনে তা সাজিয়েও ছিলেন সুন্দর করে তোলার জন্যেই। আর আজ বৃদ্ধ বয়সে নিঃসঙ্গতায় তিনি কেবল চাইছিলেন একটু মানব হৃদয়ের উষ্ণতা আর সামান্য প্রশংসা–কিন্তু তা কেউ তাকে দেয়নি। তাই সেটা যখন পেলেন তা হয়ে উঠলো মরুভূমির বুকে ঝরণার মতো–তার কৃতজ্ঞতা তাই ওই প্যাকার্ড গাড়িখানা উপহার দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারলেন না।
আর একটা উদাহরণ দিই। কাহিনীটি বলেছেন নিউইয়র্কের লুইস অ্যাণ্ড ভালেন্টাইনের প্রাকৃতিক দৃশ্যের শিল্পী ডোনাল্ড এম. ম্যাকমোহন।
তাঁর কথাতেই এবার শোনা যায় : ‘বন্ধুত্বলাভ ও প্রভাব বিস্তার’ সম্পর্কে বেতার কথিকাটি শোনার ঠিক পরেই আমি একজন বিখ্যাত অ্যাটনীর এস্টেটের ল্যাণ্ডস্কেপ আঁকছিলাম। বাড়ির মালিক এক সময় এসে আমায় একটু উপদেশ দিলেন–কোথায় একগুচ্ছ রডোড্রেনডন ফুলগাছ লাগাবেন।
আমি বললাম, ‘জজ সাহেব, আপনার ভারি চমৎকার শখ আছে তো। আপনাদের সুন্দর ওই কুকুরগুলো চমৎকার। আমার ধারণা ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে কুকুর প্রদর্শনীতে আপনি প্রচুর পুরস্কার পেয়েছেন।’
‘হ্যাঁ,’ জজসাহেব বললেন, ‘কুকুরদের নিয়ে আমার খুব আনন্দ। আমার কুকুরের ঘর দেখবেন?’
এরপর তিনি এক ঘন্টা ধরে তার কুকুর আর সব পুরস্কারগুলো আমায় দেখালেন। তাছাড়া কুকুরের বংশপরিচয়ও আমাকে দিলেন।
শেষ পর্যন্ত তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন : ‘আপনার কোন ছোট ছেলে আছে?’
হ্যাঁ’, আছে,’ আমি জবাব দিলাম।
জজসাহেব এবার জানতে চাইলেন। ‘একটা কুকুরছানা তার ভালো লাগবে না?’
‘ওহ্ হ্যাঁ, সে প্রায় আনন্দে লাল হয়ে যাবে।‘
‘ঠিক আছে, তাকে একটা কুকুরছানা উপহার দিচ্ছি,’ জজসাহেব বললেন।
এরপর তিনি আমায় বুঝিয়ে দিলেন কেমন করে কুকুরছানাটাকে খাওয়াতে হয়। তারপর নিজেই একটু থেমে জানালেন, মুখে বললে আমি ভুলে যাবো তাই কাগজে তিনি সব লিখে দেবেন। জজ সাহেব তখন ঘরে গিয়ে কুকুরছানার বিষয়ে সমস্ত কিছু লিখে দিলেন, এমনি কি তার বংশ পরিচয় পর্যন্ত। তিনি তাঁর একঘন্টা পনেরো মিনিট মূল্যবান সময় নষ্ট করে প্রায় একশ ডলার দামের কুকুরছানাটাও সঙ্গে দিলেন। এর কারণ আর কিছুই না, আমি শুধু তার শখ সম্বন্ধে আমার আন্তরিক প্রশংসা জানিয়ে ছিলাম বলেই।
.
কোডাকের বিখ্যাত জর্জ ইস্টম্যান যিনি ফিল্ম আবিষ্কার করেন আর যার ফলে চলচ্চিত্র তৈরিও সম্ভবপর হয়। জীবনে প্রায় একশ কোটি ডলার আয় করেছিলেন আর পৃথিবীর একজন খ্যাতনামা ব্যবসায়ী বলেও নাম কেনেন। অথচ এই ধরনের দারুণ নাম করা সত্ত্বেও তিনি আমার বা আপনার মতো সামান্য একটু প্রশংসার কাঙাল ছিলেন।
বেশ কয়েকবছর আগে ইস্টম্যান তাঁর মায়ের স্মৃতিরক্ষার জন্য রেচেষ্টারে স্কুল অব মিউজিক আর কিলবোর্ন হল নামে একটি নাট্যমঞ্চ তৈরী করেছিলেন। ওই সময় নিউইয়র্কের সুপিরিয়র সীটিং কোম্পানীর প্রেসিডেন্ট জেমস অ্যাডামসন ওই বাড়িগুলোর জন্য থিয়েটারের চেয়ার সরবরাহ করার অর্ডারটা পাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ইস্টম্যানের স্থপতিকে ফোন করে তিনি মিঃ ইস্টম্যানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করলেন।
