মেইনের মার্কিনী সেনেটর এডমাণ্ড এস. মাস্কি এই ব্যাপারটি বোস্টনের আমেরিকান ফরেনসিক অ্যাসোসিয়েশনে বক্তৃতা দেবার সময় বুঝিয়ে ছিলেন।
তিনি সেখানে বলেন, ‘আজ সকালে যখন এখানে আমার কাজ করার জন্য আসি আমার বেশ সন্দেহ ছিল আমি পারব কি না। এর কারণ হল আমার শ্রোতাদের পেশাদারী গুণাবলী আর তাদের সামনে আমার সামান্য জ্ঞান প্রকাশ যুক্তিসম্মত হবে কিনা। তাছাড়া যতদিন আমি রাজনীতিগত দিক থেকে কাজে নিয়োজিত থাকব, ততদিন আমাদের শ্রোতাদের মধ্যে ভেদ থাকবেই।’
‘এইসব সন্দেহ নিয়েই হাজির হয়ে কোথায় শুরু করব বুঝতে পারছি না।’
সেনেটর মাস্কি অবশ্য ওখান থেকেই শুরু করে চমৎকার ভাবেই এগিয়ে ছিলেন আর অমূল্য একটা বক্তৃতাও দিয়েছিলেন।
অ্যাডলাই স্টিভেনসন ও এইভাবে নিজেকে বক্তৃতার সময় প্রকাশ করে শ্রোতাদের হৃদয় জয় করতেন।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতাদানের সময় তিনি বলেছিলেন, এই রকম কোন অবস্থায় আমি নিজের ক্ষুদ্রতা সম্পর্কে বড়ই ভাবনায় পড়ে যাই। আমি এক্ষেত্রে কি করব ভাবতেই স্যামুয়েল বাটলারের মন্তব্য স্মরণ করি। সেটা হল : ‘আগামী পনেরো মিনিট কিভাবে কাজে লাগাবো সেটাই আমি জানি না। আর আমার পক্ষে পরের বিশ মিনিটই আমায় ভাবনায় ফেলে দেয়।
শ্রোতাদের বিরাগভাজন করে তোলার সবচেয়ে সহজ পথ হল নিজেকে তাদের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান ভেবে বসা। আপনি যখন জনসংযোগ করেন আর তা আপনার বক্তৃতার মাধ্যমে তখন আপনি থাকেন আসলে একটা শো কেসের মধ্যে। তখন আপনার সব কিছু প্রকাশ হয়ে পড়ে, আপনার দোষ গুণ, আপনার ব্যক্তিত্ব সবই। এক্ষেত্রে সামান্যতম বাগাড়ম্বর বা দম্ভ প্রকাশ করা হয়ে ওঠে মারাত্মক। অন্যদিকে আবার আন্তরিক বিনয় প্রকাশে শ্রোতারা বশীভূত হবেনই এবং সহজেই তাতে তাদের বিশ্বাস অর্জন করা সম্ভব। আপনি যদি জানান যে কোন বিষয়ে আপনার জ্ঞান সীমাবদ্ধ তাতে আপনার শ্রোতারা আপনার প্রতি বিরূপ না হয়ে বরং খুশিই হবেন।
সমালোচনায় রাগ করবেন না বরং সমালোচনাকে আহ্বান করাই ভালো। ঠিক এমনই করতেন আমেরিকান দূরদর্শনের এড সুলিভান। তাঁর নিজের কিছু ত্রুটি অবশ্যই ছিল! দর্শকরা এ ব্যাপারে তাঁর সমালোচনা করায় তিনি তা হাসি মুখেই গ্রহণ করতেন আর হাসতেও চাইতেন। এতেই তিনি দর্শকের একান্ত প্রিয় পাত্র হয়ে ওঠেন। আসলে দর্শকরা বা শ্রোতারা আন্তরিকতা ঘৃণা করে না।
কনফুসিয়াস সম্বন্ধে বলা হয় তিনি কোন সময়েই মানুষকে তাঁর জ্ঞানের উদাহরণ দিয়ে চমকে দিতে চাইতেন না। বরং তিনি সহানুভূতির প্রলেপ দিয়ে তাদের আলোকিত করতে চাইতেন। আমাদেরও যদি এই সহানুভূতির ভাব থাকে তাহলে শ্রোতাদের হৃদয় মন্দিরে প্রবেশ, সেটাই হবে চাবিকাঠি।
