ঠিক এই রকম পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে ছিলেন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ পল এইচ, ডগলাস ব্যবসা ও উৎপাদনে দেশে ভাঁটা দেখা দেওয়ায় উৎসাহ দিতে। তিনি ছিলেন কর সম্বন্ধে অভিজ্ঞ এবং ইলিনয়ের সেনেটর হিসেবে তার সারগর্ভ বক্তৃতা রেখেছিলেন।
তিনি শুরু করেন এইভাবে : আমার বক্তব্যের বিষয়বস্তু হল এই : নিম্ন আর মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের জন্য কর রেহাইয়ের উপযুক্ত পদ্ধতি-অর্থাৎ যে আয়ের মানুষেরা তাদের আয়ের শেষ কপর্দকও খরচ করতে বাধ্য হন।
তিনি এরপর বলেন, এর তিনটি প্রধান কারণ বর্তমান…প্রথম… দ্বিতীয়…তৃতীয়।
৪. অচেনাকে চেনার সঙ্গে তুলনা করুন
মাঝে মাঝে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নিজেকে বেশ একটু বেকায়দায় পড়েছেন বলে মনে হতে পারে–অর্থাৎ আপনার বক্তব্য বিষয় ব্যাখ্যা করতে। বিষয়টা হয়তো বা আপনার কাছে বেশ পরিষ্কার–কিন্তু নিজের কাছে পরিষ্কার হলেই হবে না, শ্রোতাদের কাছেও তা স্পষ্ট হওয়া চাই। এক্ষেত্রে করণীয় কি?
ধরুন আপনি শ্রোতাদের কাছে রসায়ন শাস্ত্রের অবদান সম্পর্কে বলতে চান–বিশেষ করে অনুঘটক বা ক্যাটালিস্ট সম্পর্কে। এই পদার্থটি নিজে পরিবর্তিত না হয়ে দুটি পদার্থকে পরিবর্তিত হতে সাহায্য করে। ব্যাপারটা খুবই সহজ। এটা বোঝানোর জন্য বলতে পারেন অনুঘটক হল এক স্কুলের বড়সড় দুষ্টু ছেলের মত–সে সারাক্ষণ ছোট ছোট ছেলেদের মারধর করে অথচ তার কিছু কেউই করতে পারে না।
একবার একদল মিশনারী আফ্রিকার মধ্যাঞ্চলে ধর্ম প্রচার করার সময় বাইবেলের কাহিনীকে বাধ্য হয়ে স্থানীয় আদিবাসীদের কথ্য ভাষায় অনুবাদ করতে বাধ্য হন। তারা নিজেরা কি বাইবেলকে সরাসরি অনুবাদ করলে কাজ হত। একেবারেই না–কারণ অশিক্ষিত ওই অধিবাসীরা তার কিছুই বুঝত না। যেমন ধরুন বাইবেলের এই লাইনটি : ‘তোমার পাপের রঙ রক্তবর্ণ হলেও তা তুষারের মত শুভ্র হবে। এখন তুষার আর শ্যাওলার তফাত ওই অধিবাসীরা বুঝত না। অতএব মিশনারীরা প্রয়োজনে লাইনটা বদলে নিয়েছিলেন এইরকম করে : ‘তোমার পাপ রক্ত লাল হলেও তা নারকেলের শাঁসের মতই সাদা হবে।’
অবস্থা বিবেচনায় এর চেয়ে আর কি করণীয় থাকতে পারে?
