এরকম কিছু তিনি একেবারেই আশা করেন নি। আমার ধারণা তিনি একটু হতাশই হলেন, কারণ শিকাগোয় এসে দু চার কথা তিনি শোনাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার বদলে পেলেন ধন্যবাদ। আমি তাকে বললাম, ‘ওই পনেরো ডলার আমরা বাতিল করে দেবো কারণ তিনি খুবই সাবধানী মানুষ। তাকে মাত্র একটাই হিসাব রাখতে হয় তাই ভুল হবার সম্ভাবনা কম–যেখানে আমাদের রাখতে হয় হাজার হাজার।‘
আমি তাকে আরও বললাম, ‘তাঁর মনের ভাব কি রকম হয়েছে, তার জায়গায় থাকলে আমারও তাই হতো। যেহেতু তিনি আমাদের কাছ থেকে আর কিছু কিনবেন না, আমি বললাম অন্য কয়েকটা উলের দোকানের নাম আমি বলতে পারি।’
আগে উনি শিকাগো এলে আমরা একসঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ সারতাম, আজও তাই তাকে আমন্ত্রণ জানালাম। তিনি গররাজী হলেন। এরপর আবার অফিসে ফিরে এলে তিনি বেশ বড় বায়না দিলেন। বাড়ি ফেরার সময় তাঁর মন বেশ প্রফুল্ল হয়ে রইলো। আমার ভদ্রতার বদলে তিনিও ভদ্র হতে চাইছিলেন। বাড়ি ফিরে কাগজপত্রের মধ্যে তিনি সেই পনেরো ডলারের বিলটা খুঁজে পেয়ে আমাদের কাছে মার্জনা চেয়ে টাকাটা পাঠিয়েও দিলেন।
পরে তাঁর স্ত্রীর একটি ছেলে হলে তার নাম রাখলেন ‘ডেটমার। এরপর থেকে তিনি আজীবন আমার বন্ধু ছিলেন আর এরও বাইশ বছর পর তাঁর মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তিনি আমাদের প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা করে গেছেন।
বেশ কয়েক বছর আগে এক গরীব ডাচ্ ছেলে স্কুলের পর একটা রুটির দোকানের কাঁচ সাফাই করতো, তার জুটতো মাত্র সপ্তাহে পনেরো সেন্ট। ওরা এমনই গরীব ছিল যে প্রতিদিন কয়লার গাড়ি চলে যাওয়ার পর একটা ঝুড়ি নিয়ে, রাস্তা থেকে কয়লার টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিত। ছেলেটি অর্থাৎ যার নাম এডওয়ার্ড বব জীবনে ছ’বছরের বেশি স্কুলে যায়নি, অথচ সেই আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে সফল সাময়িক পত্রিকার সম্পাদক হতে পেরেছিল। কিভাবে তার পক্ষে এটা সম্ভব হয়? সেটা বেশ বিরাট গল্প–কিন্তু তার শুরু করার ব্যাপারটা অল্প কথায় বলা যেতে পারে। যে নীতি তিনি নিয়েছিলেন সেটাই এই পরিচ্ছেদে বলা হয়েছে।
.
মাত্র তের বছর বয়সে তাঁকে স্কুলের পাঠ সাঙ্গ করতে হয়। তিনি একটা অফিসে প্রতি সপ্তাহে দু’ডলার পঁচিশ সেন্ট মাইনের অফিস-বয়ের কাজ শুরু করেন। কিন্তু তাতে তার পড়াশোনার আগ্রহ চলে যায়নি। বরং তিনি নিজেই পড়াশোনার ব্যবস্থা করলেন। গাড়ী ভাড়া আর মধ্যাহ্নভোজের খরচ বাঁচিয়ে তিনি আমেরিকান মনীষীদের একসেট জীবনী বা এনসাইক্লোপেডিয়া কিনে নিলেন। তার পরেই তিনি অদ্ভুত একটা কাজ করলেন–বিখ্যাত সব মানুষের জীবনী পড়ে তাদের কাছে চিঠি লিখে জীবনের আর ছোটবেলার আজানা কথা জানতে চাইলেন। তিনি বিখ্যাতদের তাদের সম্বন্ধে কথা বলায় উৎসাহিত করলেন। তিনি চিঠি লিখলেন জেনারেল জেমস এ গারফিল্ডকে, যিনি প্রেসিডেন্ট পদের জন্য নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি গারফিল্ডের কাছে জানতে চান এটা সত্য কিনা যে ছেলেবেলায় তিনি কোন খালের নৌকোর গুণ টানতেন কিনা। গারফিল্ড উত্তরও দেন। একটা বিশেষ যুদ্ধের কথা জানতে চেয়ে তিনি জেনারেল গ্র্যান্টকে চিঠি লেখেন। গ্র্যান্ট তাঁকে একটা মানচিত্র এঁকে পাঠিয়ে ওই চৌদ্দ বছরের ছেলেটিকে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানান আর সারা সন্ধ্যা কথা বলেন কাটান।
