কথাবার্তার ফাঁকে আরও একজন এসে যোগ দিল তার সঙ্গে। সে বলল, ‘এতে কিছু করার নেই। এরকম দামে এর থেকে ভালো সুট পাওয়া যায় না।’
ইতিমধ্যে আমারও মাথা গরম হয়ে উঠেছিল। উটন কাহিনীটি বলতে গিয়ে বলেছিলেন, প্রথমতঃ বিক্রেতা আমার সততা সম্বন্ধে প্রশ্ন তোলে, দ্বিতীয় জন মন্তব্য করে আমি সস্তায় মাল কিনেছি। আমি রাগে ফেটে পড়তে চাইছিলাম। আমি যখন বলতে চাইছিলাম ওরা ওদের সুট নিয়ে চুলোয় যাক, ঠিক তখনই দোকানের মালিক এসে পড়লেন। নিজের ব্যবসা তিনি ভালোই জানতেন। তিনি আমায় একদম বদলে দিলেন। একজন ক্রুদ্ধ ক্রেতাকে তিনি সন্তুষ্ট মানুষে বদলে দিলেন। তিনি এটা কিভাবে করলেন জানেন? তিনটি উপায়ে :
প্রথমতঃ, তিনি কোন কথা না বলে আমার কথা গোড়া থেকে শুনে গেলেন।
দ্বিতীয়তঃ, আমার কথা শেষ হতেই বিক্রেতারা যখন আবার কথা বলার চেষ্টা করতে চাইছিল তিনি আমার দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের সঙ্গে তর্ক আরম্ভ করলেন। তিনি শুধু যে ওদের দেখালেন আমার কালারটা সত্যিই নষ্ট হয়ে গেছে তাই নয়, বরং বললেন সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট করা যায় না এমন কিছু যেন দোকান থেকে বিক্রি করা না হয়।
তৃতীয়তঃ, তিনি স্বীকার করলেন গোলমালের ব্যাপারটা তার জানান ছিল না। তারপর তিনি সরলভাবেই বললেন, এই সুট সম্পর্কে কি করতে বলছেন বলুন। যা বলবেন তাই করবো।
ক’মিনিট আগেই তাদের চুলোর সুট নিয়ে গোল্লায় যেতে বলব ভাবছিলাম, কিন্তু এখন বললাম, ‘আমি আপনার পরামর্শ চাইছি। আমি জানতে চাই এ অবস্থাটা সাময়িক কিনা এবং কিছু করা সম্ভব কিনা।‘
তিনি পরামর্শ দিলেন সুটটা আরও এক সপ্তাহ ব্যবহার করতে। তাতে যদি দোষ দূর না হয় তাহলে সেটা নিয়ে আসতে, তিনি সেটা বদলে দেবেন। আপনার সুসবিধের জন্য সত্যিই দুঃখিত।
আমি খুশি মনেই দোকান ছেড়ে এলাম। সপ্তাহের শেষে সুটটা ঠিকই হয়ে গেল। আর ওই দোকান সম্পর্কে আমার বিশ্বাসও বেড়ে গেল।
এত আশ্চর্যের কিছু নেই যে ভদ্রলোক দোকানের কর্তা–আর ওই দুজন বিক্রেতা সারা জীবন কেরাণীই থেকে যাবে। না, তাদের সম্ভবতঃ প্যাক করার দপ্তরে পাঠানো হবে যাতে তারা কোন ক্রেতার সংস্পর্শে না আসে।
সমস্ত সময়েই আঘাতবিলাসী বা সমালোচকও প্রায়ই মনোযোগী শ্রোতা পেলে বেশ নরম হয়ে প্রায়ই মনোযোগ এই কাতার বিষ বাইরে পড়েন–এমন শ্রোতা যে চুপচাপ শুনে যাওয়ার মুহূর্তে গোখরো সাপের মত মানুষেও তার বিষ বাইরে ঢেলে ফেলে। নিউইয়র্ক টেলিফোন কোম্পানীর একটা উদাহরণ দিই। তারা একজন গ্রাহককে নিয়ে সাংঘাতিক বিব্রত হয়। ভদ্রলোক গালমন্দ দিয়ে রাগের বশে টেলিফোনের তার আর খুঁটি উপড়ে ফেলতে চান। তিনি কিছু কল’ এর চার্জ মিথ্যা বলে দিতেও অস্বীকার করেন। খবরের কাগজেও তিনি লেখালেখি করেন। পাবলিক সার্ভিস কমিশনেও তিনি অজস্র অভিযোগ করেন আর টেলিফোন কোম্পানীর বিরুদ্ধে মামলাও করেন।
