তার কাহিনীটা হলো এই রকম : হল কেইন সনেট আর বীরগাথা ভালো বাসতেন। আর তাই তিনি দান্তে, গ্যাব্রিয়েল, রসেটির সব কবিতা একেবারে গোগ্রাসেই গিলে ফেলেন। এ ছাড়াও তিনি রসেটির শিল্পমণ্ডিত রচনার অকুণ্ঠ প্রশংসা করে একটা বক্তৃতা বানিয়ে ফেলেন–আর স্বয়ং রসেটিকেই একটা কপি পাঠিয়ে দেন। রসেটি সেটা পেয়ে দারুণ খুশি হন। রসেটি হয়তো স্বগতোক্তি করেছিলেন : ‘যে তরুণ আমার রচনা সম্পর্কে এ রকম উঁচু ধারণা পোষণ করে সে নিঃসন্দেহে দারুণ কিছু। তাই রসেটি ওই কামারের ছেলেকে লণ্ডনে এসে তার সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করার আমন্ত্রণ জানালেন। এটাই হল কেইনের জীবনের মোড় ঘোরার প্রথম অংশ। এই ভাবেই তিনি সে কালের শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পীদের সংস্পর্শে এলেন। তাঁদের পরামর্শ আর উৎসাহে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি এমন এক জীবনে প্রবেশ করলেন যে জীবনকে তিনি আলোক উদ্ভাসিত করে তুললেন–সারা আকাশে বাতাসে তা ছড়িয়ে গেল। তাঁর বাড়ি আইল অব ম্যানের গ্রীবা ক্যাসল সারা বিশ্বের ভ্রমণ বিলাসীদের কাছে হয়ে উঠেছিল একেবারে মক্কার মতো। এছাড় তিনি রেখে গেলেন কয়েক কোটিরও বেশি টাকার সম্পত্তি। তা সত্ত্বেও-কে বলতে পারে–তিনি হয়তো গরীবের মতই মারা যেতেন অনামা হয়ে, শুধু যদি না তিনি একজন খ্যাতনামা মানুষকে প্রশংসা করে একটা প্রবন্ধ না লিখতেন।
হৃদয় থেকে করা আন্তরিক প্রশংসার শক্তিই এই অফুরন্ত সে শক্তি।
রসেটি নিজেকে বড় মানুষ বলেই ভাবতেন। তাতে অবাক হবার কিছু নেই। প্রায় সব মানুষই নিজেকে খুব বড় বলে ভেবে থাকে।
আর ঠিক সেই রকমই ভাবে প্রতিটি জাতিই।
.
আপনি কি ভাবেন জাপানিদের চেয়ে আপনি শ্রেষ্ঠ? আসল সত্য হলো জাপানীরা আবার আপনাদের চেয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলে ভাবে। কোন রক্ষণশীল জাপানি কোন সাদা চামড়ার মানুষকে জাপানি মহিলার সঙ্গে নাচতে দেখলে ক্ষেপে আগুন হয়ে যায়।
আপনারা কি নিজেদের ভারতের হিন্দুদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করেন? অথচ হিন্দুরা নিজেদের আপনার চেয়ে ঢের বেশি শ্রেষ্ঠ বলেই ভাবে। আপনি কি নিজেদের এক্সিমোর চেয়ে সেরা বলে ভাবেন? এটা অবশ্যই, আপনার ব্যক্তিগত ইচ্ছা ছাড়া আর কিছু না। তবে এক্সিমোরা আপনাদের সম্পর্কে কি রকম ভাবে একটু জানতে চান? এক্সিমোর মধ্যে এমন কিছু লোক আছে যারা ভারি অলস, তারা কাজকর্ম করতেই চায় না। এক্সিমোরা তাদের বলে সাদা চামড়ার মানুষ’-এর কারণ হলো এটাই তাদের ঘৃণার চরম প্রকাশ।
যে কোন জাতিই অন্য জাতির চেয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলে ভাবে। আর এর থেকেই জন্ম নেয় দেশপ্রেম–আর যুদ্ধ।
খোলাখুলি সত্য কথাটা হলো, যে কোন মানুষের সঙ্গেই আপনার দেখা হোক না কেন সে নিজেকে আপনার চেয়ে যে কোন দিক থেকেই তোক শ্রেষ্ঠ বলে ভাবে। তার হৃদয়ে প্রবেশাধিকার করার নিশ্চিত উপায় হলো, যে কোন রকমেই তাকে জানিয়ে দেওয়া এই ছোট্ট পৃথিবীতে তার গুরুত্ব সম্বন্ধে আপনি ওয়াকিবহাল, আর এ কাজটা করবেন আন্তরিক ভাবেই।
এমার্সন কি বলেছেন একটু স্মরণ রাখবেন : যে কোন মানুষের সঙ্গেই আমার দেখা হোক, আমি জানি কোন না কোন বিষয়ে সে আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
আর এর ভিতরে সবচেয়ে দুঃখজনক অবস্থা হলো যাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের কণামাত্র সত্যিই নেই তারা নিজেদের অসামার্থ ঢাকতে গলাবাজী করে লোক ঠকাতে চেষ্টা করে। ব্যাপারটা সত্যি সত্যিই কদর্যতায় ভরা।
শেক্সপিয়ার এ সম্পর্কে বলেছিলেন : ‘মানুষ! গর্বিত মানুষ! সামান্য অধিকারের সাজে সজ্জিত হয়ে সে এমন সব অদ্ভুত কাজ করে যাতে স্বর্গের দেবদূতরাও কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে।‘
.
