প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার দুবছর পরে লিঙ্কন আবিষ্কার সম্বন্ধে একটা ভাষণ তৈরী করেন। সেক্ষেত্রে তার উদ্দেশ্য ছিল মনোরঞ্জন করা। অন্তত বলা যায় এটাই তার উদ্দেশ্য হতে পারত। তবে দুঃখের কথা তাতে সেরকম সাফল্য তিনি পাননি। জনপ্রিয় বক্তা হিসেবে তিনি একেবারে ব্যর্থ-ব্যাপারটা বেশ হতাশারও বটে। একবার কোন শহরে তাঁর ভাষণ শুনতে একজন শ্রোতাও হাজির হন নি।
তাসত্ত্বেও কিন্তু অন্যান্য বহু বক্তৃতায় তিনি দারুণ সাফল্য অর্জন করেন। তার কয়েকটা তো মানুষের ইতিহাসে প্রায় অমরত্ব লাভ করেছে। কেন? তার প্রধান কারণই হল তার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে লিঙ্কনের বেশ পরিস্কার একটা ধারণা ছিল আর কী করে তা অর্জন করতে হবে তিনি জানতেন।
বহু বক্তাই এসব ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয় আর চরম দুঃখের শিকারও হয়।
একটা উদাহরণ দিচ্ছি : মার্কিন কংগ্রেসের একজন কংগ্রেস সভ্য নিউইয়র্কের কোন সভায় সভা ত্যাগ করতে বাধ্য হন, কারণ শ্রোতারা তাঁকে টিটকারী মারতে শুরু করে। ব্যাপারটা এই : তিনি জেনে বা না জেনেই হোক শ্রোতাদের কিছু জ্ঞান দিতে চেয়েছিলেন। শ্রোতারা কোন জ্ঞান লাভ করানো বরদাস্ত করতে পারেনি। তারা চাইছিল মনোরঞ্জন। তারা প্রথম দিকে ধৈর্য ধরেই বক্তৃতাটা শুনতে চাইলো, তাদের ধারণা ছিল আসল ব্যাপার এরপরেই আসবে। কিন্তু তা আর এলোনা-ফলে শ্রোতাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। একজন তার বিরক্তি প্রকাশ করতেই বাকিরা হাজার হাজার শ্রোতা চিৎকার, শিস দেওয়া
আরম্ভ করে। শ্রোতারা আর সহ্য করতে রাজি হয়নি। বক্তা শ্রোতাদের ওই অবস্থা দেখেও বক্তৃতা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। ফলে শ্রোতারা এবার ক্ষেপে প্রায় লড়াই লাগিয়ে দিল। তাদের চিৎকারে বক্তার গলা চাপা পড়ে গেল, এমন কি বিশ হাত দূরেও তার গলা শোনা গেল না। ভদ্রলোক এবার অপমানিত, হতাশ আর মনমরা হয়ে সভা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হলেন।
এই ঘটনা থেকে সকলের শিক্ষা নেওয়া উচিত। তাই শ্রোতাদের দেখে আর উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত হয়েই আপনার বক্তব্য বিষয় ঠিক বেছে নেওয়া উচিত। কংগ্রেসের সদস্যটি যদি আগেই জেনে নিতেন তার বক্তব্য ওই শ্রোতাদের যোগ্য হবে তাহলে তিনি বিপদে পড়তেন না। তাছাড়া সভাটি যদি কোন রাজনৈতিক বিষয়ের হত তাহলে হয়তো এমন অবস্থা হত না। আগে বলা চারটি উদ্দেশ্য দেখে নিয়ে তবেই বক্তব্য রাখতে এগোনো উচিত।
বক্তৃতা তৈরি করার ক্ষেত্রে আপনাকে পরামর্শ দেওয়ার জন্যই এই পরিচ্ছেদ। এর আর এক উদ্দেশ্য হল কাজ আদায় করার জন্য ছোট ছোট বক্তৃতা। পরের তিনটি পরিচ্ছেদে থাকবে বাকি প্রধান উদ্দেশ্য গুলো : অবহিত করা খবর জানানো, নিশ্চিত করা ও বিশ্বাস জন্মানো আর মনোরঞ্জন। প্রতিটি উদ্দেশ্যেরই চাই আলাদা ধরণের ব্যবস্থাপত্র, কারণ প্রতিটির সামনে থাকে বিশেষ ধরণের বাধার প্রাচীর। এগুলো অতিক্রম করা চাই।
