আপনি যদি চান লোকে আপনাকে নিয়ে হাসাহাসি করুক বা আপনার পিছনে টিটকিরি দিক বা নিন্দে করুক তাহলে এই রকম করে দেখতে পারেন : কারও কথা বেশিক্ষণ শুনবেন না। খালি নিজের সম্পর্কে। কথা বলে যান। আপনি যদি বোঝেন অন্যজন কি বলতে যাচ্ছে তাকে শেষ করতে দেবেন না। সে হয়তো আপনার মত চালাক নয়, তাহলে তাকে আজেবাজে বকতে দেবেন কেন? তার কথার মাঝখানে তাই বাধা দিতে চেষ্টা করুন।
এ ধরনের কাউকে চেনেন নাকি? দুর্ভাগ্যবশত আমি চিনি, আর তাদের কারও কারও নাম আবার সামাজিক উচ্চ স্তরেও আছে।
এরা সবাই নেহাত বিরক্তি উদ্রেককারী মানুষ-বিরক্তিসর্বস্ব মানুষ, যারা খালি নিজেদের অহংভাব নিয়ে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ মনে করে স্ফীত হয়ে থাকে।
যে লোক কেবল নিজের কথা বলে সে শুধু নিজের কথাই ভাবে। ড. নিকোলাস মারে বাটলার, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট বলেন, “যে লোক কেবল নিজের কথাই ভাবে সে নেহাতই অশিক্ষিত। যত শিক্ষাই তার থাক না কেন সে শিক্ষিত হতে পারে না।
অতএব আপনি যদি ভালো কথক হতে চান তাহলে ভালো শ্রোতা হওয়ার চেষ্টা করুন। মিসেস চার্লস্ নর্দান কী বলেন : ‘নিজেকে ভালো লাগাতে গেলে অন্যের প্রতি আগ্রহ দেখান।’ এমন প্রশ্ন করুন অন্যে যার উত্তর দিতে চাইবে। তাকে তার নিজের কাজ সম্বন্ধে বলতে উৎসাহিত করুন।
মনে রাখবেন যার সঙ্গে কথা বলছেন সে নিজের সম্পর্কে একশ ভাগ আগ্রহী, তার নিজের চাহিদা আর সমস্যাকে যে আপনার চেয়ে ঢের বেশি মূল্য দেয়। চীন দেশে দুর্ভিক্ষে হাজার হাজার মানুষ মরলেও তার চেয়ে নিজের দাঁতের ব্যথায় সে বেশি নজর দেয়। আফ্রিকার চল্লিশটা ভূমিকম্পের চেয়ে সে তার ঘাড়ের ফোড়া নিয়ে বেশি চিন্তিত হবে। অতএব এবার কথাবার্তা বলার আগে এটা স্মরণ রাখবেন।
অতএব অন্যেরা আপনাকে পছন্দ করুক তাই যদি চান তাহলে ৪ নম্বর নিয়ম হল : ভালো শ্রোতা হয়ে উঠুন। অন্যদের নিজেদের কথা বলায় উৎসাহ দিন।
০৮. অন্যদের কীভাবে উৎসাহী করা যায়
অষ্টম পরিচ্ছেদ
অন্যদের কীভাবে উৎসাহী করা যায়
যারা অয়েস্টার বে’তে থিয়োডোর রুজভেল্টের সঙ্গে দেখা করতে গেছেন তাঁরা তাঁর জ্ঞানের পরিধি আর বিশালতা দেখে আশ্চর্য হয়েছেন। গ্যামালিয়েল ব্রাডফোর্ড লিখেছেন যে দর্শনার্থী কোনো কাউবয় বা রাজনীতিক বা কূটনীতিক যাই হোক রুজভেল্ট জানতেন তার সঙ্গে কি কথা বলা দরকার। এটা তিনি কি করে করতেন? উত্তরটা খুবই সরল। রুজভেল্ট যখন জানতেন কেউ সাক্ষাৎপ্রার্থী হয়ে আসবে, তিনি সারারাত ধরে সেই লোকটির পছন্দসই বিষয়ে কতটা জানা যায় জানতে চেষ্টা করতেন।