আমি এবার জানাতে চাই আমার নিজের পাঠক্রমের ছাত্র কিছু ব্যবসায়ী মানুষ এই নীতিগুলো কাজে লাগিয়ে কি অভুতপূর্ব ফল লাভ করেছেন। প্রথমেই ধরা যাক কানেকটিকাটের সেই অ্যাটনীর কথাটাই। তিনি তাঁর আত্মীয়স্বজনের জন্যেই নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি।
আমার পাঠক্রমে যোগ দেবার ঠিক পরে তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে ভদ্রলোক, (যাকে আমরা মিঃ ‘আর’ বলে ডাকবো) কিছু আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে লং আইল্যাণ্ড যাত্রা করেন। তাঁর স্ত্রী এরপর গেলেন তার এক বৃদ্ধা পিসীর সঙ্গে কথা বলতে, তারপর সেখান থেকে অন্যান্য ছোট বয়সের আত্মীয়দের দেখতে। মিঃ আর’কে যেহেতু প্রশংসা করার ব্যাপারটা কাজে লাগিয়ে দেখতে হবে সেই জন্যেই তিনি ঠিক করলেন ওই বৃদ্ধাকে দিয়েই শুরু করবেন। সেই জন্য বাড়ির চারদিকে তিনি তাকিয়ে দেখার চেষ্টা
করতে লাগলেন কি দিয়ে প্রশংসা শুরু করা যায়।
তিনি জানতে চাইলেন, ‘এ বাড়িটা ১৮৯০ সালে বানানো হয়েছিল, তাই না?’
‘হ্যাঁ’, বৃদ্ধা জবাব দিলেন ‘ঠিক ওই বছরেই তৈরি হয়।‘
‘এটা দেখেই যে বাড়িতে আমার জন্ম হয় তার কথা মনে পড়ছে’, মিঃ আর বললেন, ‘ভারি চমৎকার বাড়িটা। কি সুন্দর করে বানানো। কত ঘর। জানেন তো, আজকাল আর কেউ এরকম করে বানাতে চায় না।’
তুমি ঠিক বলেছো, বৃদ্ধা বললেন, ‘আজকালকার ছেলেবয়সীরা আর সুন্দর করে বাড়ি বানাতে চায় না। তারা চায় শুধু ছোট্ট একটা অ্যাপার্টমেন্ট, ইলেকট্রিক বরফের বাক্স, তারপর কেবল তাদের মোটর গাড়ি চড়ে হাওয়া খেয়ে বেড়াতে।’
একটু থামলেন বৃদ্ধা।
‘এ বাড়িটা স্বপ্নের বাড়ি, তারপর আবার বলে চললেন আগের স্মৃতি আর সুখস্বপ্ন রোমন্থন করতে করতে। এ বাড়ি তৈরি হয়েছিল ভালোবাসা দিয়ে। আমার স্বামী আর আমি এটা তৈরি করার অনেক আগে থেকেই স্বপ্ন দেখেছি। আমাদের কোন সম্পত্তি ছিল না। সব পরিকল্পনাই আমরা নিজেরা করি।’