কোন ঘটনাকে ছবির মত করে তুলুন।
পৃথিবী থেকে চাঁদ কত দূরে? সূর্য? অথবা সবচেয়ে কাছের কোন গ্রহ। বিজ্ঞানী মহাকাশ অভিযানের বর্ণনা অঙ্কের মাধ্যমেই দেবেন। কিন্তু বিজ্ঞান সম্বন্ধে বক্তা আর লেখকরা জানেন সাধারণ শ্রোতাদের বোঝানোর পথ এটা নয়। তারা অঙ্ককে ছবিতে পরিণত করেন।
বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার জেমস জিন্স বিশেষ ভাবেই চেষ্টা করতেন সাধারণ মানুষ যাতে পৃথিবীর আর মহাবিশ্বের রহস্য জারতে পারে। একজন বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক আর দক্ষ মানুষ হিসেবে স্যার জেমস জিনস্ জানতেন বিজ্ঞানে অঙ্কের স্থান কোথায়। তাই যখন সহজবোধ্যভাবে তিনি বিজ্ঞানের কথা বলতেন বা লিখতেন তার পক্ষে কোথায় অঙ্ক এড়িয়ে যেতে হবে তা তিনি জানতেন।
আমাদের সূর্য (সূর্যও একটি তারা) আর আমাদের গ্রহের চারপাশের গ্রহগুলো এতই কাছে যে আমরা বুঝতে পারি না মহাজগতের অন্যান্য বস্তুরা কতদূরে অবস্থিত। ব্যাপারটা স্যার জিনস্ তাঁর আমাদের চার পাশের মহাবিশ্ব বইটিতে বুঝিয়ে বলেছেন। তিনি তাঁর বইতে লিখেছেন, ‘আমাদের সবচেয়ে কাছের তারাটি (প্রক্সিমা সেন্টাউরি) রয়েছে ২৫,০০০,০০০,০০০,০০০ মাইল দূরে। তারপর দূরত্বটা ভাল করে বোঝাতেই তিনি লিখেছেন কেউ যদি আলোর গতিতে, অর্থাৎ প্রতি সেকেণ্ডে ১,৮৬,০০০ মাইল বেগে পৃথিবী থেকে প্রক্সিমা সেন্টাউরির দিকে যাত্রা করে তাহলে সেখানে পৌঁছতে তার চার বছর তিন মাস সময় লেগে যাবে।
এই ভাবেই স্যার জিন্স অন্যান্য গ্রহ উপগ্রহের দূরত্বকে বেশ সহজভাবে বুঝিয়ে দিতে পেরেছেন। আমি একবার এক বক্তাকে আলাস্কার আয়তন বোঝাতে শুনি। তিনি স্রেফ বলেন আলাস্কার আয়তন হল ৫৯০,৮০৪ বর্গমাইল। এর বেশি আর কিছুই তিনি বলেন নি।
এথেকে কারও পক্ষে কি যুক্তরাষ্ট্রের ৪৯তম রাজ্যটির আসল আয়তন আন্দাজ করা সম্ভব? রাজ্যটি কতটা বড় জানতে আমায় বেশ অপেক্ষাই করতে হয়, যখন আর একজন বক্তা জানালেন–আলাস্কার আয়তন হল ভারমন্ট, নিউ হ্যাঁম্পশায়ার, মেইন, ম্যাসাচুসেট্স, রোড আইল্যাণ্ড, নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি, পেনসিলভানিয়া, ডেলাওয়ার, মেরীল্যাণ্ড, পশ্চিম ভার্জিনিয়া, উত্তর ক্যারোলিনা, দক্ষিণ ক্যারোলিনা, জর্জিয়া, ফ্লোরিডা, টেনেশী আর মিসিশিপির মিলিত আয়তনের সমান। এবার ৫৯০,৮৪০ বর্গমাইল কতটা হতে পারে তার একটা ধারণা পেলাম। নড়াচড়া করার মত ভাল জায়গাই তো তবে আলাস্কায় রয়েছে।
কয়েক বছর আগে আমাদের ক্লাসের এক সদস্য আমাদের দেশের রাজপথে যে ভয়ঙ্কর সব দুর্ঘটনা ঘটে তার এক ভয়াল বিবরণ দেন : ধরুন আপনি নিউইয়র্ক থেকে লস এঞ্জেলস চলেছেন। এবার রাস্তার পাশ চিহ্নের বদলে কফিন সাজানোর রয়েছে ভাবতে পারেন-আর প্রতিটি কফিনে ভরা আছে গতবছরে দুর্ঘটনায় মৃত এক একজন মানুষ। যতই গাড়িতে এগোবেন ততই পাঁচ সেকেণ্ড অন্তর ওই কফিন আপনার চোখে পড়বে। অর্থাৎ সারা দেশ জুড়ে প্রতি মাইলে এ রকম বারোটা কফিন দেখবেন।
পথ দুর্ঘটনা শিকারের এমন নিখুঁত বর্ণনা আর হতে পারে না। যখনই আমি গাড়িতে যাই বিবরণটা আমার চোখে ভেসে ওঠে।
