সপ্তম পরিচ্ছেদে আপনারা শ্রোতাদের কাছ থেকে কাজ আদায় সম্পর্কে ফর্মুলার কথা পড়েছন। এবার আপনাদের শোনাবো কিভাবে শ্রোতাদের আপনার বক্তব্য জানাতে পারেন, এবং কিভাবে তাদের কাজে উদ্বুদ্ধ করতে হয়।
মনে রাখবেন প্রায় প্রতিদিনই আমরা এই তথ্য জানিয়ে কথাবার্তা বলি–যাতে আমরা অনেক আদেশ দিই, ব্যাখ্যা করি, ইত্যাদি। সারা বছর ধরে আমাদের পাঠক্রমের ক্লাসে যে সব পরামর্শ দেওয়া হয় তার মধ্যে এই তথ্য জানান দেওয়া হল কাজে উদ্বুদ্ধ করার পর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ। পরিষ্কার, স্পষ্টভাবে বক্তব্য রাখতে পারলে অপরকে চট করে কাজে উদ্বুদ্ধ করা যায়। এ সম্বন্ধে আমেরিকার বিখ্যাত শিল্পতি ওয়েন ডি, ইয়ং বলেছেন আজকের দুনিয়ায়, এই স্পষ্ট বক্তব্য রাখার প্রয়োজনীয়তা অসামান্য। তিনি যা বলেছেন সেটা এই রকম :
‘কোন মানুষ যখন অপরকে বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা বাড়াতে পারেন, তিনি ততটাই নিজের প্রয়োজনীয়তা বাড়াতে পারেন। আমাদের সমাজে নিশ্চিত ভাবেই মানুষকে ছোটখাটো ব্যাপারেও পরস্পরের সঙ্গে সহযোগিতা করতে হয়। এ জন্য প্রথমেই তাদের ভাষাই হবে প্রধান অবলম্বন, অতএব আমাদের এটার ব্যবহার করা শিখতে হবে, নিছক ব্যবহারের জন্য নয়, অত্যন্ত কৌশলে।‘
এই পরিচ্ছেদে আপনার কাছে উপস্থিত করা হচ্ছে কিভাবে স্পষ্ট, পরিষ্কার ভাবে শ্রোতাদের সামনে নিজেকে হাজির করতে পারবেন যাতে আপনাকে বুঝে নিতে তাদের কোনই অসুবিধা না হয়। লর্ড উইগ উইটগেনস্ক্রিন বলেন, সবকিছু যদি ভালভাবে চিন্তা করা যায় এবং তাই পরিষ্কার ভাবে বলাও যায়।
১. আপনার হাতের সময় অনুযায়ী বক্তব্য রাখুন
শিক্ষকদের কাছে কথা বলার এক ফাঁকে প্রফেসর উইলিয়াম জেমস মন্তব্য করেছিলেন যে কোন বক্তা বক্তব্য রাখতে গিয়ে একটা সময় একটা বিষয় নিয়েই বক্তব্য রাখতে পারেন। যে বক্তৃতার কথা তিনি বলেছিলেন তাতে সময় লাগে এক ঘণ্টা। তবুও ইদানীং একজন বক্তাকে আমি বলতে শুনি মাত্র তিন মিনিট সময় দেওয়া সত্ত্বেও তিনি এগারোটি বিষয় নিয়ে বলবেন। ভাবুন, প্রতিটি বিষয়ের ক্ষেত্রে সময় মাত্র সাড়ে ষোল সেকেণ্ড। শুনে অসম্ভব আর অবাস্তবই মনে হবে যে, কোন বুদ্ধিমান বক্তা এমন অবাস্তব কাজ করবেন।
যেমন ধরুন, আপনি যদি কোন শ্রমিক ইউনিয়ন সম্পর্কে কিছু বলতে চান তাহলে তিনি কি ছ’ মিনিটে কখনই বলার চেষ্টা করবেন না এই শ্রমিক ইউনিয়নের জন্ম হয় কেমন করে, তাদের কাজের ধারা কেমন। কি কি ভাল কাজ তারা করেছে আর কলকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ কিভাবেই বা সমাধান করা যায়। না, এসব ব্যাপারে কখনই কিছু ওই অল্প সময়ে বলার চেষ্টা করবেন না। করণ তাতে শ্রোতারা। বিষয়টা আদৌ ভালভাবে বুঝবে না। আসলে এতে আপনার বক্তব্য হয়ে দাঁড়াবে গোলমেলে অস্পষ্ট।