এবার প্রথমে আসুন শ্রোতাদের কিভাবে কাজে উদ্বুদ্ধ করা যায় তাই দেখা যাক। এই বিষয়ে শ্রোতাদের কাজে উদ্বুদ্ধ করার কোন সফল পদ্ধতি আছে কি? নাকি নিছকই এটা কথার কথা।
আমার মনে পড়ছে ত্রিশের দশকে যখন সহকারীদের নিয়ে সারা দেশে ক্লাস আরম্ভ করতে ব্যবস্থা করি। আমাদের সংখ্যা অনেক ছিল বলে প্রত্যেক ক্লাসের সভ্যর জন্য মাত্র আড়াই মিনিট সময় নির্দিষ্ট করা হয়। অবশ্য এই সময় সীমা বেঁধে দেওয়ার কোন অসুবিধা হয়নি যেহেতু সকলেরই আসল উদ্দেশ্য ছিল মনোরঞ্জন করা বা কিছু বিষয় জানানো। কিন্তু যখন কাজে লাগানোর ব্যাপারটা এলো তখন অন্য ব্যাপার ঘটল। কাজে লাগানোর বক্তৃতায় কোন ফলই হতে চাইলো না যখন আমরা সেই অ্যারিষ্টটলের আমল থেকে চালু বক্তৃতার পুরনো পদ্ধতি কাজে লাগাতে গেলাম। অতএব বোঝা গেল শ্রোতাদের কাজে উদ্বুদ্ধ করতে নিশ্চিত কোন পথ পেতে গেলে নতুন কোন উপায় এই দুই মিনিটের বক্তৃতায় চাই।
আমরা এজন্য শিকাগো, লস এঞ্জেলস আর নিউইয়র্কে সভা করলাম। আমাদের শিক্ষকদের কাছে নানা আবেদন রাখলাম। এধরণের বক্তৃতার বিষয়বস্তু জোগাড় করতে সব চেষ্টাই আমরা চালালাম।
আমরা হতাশ হইনি। নানা ধরনের ওই সব আলোচনার মধ্য দিয়ে একটা যাদুকরী ফর্মূলা আবিষ্কার সম্ভব হল। সে সব আমরা আমাদের ক্লাসে ব্যবহার শুরু করলাম-আর এখনও তা ব্যবহার করা হয়ে চলেছে। সেই ম্যাজিক ফরমূলাটি কী? ভারি সহজ ব্যাপার আর সেটা এই : যে উদাহরণ রাখতে চাইছেন সে বিষয়ে খুঁটিনাটি বর্ণনাসহ কথা শুরু করুন। তারপর বেশ স্পষ্টভাবে আপনার ইচ্ছা প্রকাশ করুন-শ্রোতাদের কোন্ বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করতে চান। তৃতীয়ত আপনার এই উপদেশের বা বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি রাখুন-শ্রোতাদের পক্ষে এর উপযোগিতা কতখানি।
এই ফর্মুলাটি আমাদের গতিময় অত্যাধুনিক জীবন ধারার সঙ্গে একান্ত উপযোগী। বক্তাদের পক্ষে এখন ধীর, দীর্ঘায়িত ভাষণ শুরু কখনই সম্ভবপর হয় না। অপর পক্ষে শ্রোতাদের মধ্যে থাকে ব্যস্ত মানুষ–এই কারণেই বক্তাকে সরাসরি সহজ, সরলভাবে তার বক্তব্য রাখতেই হবে।
এই যাদু ফর্মূলা কাজে লাগানোর সময় বক্তাকে বিশেষ ভাবেই সতর্ক থাকতে হবে যাতে নীচে বর্ণিত পথে কখনও বক্তব্য রাখতে চাওয়া না হয়। যেমন—’আমার কথাগুলো তেমন ভাবে তৈরী করে আসতে পারিনি’, বা ‘আমাকে যখন বলার জন্য বেছে নেওয়া হল বুঝতে পারিনি আমাকে কেন নেওয়া হল’। মনে রাখবেন শ্রোতারা কখনই এধরণের মার্জনা চাওয়া বা অজুহাত পছন্দ করে না। তারা চায় কাজ। এই যাদু ফর্মূলার মধ্য দিয়ে আপনি তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসটিই দিতে পারবেন।