কারণ রুজভেল্ট জানতেন, যেমন নেতারাও জানেন যে, মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করার একমাত্র উপায় হলো তার সবচেয়ে প্রিয় বিষয় নিয়ে কথা বলা।
সহৃদয় উইলিয়াম লায়ন ফেলপস, ইয়েলের তত্ত্বালীন সাহিত্যের অধ্যাপক অল্প বয়সেই এ অভিজ্ঞতা লাভ করেন।
‘আমি যখন আট বছরে পড়ি তখন একবার আমার ফুপুর বাড়িতে এক সপ্তাহ কাটাচ্ছিলাম, অধ্যাপক ফেলপস তাঁর ‘হিউম্যান নেচার’ বইতে লিখেছেন, একজন মধ্য বয়স্ক লোক এক সন্ধ্যায় এলেন। তারপর পিসীর সঙ্গে কথাবার্তার পর আমার সঙ্গে আলাপ হলো। তখন আমার নৌকো সম্বন্ধে খুবই আগ্রহ ছিল। ভদ্রলোক তাই নিয়ে আমার সঙ্গে এতো কথা বললেন যে আমার খুব ভালো লাগলো। উনি চলে গেলে আমি উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়লাম-কী চমৎকার মানুষ! নৌকো সম্বন্ধে ওঁর কত আগ্রহ। পিসী বললেন, ‘উনি নিউইয়র্কের একজন আইনবিদ আর নৌকো নিয়ে তার ছিটে ফোঁটাও মাথা ব্যথা নেই। তাহলে এ নিয়ে এত কথা তিনি বললেন কেন?’
পিসী বললেন, কারণ তিনি একজন ভদ্রলোক। তিনি দেখেছিলেন তুমি নৌকো সম্পর্কে আগ্রহী, তিনি বুঝেছিলেন নৌকো নিয়ে কথা বললে তুমি আনন্দ পাবে। তিনি নিজেকে তোমার কাছে প্রিয় করে তুলেছিলেন।
উইলিয়াম ফেলপস লিখেছিলেন, ‘আমি কখনও পিসীর কথা ভুলিনি।‘
এই পরিচ্ছেদ লেখার সময় আমার সামনে খোলা রয়েছে বয় স্কাউট আন্দোলনের একজন নামী কর্মী এডওয়ার্ড এল চ্যালিফের একখানা চিঠি।
একদিন আমার বিশেষ এক সাহায্যের দরকার হয়। ইউরোপে এক বিরাট বয় স্কাউট জাম্বোরীর ব্যবস্থা হচ্ছিলো। আমি চাইছিলাম আমেরিকার বিরাট এক কোম্পানির প্রেসিডেন্ট যাতে একটি ছেলেকে সেখানে পাঠানোর খরচ দেন।
সৌভাগ্যবশত তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার আগে আমি জানতে পেরেছিলাম তিনি দশ লক্ষ ডলারের একটা চেক লিখেছিলেন, সেটার ক্যাশ দেয়া হয়ে গেলে ব্যাঙ্ক চেকটা আবার তাঁকেই ফিরিয়ে দেয় আর তিনি সেটা ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখেন।
অতএব তাঁর অফিসঘরে ঢুকে প্রথমেই আমি সেই চেকটা দেখতে চাইলাম। দশলক্ষ ডলারের চেক, আমি তাকে বললাম আমার জানা নেই এত টাকার চেক কেউ লিখেছেন। আমি আমার সব ছেলেদের বলতে চাই, এমন চেক আমি দেখেছি। তিনি খুশি হয়েই আমায় তা দেখালেন। আমি প্রশংসা জানিয়ে কিভাবে ওটা লেখা হয় জানতে চাইলাম।
‘নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন। তাই না, মি. চ্যালিফ বয়স্কাউট, বা অন্য কিছু দিয়ে কথা শুরু করেন নি বা তার চাহিদা কি? তিনি অন্যজন যাতে আগ্রহী তাই দিয়েই আরম্ভ করেন। তার কথাটা হয় এই রকম :
‘যার সঙ্গে কথা বলছিলাম তিনি বললেন, ‘ওহ, আপনি কি জন্য যেন দেখা করতে চান?’ আমি তখন আসার উদ্দেশ্য বললাম।
