হ্যাঁ, লোকটির কাছ থেকে আমি কিছু আদায় করতে চাইছিলাম। দাম দেওয়া যায় না এমন কিছুই আমি চাইছিলাম, আর তা পেয়েও ছিলাম। আমার এটাই লাভ হয়েছিল যে আমি আমার জন্য কিছু না চেয়েও একটা চমৎকার মানসিক আনন্দ লাভ করি। এরকম মানসিক অনুভূতি উজ্জ্বল আনন্দময় হয়ে মানুষের স্মৃতিতে ঘটনার পরেও জ্বলজ্বল করে।
মানুষের ব্যবহারের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ আইন আছে। আমরা সেই আইন মেনে চললে, আমরা বলতে গেলে জীবনে কোনদিনই ঝামেলায় পড়বো না। আসলে এই আইন মেনে চললে তার বদলে পেয়ে যাবো অসংখ্য বন্ধু আর অনাবিল সুখ। কিন্তু যে মুহূর্তে আমরা এ আইন ভঙ্গ করবো তখনই আমরা সীমাহীন ঝামেলায় পড়ে যাব। আইনটা হলো এই রকম : ‘সব সময়েই অপর ব্যক্তিটিকে শ্রেষ্ঠত্ব উপলব্ধি করতে সুযোগ দিন।‘ আগেই বলেছি প্রফেসর জন ডিউই বলেছেন যে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ভাবা মানুষের একটা চিরন্তন আকাঙক্ষা। প্রফেসর উইলিয়া জেমস বলেন : ‘মানব চরিত্রের গভীরতম নীতি হলে প্রশংসিত হওয়ার আশা।’ আগেই যেমন বলেছি এই আকাঙক্ষাই আমাদের অন্যান্য সব প্রাণীদের সঙ্গে তফাৎ বুঝিয়ে দেয়। এই আকাঙক্ষাই আসলে সভ্যতা সৃষ্টির মূল।
দার্শনিকরা হাজার হাজার বছর ধরেই মানবিক সম্পর্ক নিয়ে নানা চিন্তা ভাবনা করে আসছেন। আর ওই সব চিন্তা ভাবনার মধ্য থেকে যে ফসল মিলেছে তা হলো একটা গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এটা নতুন কিছু নয়–এ ইতিহাসের মতই পুরনো। জরথুষ্ট্র তিন হাজার বছর আগে তাঁর সব অগ্নি-উপাসক অনুগামীকে শিক্ষা দেন। কনফুসিয়াস চীনদেশে এটা শিখিয়েছেন ২৪০০ বছর আগে। লাওৎসে, তাও ধর্মের উদগাতা যিনি, সেটা শিখিয়েছিরেন হান উপত্যকায় তাঁর শিষ্যদের। বুদ্ধদেব এটা শিখিয়েছিলেন খ্রষ্টের জন্মের পাঁচশ বছর আগে পবিত্র গঙ্গার তীরে বসে। হিন্দুদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থগুলি তারও হাজার বছর আগে এটা শিখিয়েছিল। যীশু একটা মাত্র বাক্যেই এটা প্রকাশ করেছিলেন আর এটাই হয়তো সারা বিশ্বে সবচেয়ে দামী কোন নীতি : ‘অন্যের প্রতি সেই ব্যবহারই কর অন্যের কাছ থেকে যা আশা কর।’
আপনি যাদের সংস্পর্শে আসেন তাদের সমর্থন আশা করেন। আপনি চান, আপনার প্রকৃত মূল্যায়ন। আপনি চান, আপনার ছোট্ট দুনিয়ায় নিজের গুরুত্ব। আপনি কখনই সস্তাদরের ফাঁপা তোষামোদ চান না, বরং চান সত্যিকার প্রশংসা আপনি আশা করেন, আপনার বন্ধুবান্ধবী আর সহকর্মীরা চার্লস্ শোয়াব যেমন বলে গেছেন সেই রকম হবে। তিনি যা বলেছেন : তারা দেবে হৃদয়ের স্বীকৃতি আর কমবে সত্যিকার প্রশংসা। আমরা সবাই তাই চাই।
.