তিনি এমার্সনকেও চিঠি লিখে কথা বলায় উদ্বুদ্ধ করেন। এই সামান্য পশ্চিমী ছেলেটি এক এক করে আমেরিকার এই সব বিখ্যাত মানুষকে চিঠি লেখেন–এমার্সন, ফিলিপ্স ব্রুকস, অলিভার, ওয়েণ্ডেল হোমস, লঙফেলো, মিসেস আব্রাহাম লিঙ্কন, লুইসা মেরি অ্যালকট, জেনারেল শেরম্যান আর জেভারসন ডেভিস। তিনি শুধু যে এইসব নামী মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগই করেন তাই নয়, বরং তাকে প্রায়ই দেখা যেত তিনি ওইসব নামী মানুষদের বাড়ীতে ছুটি কাটাতে ব্যস্ত। তাদের অভিজ্ঞতা ওঁকে নানা ভাবেই উদ্বুদ্ধ করেছিল। এই সব নামী স্ত্রী পুরুষ তার জীবনকে প্রায় বৈপ্লবিক অবস্থায় এনে দেয়। মনে রাখবেন এই সব নীতি প্রয়োগের কথাই এই পরিচ্ছেদে আমরা আলোচনা করছি।
পৃথিবীর সবচেয়ে খ্যাতিমান সাক্ষাৎকারী মানুষটির নাম হলো আইজ্যাক মার্কোসন। তাঁর বক্তব্য হলো বহু মানুষ অপ্রীতিকর হন কারণ তাঁরা মন দিয়ে কথা শুনতে চান না। মার্কোসন বলেছেন : তাঁরা নিজেদের কথাতেই এমন ব্যস্ত থাকেন যে চোখ কান খোলা রাখতে ভুলে যান … খ্যাতিমান মানুষেরা আমাকে বলেছেন যে ভালো কথা বলা লোকের চেয়ে তারা ভালো শ্রোতাই পছন্দ করেন। অথচ ভালো শ্রোতার সংখ্যা অন্যসব ভালো কাজের মানুষের মতই কম।’
শুধু যে নামী মানুষরাই কেবল ভালো শ্রোতা খোঁজেন তাই নয়, সাধারণ মানুষই তাই। রীডার্স ডাইজেস্টে একবার লেখা হয় : বহুলোক ডাক্তার ডাকেন শুধু কথা শোনাবার জন্যই।
গৃহযুদ্ধের অন্ধকার দিনগুলোয় লিঙ্কন একবার ইলিনয়ের স্প্রিংফিল্ডে তাঁর এক পুরনো বন্ধুকে চিঠি লিখে ওয়াশিংটনে আসতে বলেন। লিঙ্কন লিখেছিলেন কোন একটা সমস্যা নিয়ে তিনি তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতে চান। পুরনো সেই বন্ধু হোয়াইট হাউসে এসে পৌঁছলে লিঙ্কন তার সঙ্গে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে ক্রীতদাসদের মুক্তিদানের ব্যাপারে কথা বলে গেলেন। সেটা ছিল একটা ঘোষণাপত্র জারি করা। লিঙ্কন-এর পক্ষে আর বিপক্ষে বলা সব রকম বক্তব্য আর খবরের কাগজের বক্তব্যও উল্লেখ করলেন। ক্রীতদাসদের মুক্তিদান করার ব্যাপারে কেউ তাঁকে সমর্থন জানিয়েছিল আবার কেউ কেউ নিন্দা করতেও ছাড়েনি। কথা শেষ হওয়ার পর লিঙ্কন বন্ধুর করমর্দন করে ইলিনয়ে ফেরত পাঠালেন, আর আশ্চর্য ব্যাপারে একবারও তার মতামত চাইলেন না। সারাক্ষণ লিঙ্কন একাই কথা বলে গেলেন। এতে তার মন ঠিক হয়ে গেল। বন্ধুটি বলেছিলেন ‘কথা শেষ হওয়ার পর তাঁকে সহজ মনে হচ্ছিল’, আসলে লিঙ্কন মোটেই কোন পরামর্শ চাননি–তিনি কেবল চাইছিলেন ধৈর্যশীল বন্ধুর মত কোন শ্রোতা যার কাছে কথা বলে তিনি মনের ভার লাঘব করতে পারেন। ঝামেলায় পড়লে আমরা সবাই তাই চাই-আর বিরক্ত ক্রেতারাও তাই চান। এরকমই চায় অসন্তুষ্ট কর্মচারিরা বা আহত বন্ধুও।