শেষ পর্যন্ত কোম্পানি তাদের অত্যন্ত দক্ষ একজন কুশলী লোককে মারাত্মক ওই গ্রাহককে ঠাণ্ডা করতে পাঠান। এই লোকটি ওই খিটখিটে গ্রাহকের সব কথা মন দিয়ে শোনেন। লোকটি ঠাণ্ডা মাথায় সব গালাগাল শুনে গেলেন আর মাঝে মাঝে গ্রাহক যে ঠিক বলছেন তাই জানালেন।
ভদ্রলোক তিন ঘন্টা ধরে গালাগাল দিয়েছিলেন আর আমিও তা শুনে যাই, আমার ক্লাসে টেলিফোনের সেই লোকটি জানিয়ে ছিলেন। এরপরেও তিনি গ্রাহকের কাছে আবার যান-বারবার চার বার। চার বারের পর লোকটি একটা টেলিফোন গ্রাহক স্বার্থরক্ষা সমিতির সদস্যও হন। তিনি এখনও তার সদস্য আছেন–অবশ্য আরও একজন সদস্য আছেন তিনি সেই মিঃ।
আমি ভদ্রলোকের কথা ধৈর্য ধরেই শুনেছিলাম বলে লোকটি জানিয়েছিলেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার সঙ্গে আমি একমত হই। ভদ্রলোক শেষ পর্যন্ত প্রায় বন্ধু হয়ে ওঠেন। প্রথমবার তাঁর অভিযোগের কথা উঠল না, দ্বিতীয় বারেও না। চতুর্থবারে মামলাটাই বদলে গেল–তিনি বিলের সব টাকাই মিটিয়ে দিলেন। আর এই প্রথম টেলিফোন কোম্পানির ইতিহাসে তিনি মামলা প্রত্যাহার করে নেন।
সন্দেহ নেই মি.নিজেকে একজন গ্রাহকের স্বার্থরক্ষাকারী নিঃসঙ্গ যোদ্ধা বলেই ভাবতে চাইছিলেন। বাস্তবে কিন্তু তিনি চাইছিলেন কিছুটা গুরুত্ব। প্রথমে গালাগাল দিয়ে সেটা পান তিনি, তারপর কোম্পানির এক প্রতিনিধি এলে তার কাল্পনিক অভিযোগ বাতাসে মিলিয়ে যায়। এমন তিনি আশাই করেন নি।
একদিন সকালে বেশ ক’বছর আগে ডেটমার উলেন কোম্পানির জুলিয়ান এফ. ডেটমারের অফিসে ঝড়ের বেগে ঢুকলেন এক ক্রুদ্ধ ক্রেতা।
লোকটির কাছে আমাদের প্রতিষ্ঠান পনেরো ডলার পেত, মি. ডেটমার পরে আমায় বলেছিলেন। ক্রেতা সেটা অস্বীকার করলো, তবে আমরা জানতাম ওরই ভুল হচ্ছে। তাই আমরা তার কাছে সেটা দাবি করি। ভদ্রলোক রাগে একেবারে শিকাগোয় এসে হাজির হলেন–শুধু আমাকে জানাতে যে টাকা তিনি কখনই দেবেন না, আর আমার দোকান থেকে এক ডলারেরও জিনিস কিনবেন না।
আমি বেশ ধৈর্য নিয়েই ভদ্রলোকের সব কথা শুনে গেলাম। বাধা দেবার কিছু ইচ্ছে যে হয়নি তাও নয়–তবে তাতে খারাপ হবে ভেবেই চেপে গেলাম। তাকে তাই কথা বলে যেতে দিলাম। তারপর সে একটু কথা শোনার মত অবস্থায় এলে বেশ শান্ত স্বরে আমি বললাম : ‘আপনি যে শিকাগোয় এসে আমাকে এ কথাটা বলেছেন তার জন্য ধন্যবাদ। আমার খুব উপকার করেছেন আপনি। কারণ আমার প্রতিষ্ঠান আপনার বিরক্তি উৎপাদন করে থাকলে আরও অনেকেরই হয়তো করবে। সেটা খুব খারাপ হতো। আপনার বলার চেয়েও আমার শোনার আগ্রহ বেশি বিশ্বাস করুন।