০৬. অল্প কথায় কাজ আদায়
প্রথম মহাযুদ্ধের সময় একজন বিখ্যাত ইংরাজ বিশপ আপটন শিবিরে সেনাবাহিনীর সামনে কিছু বলেছিলেন। সৈন্যরা টেঞ্চে চলেছিল–তাদের খুব অল্পসংখ্যকেরই ধারণা ছিল তাদের কেন পাঠানো হচ্ছে। আমি জানি–আঁমি তাদের প্রশ্ন করেছিলাম। তাসত্ত্বেও বিশপ ওদের কাছে আন্তর্জাতিক শান্তির আর সার্বিয়ার এক মুঠো আলোর অধিকার সম্পর্কে বলেন। আশ্চর্য ব্যাপার হল ওদের অর্ধেকও জানত না সার্বিয়া কোন শহর না কোন রোগের নাম। বিশপ যদি নীহারিকা পুঞ্জ সম্বন্ধে বক্তৃতা করতেন তাহলেও চলত। তা যাই হোক একজন সৈন্যও ঘর ছেড়ে যায়নি তিনি যতক্ষণ কথা বলেন–প্রতি দরজায় তাদের পথ আটকানোর জন্য মিলিটারি পুলিশ পাহারায় ছিল।
আমি ওই বিশপকে ছোট করছি না। তিনি অত্যন্ত জ্ঞানী তবে গির্জায় তাঁকে ভালো মানাত। তিনি ওই সেনাদের কাছে একেবারে ব্যর্থই হলেন। কিন্তু কেন? আসলে তিনি তাঁর বক্তৃতার মূল উদ্দেশ্য কি জানতেন না, আর জানতেন না কাজটা সমাধানের প্রকৃষ্ট পথ কি।
বক্তৃতার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে আপনাদের ধারণা কি রকম? সেটা হবে এই : বক্তা উপলব্ধি করুন বা নাই করুন প্রত্যেক বক্তৃতারই চারটি প্রধান উদ্দেশ্য থাকে। সেগুলি কি?
সেই চারটি উদ্দেশ্য হল এই : ১। কাউকে কাজে প্ররোচিত করা বা কাজে লাগান। ২। খবর জানানো। ৩। নিশ্চিন্ত করা আর বিশ্বাস জন্মানো। ৪। মনোরঞ্জন করা।
আসুন উপরের ওই চারটি উদ্দেশ্য কী রকম তা আব্রাহাম লিঙ্কনের বক্তার জীবন থেকে কতকগুলো উদাহরণ তুলে দেখা যাক।
অনেক লোকেরই জানা আছে যে আব্রাহাম লিঙ্কন একবার বালির চড়ায় বা অন্য কোথাও আটকে পড়া নৌকা তোলার একটা উপায় বের করে সেটা পেটেন্ট করে নিয়েছিলেন। তিনি আইনের অফিসের কাছে একজন যন্ত্রবিদের অফিসে কাজ করে ওই যন্ত্রটার মডেল তৈরী করেছিলেন। বন্ধুরা এসে ওই যন্ত্র দেখতে চাইলে আমাদের সামনেই লিঙ্কন তার কার্যকারিতা বুঝিয়ে দিতেন। তাঁর ওই ভাবে বোঝানোর আসল উদ্দেশ্যই ছিল খবর জানানো।
গেটিসবার্গে তিনি যখন তার পর পর দুটি উদ্বোধনী ভাষণ অনুষ্ঠানে তার অমর বক্তৃতা দান করেন আর হেনরী ক্লে মারা যাওয়ার পর তাঁর জীবনী নিয়ে যা বলেন–সবই তিনি করেন মানুষের মনে প্রভাব ফেলে বিশ্বাস উৎপাদন করতেই।
লিঙ্কন জুরিদের সামনে যখন কথা বলতেন তখন তিনি তার স্বপক্ষে মত আদায় করতে পারতেন। তার রাজনীতি সংক্রান্ত ভাষণে তিনি ভোট অর্জনের চেষ্টা করতেন। এক্ষেত্রে তাঁর উদ্দেশ্য থাকত কাজ আদায়।
