‘খুবই আশ্চর্য হলাম।‘ মি. চ্যালিয়া লিখেছেন, তিনি যে আমি যা চাইলাম তাই দিলেন তা নয়। বরং আমি একটি ছেলেকে ইউরোপ পাঠাতে চেয়েছিলাম। তিনি আরও পাঁচজন এবং আমাকেও পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। তা ছাড়া এক হাজার ডলারের একটা হুন্ডি লিখেও দিলেন আর আমাকে সাত সপ্তাহ ইউরোপে থাকতে বললেন। তিনি ইউরোপে তাঁর শাখায় প্রেসিডেন্টদের পরিচয়পত্রও লিখে দিলেন। আর প্যারীতে আমাদের সঙ্গে দেখা করে শহরটাও ঘুরিয়ে দেখালেন। তার পর তিনি অভাবী কয়েকটি ছেলেকে চাকরিও দেন, আর আমাদের কাজে সক্রিয় অংশ নেন।
তবুও আমি জানি তিনি কিসে উৎসাহী। আগে যদি মেনে না নিতাম তাহলে তাঁর কাছ থেকে এর দশভাগের একভাগও পেতাম কিনা জানি না।
এই মূল্যবান কৌশল কি ব্যবসায় লাগানো হয়? দেখাই যাক! ডুভার্নয় কোম্পানীর হেনরি জি. ডুভার্নয়ের কথাটাই ধরুন। তিনি নিউইয়র্কের বিখ্যাত রুটি কোম্পানীর মালিক।
তিনি নিউইয়র্কের বিখ্যাত কোন হোটেলে তাঁর রুটি বিক্রীর চেষ্টা করছিলেন। চার বছর ধরে তিনি প্রতি সপ্তাহে হোটেলের ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। ম্যানেজার যেখানে যান তিনি সেখানেই যেতেন। এমন কি একই হোটেলেও তিনি তাঁর সঙ্গে থেকেছেন, সবই সেই রুটির অর্ডার পাওয়ার জন্য। তবে সবই বৃথা।
‘তারপর’, মি. ডুভার্নয় বলেছিলেন, ‘মানব চরিত্র অনুধাবন করে আমি আমার কৌশল পাল্টানোর ব্যবস্থা করলাম। আমি বের করতে চাইলাম ভদ্রলোকের আগ্রহ কিসে।’
আমি জানতে পারলাম তিনি হোটেল অভ্যর্থনা সমিতির একজন সদস্য। দেখতে পেলাম তিনি শুধু সদস্যই নন, তাঁর দারুণ আগ্রহের জন্য তাঁকেই সভাপতি করা হয়েছে। তাছাড়া তিনিই আন্তর্জাতিক সমিতির প্রেসিডেন্ট। যেখানেই ওই সমিতির সভা হোক, সেটায় হাজির হতে পাহাড়, সমুদ্র বা মরুভূমি পার হতে হলেও তিনি গররাজী নন।
‘অতএব তার সঙ্গে পরদিন যখন দেখা করলাম আমি ওই অভ্যর্থনাকারীদের নিয়ে আলোচনা শুরু করলাম। কি আশ্চর্য ব্যাপার যে ঘটল কী বলব! তিনি আমার সঙ্গে প্রায় আধ ঘন্টা ধরে অভ্যর্থনাকারীদের সম্পর্কে কথা বললেন, তাঁর কণ্ঠস্বর প্রায় আবেগে আপ্লুত হল। পরিস্কার বুঝতে পারলাম এই সমিতি তার শখ আর জীবনের একমাত্র বাসনা। তাঁর অফিস ছেড়ে আসার আগে তিনি আমাকে তার সমিতির সভ্য করে নিলেন।
‘ইতিমধ্যে আমি রুটি নিয়ে একটা কথাও বলিনি। তবে কদিন পরে হোটেলের স্টুয়ার্ড রুটির নমুনা নিয়ে দেখা করতে ফোন করলেন।
স্টুয়ার্ড আমায় অভ্যর্থনা জানিয়ে বললেন, ‘বুড়োকে আপনি কি করেছেন জানিনা তিনি তো আপনার প্রশংসায় ফেটে পড়ছেন।‘
‘একবার কথাটা ভাবুন। চার বছর ধরে আমি যা পারিনি, উনি কিসে আগ্রহী তা যদি বার করতে না পারতাম।‘