অতএব আসুন আমরা সোনার অক্ষরে লেখা নীতিটাই বরং মেনে চলি। আর অন্যদের সেই জিনিসই দিই যা তাদের কাছ থেকে আমরা আশা করি।
কিন্তু কেমন করে? কখন আর কোথায়? এর উত্তর হলো সব সময়েই আর সব জায়গাতেই।
যেমন উদাহরণ হিসেবে রেডিও সিটির খবর সরবরাহকারী কেরানীর কাছে আমি একবার হেনরি শুভেইন অফিসের নম্বরটা চেয়েছিলাম। পরিচ্ছন্ন আর চমৎকার পোশাক পরিহিত লোকটি যেভাবে জবাব দিল তাতে মনে হলো সে খবরটা জানিয়ে বেশ গর্ব বোধ করছিল। বেশ পরিষ্কারভাবে সে জানাল : ‘হেনরি শুভেইন। (বিরতি) উনিশতল, ঘরের নম্বর ১৮১৬।
আমি এলিভেটরের দিকে ছুটে গিয়েই থমকে দাঁড়ালাম, তারপর আবার ফিরে এসে বললাম, ‘আপনি যেভাবে সব জানালেন তার জন্য আপনাকে অভিনন্দন জানাতে চাই। আপনি বেশ সুন্দর, পরিষ্কার করে উত্তর দিয়েছেন। আপনি ঠিক কোন শিল্পীর মতই কাজ করেছেন। ভারি চমৎকার।’
খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে কেরানীটি জানালো কেন কথার ফাঁকে ফাঁকে সে একটু বিরতি দিয়েছে। কেরানীটি আমার প্রশংসায় সত্যিই খুব গর্বিত বোধ করতে শুরু করেছিল। উনিশতলায় যাওয়ার অবসরে আমার এই ভেবেই বেশ আনন্দ হল যে, অন্ততঃ ওইদিন বিকেলে একজনের মনে মানুষের আকাঙিক্ষত সুখের পরশ জাগাতে পেরেছি।
প্রশংসা করার দর্শন সম্বন্ধে আলোক লাভ করার জন্য আপনাকে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত বা কোনো চেয়ারম্যান হয়ে ওঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। আপনি প্রতিদিনই এই ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করতে পারে না।
যেমন ধরুন, আপনি খাবারের আদেশ দিলেন পরিবেশনকারিণীকে। সে ভুল কিছু আনলে যদি বলেন, তোমায় কষ্ট দিচ্ছি বলে দুঃখিত, আমি আসলে চেয়েছি অন্য জিনিস। সে এটা ভয়ে নিশ্চিয়ই বলবে, না, না, কষ্ট কি। আসলে সে আনন্দের সঙ্গে কাজটা সংশোধন করে নেবে যেহেতু আপনি তাকে সম্মান দিয়েছেন।
‘আমি আপনাকে কষ্ট দিচ্ছি বলে দুঃখিত’, ‘দয়া করে কি’—’ধন্যবাদ, যদি-’ এই ধরনের ছোটখাটো কথাতে প্রতিদিনের একঘেঁয়েমি জড়ানো জীবন অনেকটা সহ্য করার অবস্থায় এনে তাকে মোলায়েম করে তোলে। তাছাড়াও এই রকম সম্মান দেখানো কথাতেই ফুটে ওঠে বংশ মর্যাদা আর প্রকৃতি শিক্ষার ভাব। আর একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। আপনি কি ‘হল কেইনের লেখা উপন্যাস কখনও পড়ে দেখেছেন? যেমন ধরুন, ‘দি ক্রিশ্চিয়ান’, ‘দি ডিমষ্টার’, ‘দি ম্যাক্সিমাম’? একলক্ষ মানুষ তার উপন্যাস পাঠ করেছেন। তিনি ছিলেন একজন কর্মকারের সন্তান। সারা জীবনে তিনি আট বছরের বেশি স্কুলে শিক্ষা নিতে পারেন নি, তাসত্ত্বেও তিনি যখন মারা গেলেন তখন তিনি ছিলেন পৃথিবীতে যত অর্থবান সাহিত্যিক জন্মগ্রহণ করেছেন তাদের মধ্যে প্রথম সারির।
