এর কারণ কি? কারণ হল কানে শোনা বর্ণনা বেশি কাল মনে থাকেনা। এটা মিলিয়ে যায়। কিন্তু চোখে দেখা কিছু তা যায় না। কয়েক বছর আগে আমি দানিয়ুব নদীর তীরে একটা বাড়িতে নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীর ছোঁড়া কামানের গোলা বিদ্ধ থাকতে দেখেছি। উলমের যুদ্ধে সেটা ছেঁড়া হয়। চোখে দেখা উপলব্ধি এই কামানের গোলার মতই। এগুলো প্রচণ্ড চাপ দিয়ে তারা মনে গেঁথে যায়। চিরকাল থেকেও যায়। বোনাপার্ট যেমন সব অষ্ট্রিয়ানদের তাড়িয়ে দিয়েছিলেন এগুলো সেইভাবেই বাকি সব বিরুদ্ধতা দূর করে দেয়।
টেকনিকাল কথা বাদ দেবেন
আপনি যদি কোন প্রযুক্তিবিদ্যা বা টেকনিকাল কাজ করে থাকেন-বা আপনি যদি আইনবিদ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা আরও কোন কিছুর বিশেষজ্ঞ হন–তাহলে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে আপনাকে বক্তা হিসেবে। শ্রোতাদের কাছে কথা বলার সময় এসব খুঁটিনাটি আপনাকে বাদ দিতেই হবে।
আমার শিক্ষা সংক্রান্ত জীবনে আমি বহুবার দেখেছি শতশত বক্তৃতা উপযুক্ত মুহূর্তে কিভাবে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ তারা বক্তৃতা দানের সময় শ্রোতাদের তার বিশেষজ্ঞতার ধারণা যে থাকতে পারে না সে কথা ভুলে গিয়েছিলেন। এর ফল কি হয়? শ্রোতারা কোন আগ্রহই বোধ করেনি। এরকম ক্ষেত্রে বক্তার কি করা দরকার? তাকে ইণ্ডিয়ানরা সেনেটর রেভেবিজের এই লেখাটি পাঠ করে মনে রাখতে হবে :
‘সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হল শ্রোতাদের মধ্য থেকে সবচেয়ে কম বুদ্ধিমান মনে হওয়া শ্রোতাটিকে বেচে নিয়ে তাকে আপনার বক্তৃতায় আগ্রহী করতে চাওয়া। এটা একমাত্র সম্ভব আপনার বক্তব্যকে সহজবোধ্য, স্পষ্ট করে তোলার মধ্য দিয়ে। ব্যাপারটা ছোট ছেলেমেয়েদের বোঝানোর মত করেই বলা উচিত।’
একবার আমাদের ক্লাসে একজন ডাক্তার বলেন স্বাস্থ্য ভাল রাখার কাজে শ্বাস প্রশ্বাস ফেলা কতখানি দরকার। বিষয়টা তিনি জটিল করে তোলেন ডাক্তারী শাস্ত্রের আর শারীর বিদ্যার নানা টেকনিকাল কথা জানিয়ে। তিনি যখন তাঁর বক্তব্যের পরবর্তী অধ্যায়ে যাচ্ছিলেন আমাদের একজন শিক্ষক তখন তাকে বাধা দিলেন। তিনি এবার শ্রোতাদের কাছে হাত তোলার আবেদন জানিয়ে বললেন কজন ডাক্তারের কথা বুঝেছেন। দেখা গেল প্রায় অধিকাংশ শ্রোতাই তাঁর বক্তব্য বোঝেনি।
এরপর ডাক্তার সহজ সরল ভাষায় শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণের কাজটি বুঝিয়ে দিলেন।
এ ধরনের বক্তব্য রাখার সময় সবচেয়ে ভাল হলো সরল থেকে কঠিন পর্যায়ে ধাপে ধাপে পৌঁছান। যেমন ধরুন আপনি হয়তো রেফ্রিজারেটারের জমাট বাঁধা বরফের বিষয়ে বলতে চাইছেন। সেক্ষেত্র যদি টেকনিকাল খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আপনার কথা বলতে চান তাতে শ্রোতাদের আগ্রহ আদৌ জাগবে না।