তাই যদি চান লোকে আপনাকে পছন্দ করুক তবে ৫নং নিয়ম হোল :
অন্যের উৎসাহের ব্যাপার নিয়ে কথা বলুন।
০৯. চট করে ভালো লাগানোর পথ
নবম পরিচ্ছেদ
চট করে ভালো লাগানোর পথ
নিউইয়র্কের এইটথ অ্যাভিনিউর থারর্টি-থার্ড স্ট্রিটের এক ডাকঘরে একখানা চিঠি রেজিষ্ট্রি করার জন্য আমি লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম। আমি লক্ষ্য করলাম রেজিষ্ট্রির কেরানি ওর কাজে বেশ একঘেঁয়েমী বোধ করে চলেছে–সেই একঘেঁয়ে খাম ওজন করা, ডাকটিকিট দেয়া, খুচরো দেয়ানেয়া করা, রসিদ লেখা-সারা বছর ধরে সেই একঘেঁয়ে যাতা পিষে চলা। আমি তাই নিজেকে বললাম আমি লোকটিকে আমায় পছন্দ করাবো। স্বভাবতই আমাকে পছন্দ করার জন্য আমায় ভালো কিছু বলতে হবে। আমার সম্পর্কে অবশ্য নয়, ওর সম্পর্কেই। অতএব আবার নিজেকে প্রশ্ন করলাম : ‘ওর মধ্যে কি আছে যেটার সত্যিকার প্রশংসা করতে পারি?’ এরকম প্রশ্নের উত্তর পাওয়া অনেক সময়েই কঠিন। বিশেষ করে : অচেনা মানুষ সম্পর্কে। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যাপারটা সহজেই হবে। আমি ঠিক তখনই এমন কিছু দেখলাম যাতে আমার প্রশংসা বাধ মানল না।
তাই সে যখন আমার খামখানা ওজন করছিল তখন বেশ সাগ্রহে মন্তব্য করলাম : ‘আহা, আপনার মতো আমার যদি চুল থাকতো।‘
লোকটি হাসিমুখে বেশ একটু চমকেই মুখ তুলল। নাঃ, আগের মতো তো এখন আর নেই–সলজ্জ ভঙ্গীতে সে জানালো। আমি জবাবে বললাম, ‘তা হলেও আগেকার জৌলুস হারিয়ে এখনও চমৎকার আছে।’ লোকটি অসম্ভব খুশি হলো। সে আমার সঙ্গে বাকি সময় বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তা বললো। শেষ যে কথাটা সে আমায় বললো তা হলো : ‘বহু লোকেই আমার চুলের প্রশংসা করেছে।’
আমি বাজি রাখতে পারি লোকটি প্রায় হাওয়ায় ভাসতে ভাসতেই সেদিন মধ্যাহ্ন ভোজ সারতে যায়। আরও বাজি ধরতে পারি সে সেদিন রাতে বাড়ি গিয়ে ওর স্ত্রীকে ব্যাপারটা বলেছে। তারপর নিশ্চয়ই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলে : সত্যিই আমার চুল বড় সুন্দর।
এই গল্পটা একবার আমি অনেকের সামনেই বলেছিলাম, আর একজন আমায় পরে প্রশ্ন করেছিল; আপনি ওর কাছ থেকে কি চাইছিলেন?
আমি ওর কাছে কি চাইছিলাম। ভাবুন একবার!
আমরা এরকম স্বার্থপর হয়ে উঠেছি যে সামান্য খুশির ভাব ছড়িয়ে কাউকে কিছু নিঃস্বার্থ প্রশংসাও করতে পারবো না? সব সময়েই আমাদের একাজে উদ্দেশ্য হবে কারও কাছ থেকে পরিবর্তে কিছু পাওয়ার আকাঙক্ষা? আমাদের মন যদি এই রকম নীচতা আর ক্ষুদ্রতা ভরা হয় তাহলে আমাদের সব কাজে ব্যর্থতাই শুধু প্রাপ্য।