মনে রাখবেন বহু অভিজ্ঞ বক্তারাও এরকম মারাত্মক রকম ভুল করে থাকেন। আসলে অন্য ব্যাপারে তাদের দক্ষতা থাকায় তারই অহঙ্কারে এটা চাপা পড়ে যায়। আপনি এ পথ তাই পরিহার করবেন।
২. আপনার ধারণা সাজিয়ে নিন
প্রায় সব বিষয়েই যুক্তি পূর্ণ ধারাবাহিকতা দিয়ে গড়ে তোলা যায়। এটা করার জন্য কাজে লাগাতে হবে সময়, অবকাশ, আর বিশেষ বিষয়কে। সময়ের ব্যাপার যেমন ধরা যাক, আপনি আপনার বক্তব্যকে অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যত এই তিনটি ভাগে ভাগ করতে পারেন। ধরুন, আপনি কোন একটা তারিখ দিয়ে শুরু করার পর অতীতে চলে গেলেন তারপর আবার এগিয়ে এলেন। যে সব বক্তব্যের বিষয় কোন গঠনমূলক কিছুতে নিবদ্ধ থাকে সেটা শুরু করতে হয় প্রথমেই কাঁচা মাল দিয়ে। তারপর ধাপে ধাপে তাকে বিভিন্ন পথে এগিয়ে নিয়ে সম্পূর্ণ উৎপাদিত পণ্যে পরিণত করতে হয়। বক্তব্যে কতখানি বর্ণনা রাখবেন সেটা নির্ভর করবে আপনার হাতে সময় কতটা আছে।
অবকাশের ব্যাপারে আপনি এগিয়ে চলবেন আপনার ধারণার বিষয় বস্তুকে সাজিয়ে। এখান থেকেই আপনি অগ্রসর হবেন। যেমন ধরুন আপনি যদি ওয়াশিংটনের ক্যাপিটেল প্রাসাদের বর্ণনা দিতে চান তাহলে আপনি শুরু করবেন একদম এর চূড়ো থেকে। তারপর একটু একটু করে চারপাশের বর্ণনা দেবেন। কোন জেটের ইঞ্জিন বা মোটর গাড়ির ইঞ্জিনের বর্ণনা দিতে গেলে সবচেয়ে ভাল হয় ইঞ্জিনকে টুকরো করে তার ব্যাখ্যা দিয়ে।
৩. এগিয়ে চলার পথে বিষয়টি ব্যাখ্যা করুন
কোন বক্তব্যকে শ্রোতাদের মনে আগ্রহের আর সজীব রাখতে গেলে বক্তৃতা চলার ফাঁকে পরিষ্কারভাবে শ্রোতাদের বলতে চাইবেন, বিষয়গুলো পর পর সাজিয়ে বলবেন। ‘আমার প্রথম কথা হল এই…’, আপনি এই রকম সাদামাটা ভাবেও শুরু করতে পারেন। এইভাবেই পরপর শেষ পর্যন্ত যেতে পারেন।
ড. রালফবাঞ্চ, রাষ্ট্রপুঞ্জের তৎকালীন অ্যাসিট্যান্ট সেক্রেটারী, নিউইয়র্কে এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা এইভাবে আরম্ভ করেছিলেন :
‘আজ সন্ধ্যায় আমি এই বিষয়ে যা বলব ঠিক করেছি তাহল ‘মানবিক সম্পর্কের সংঘাত’। এটা করতে চাই দুটি কারণে, তিনি বলেন, প্রথমত এই…’, তারপরই তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয়ত এই…’। তাঁর বক্তৃতায় সারাক্ষণই তিনি এইভাবে পরপর তাঁর বক্তব্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। একেবারে উপসংহারে তিনি বলেন :
‘আমাদের কখনই মানুষের ভালো করার সুপ্ত ক্ষমতার কথা ভুলে যাওয়া উচিত নয়।‘