অ্যারিস্টটল এই বিষয় সম্পর্কে একবার চমৎকার একটি উপদেশ দান করেন : জ্ঞানী মানুষের মত চিন্তা করুন, কথা বলুন সাধারণ মানুষের মত। কখনও বক্তব্যের মাঝখানে যদি টেকনিকাল বিষয় বলার প্রয়োজন দেখা দেয়, তাহলে সেটা আগে সহজবোধ করে বুঝিয়ে দিন।
আমি একবার কিছু গৃহকর্ত্রীর সামনে জনৈক ব্যাঙ্ক বিশেষজ্ঞকে কথা বলতে দেখি। ভদ্রলোক অনায়াস ভঙ্গীতে সুন্দরভাবে ব্যাঙ্ক আমানতের বিষয় বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন।
৫. দৃশ্যমান সূত্রের সাহায্য নিন
মানুষের চোখ থেকে যে সব স্নায়ু মস্তিষ্ক পর্যন্ত চলে গেছে সেগুলো কানের স্নায়ুর চেয়ে আকারে ঢের বড়। বিজ্ঞান বলে আমরা চোখের বক্তব্য কানের বক্তব্যের চেয়ে পঁচিশ গুণ বেশি আমল দিতে চাই।
জাপানী এক প্রবাদে আছে, ‘একবার দেখা একশবার শোনার চেয়ে ভালো।’
তাই যদি পরিষ্কারভাবে বলতে চান তাহলে আপনার বক্তব্যকে স্বচ্ছ, স্পষ্ট এবং দৃশ্যমান করে তুলুন। ন্যাশনাল ক্যাশ রেজিস্টার কোম্পানীর প্রতিষ্ঠাতা জন এইচ. প্যাটারসনের নীতিও তাই ছিল। তিনি তাঁর কর্মচারিদের আর বিক্রেতাদের সামনে কথা বলার সময় বলেন :
‘আমি দেখেছি মানুষ শুধু কথা বলার উপর নির্ভর করতে পারে না যাতে তার প্রতি মানুষের আগ্রহ জাগে। একটা নাটকীয় বাড়তি জিনিসও এজন্য চাই। তাই আমার মনে হয় ভাল ফল লাভ করার জন্য দরকার ছবি–যার সাহায্যে কোন বস্তুর কার্যকারিতা ব্যাখ্যা করা যায়। ছবি আবার সাধারণ অঙ্কনের চেয়ে ভাল।
কখনও কোন সময় যদি এঁকে দেখানো প্রয়োজন হয় তাহলে যথাসম্ভব বড় করে তা আঁকবেন। তবে বেশি বাড়াবাড়ি করবেন না। একনাগাড়ে ছবি দেখানোও আবার বিরক্তিকর হয়। মনে রাখবেন শ্রোতারা পাকা আঁকিয়ের ছবি দেখতে আগ্রহ বোধ করে না। যদি কোন সময় ছবি এঁকে বা এনে দেখানো দরকার হয় তাহলে শ্রোতাদের আগ্রহ জানানোর জন্য নিচের পরামর্শ মেনে চলবেন :
১। দেখাবার প্রয়োজনীয় মুহূর্তের আগে পর্যন্ত ছবিগুলি আড়ালে রাখবেন।
২। বেশ বড় ছবি দেখাবেন, যাতে শেষ সারি থেকেও তা দেখতে পাওয়া যায়। মনে রাখবেন শ্রোতারা ছবিটা না দেখতে পেলে বক্তব্য অনুধাবন করতে পারবে না।
৩। কথা বলার সময় কোন ছবি শ্রোতাদের হাতে দেবেন না।
৪। কোন ছবি দেখাতে হলে হাতে নিয়ে উঁচু করেই তা দেখাবেন যাতে শ্রোতারা দেখতে পায়।
৫। মনে রাখবেন যে জিনিস নড়তে পারে না এবং যা পারে তার চেয়ে দশগুণ বেশি কার্যকর। সম্ভব হলে তার ব্যবস্থা করবেন।
৬। কথা বলার সময় দ্রষ্টব্য নির্ণয়ের দিকে তাকিয়ে থাকবেন না–কারণ আমি শ্রোতাদের বোঝাতে চাইছেন।
