আপনারা ধরেই নিতে পারেন ম্যাকমিলান তাঁর বাবা মার সঙ্গে আমেরিকান জীবন ধারার সম্পর্কের কথা বলায় শ্রোতাদের সঙ্গে সঙ্গেই বন্ধু করে নিতে পেরেছিলেন।
যোগাযোগ স্থাপন করার আরও একটা পথ হল শ্রোতাদের কারও নাম উল্লেখ করে শুরু করা। আমি একবার এক সম্বর্ধনা সভায় বক্তার পাশেই বসেছিলাম। হলের নানা মানুষ সম্পর্কে তার আগ্রহ দেখে বেশ অবাক হয়ে যাই। নৈশভোজের সময় সারাক্ষণ আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করি যে ভদ্রলোক প্রধান আমন্ত্রককে বারবার বিশেষ বিশেষ ভদ্রলোক বা ভদ্রমহিলা সম্পর্কে জানতে চাইছিলেন। তিনি যখন কথা বলার জন্য উঠে দাঁড়ালেন তখনই বুঝতে পারলাম তার আগ্রহের কারণ কী। তিনি চমৎকার কায়দায় বেশ কিছু উপস্থিত ভদ্রমহিলা আর ভদ্রলোকের নাম উল্লেখ করলেন। আমি দেখতে পেলাম তারা এতে অসম্ভব খুশিও হলেন আর তাঁদের মুখও হাসিতে ঝলমল করতে আরম্ভ করল। তাঁদের চোখে মুখে বেশ একটা উত্তাপ মেশানো বন্ধুত্বের স্পর্শ ফুটে ওঠে। সামান্য ওই কৌশলে বক্তা একাজ করতে পেরেছিলেন।
তবে এখানে একটু সতর্কতা নেওয়ারও প্রয়োজন আছে। ব্যাপারটি অন্য কিছুই নয়–যে নাম আগে থেকে শুনে আপনি উল্লেখ করবেন তাদের সম্পর্কে সঠিক বিবরণ অবশ্যই জেনে নেওয়া উচিত। তাঁদের নাম উপযুক্ত সময়েই উল্লেখ করবেন।
শ্রোতাদের আরও কাছে টানার অপর কৌশল হল কথার মাঝখানে মাঝে মাঝে সর্বনাম ব্যবহার করা। কখনও তাঁরা’ কথাটা ব্যবহার করবেন না বরং করবেন আপনি বা আপনারা।
আমাদের নিউইয়র্কের ক্লাসে একজন ছাত্র শ্রোতাদের সামনে সালফিউরিক অ্যাসিড নিয়ে নিচের বিবৃতিটি দিয়েছিল :
সালফিউরিক অ্যাসিড আপনার জীবনকে নানাভাবেই ছুঁয়ে যায়। সালফিউরিক অ্যাসিড না থাকলে আপনার গাড়ি থেমে যেত। কেননা এই অ্যাসিড দিয়ে কেরোসিন আর গ্যাসোলিন সাফাই হয়। যে বিদ্যুতের আলো আপনার অফিস আর বাড়িতে আলো দেয় তাও এটা না থাকলে সম্ভব হত না।
‘স্নান করার সময় যে সাবান ব্যবহার করেন আপনি তাও পেতেন না এই অ্যাসিড না থাকলে, কারণ ওই অ্যাসিডেই তেল শোধন করা হয়। আপনার দাঁত মাজার ব্রাশ বা মাথার চুল আঁচড়ানোর চিরুনিই বানানো যেত না এই পদার্থ না থাকলে।‘
‘তাই যেখানে যেভাবেই থাকুন এই পদার্থটিকে কোন ভাবেই এড়িয়ে চলার পথ আপনার নেই।’
বেশ কৌশলে ‘আপনি’ কথাটা ব্যবহার করে বক্তা শ্রোতাদের একাত্ম করতে পেরেছিলেন তাঁদের প্রচুর আগ্রহীও করতে পেরেছিলেন। আবার এটাও মনে রাখবেন এই ‘আপনি’ সর্বনাম ব্যবহার যখন বিপজ্জনক মনে হবে তখন ব্যবহার করবেন ‘আমি’ বা ‘আমরা’।
যেমন ধরুন একজন যদি বলেন, ‘আমরা সবাই জানতে চাই কীভাবে একজন ভাল ডাক্তার ঠিক করতে পারা যায়।’ কথাটা বলেছিলেন ড. ডব্লিউ বোয়ার। এরপর তিনি বলেন, এরপর আমরা যখন, আমাদের ডাক্তারের কাছ থেকে সবচেয়ে ভালো পরামর্শ চাইবো তখন কি আমরা জানতে চাইব না ভালো রোগী কেমন করে হতে হয়?
৪. শ্রোতাদের আপনার বক্তৃতার সঙ্গী করে নিন
আপনাদের কখনও কি মনে হয়েছে আপনারা শ্রোতাদের প্রতিটি কথাতেই একটু প্রদর্শন কৌশল দেখিয়ে তাতিয়ে বা মাতিয়ে রেখেছেন? যে মুহূর্তে আপনি শ্রোতাদের কাউকে বেছে নিয়ে কোন বক্তব্য বুঝিয়ে দিতে বা নাটকীয় করে তুলতে তার সাহায্য নেবেন, তখনই তাদের মধ্যে বেশ একটা পরিবর্তন আর আগ্রহ ফুটে উঠতে দেখবেন। নিজেদের শ্রোতা হিসেবে ভেবে নেওয়ার জন্য শ্রোতারা অতিরিক্ত মাত্রায় আত্মসচেতন হয়ে উঠতে চায় যে মুহূর্তে তাদের কোন ভাবে বেছে নেওয়া হয়। বক্তা আর শ্রোতাদের মধ্যে যদি কোন অলঙ্খ প্রাচীর থাকে তাহলে এমন কাজের ফলে সে প্রাচীরের ব্যবধান দূর হয়ে যাবেই। আমার মনে পড়ছে একবার একজন বক্তা গাড়িতে ব্রেক কষলে থামতে কতক্ষণ লাগে বোঝনোর জন্য একজন শ্রোতাকে মঞ্চে উঠে আসার জন্য অনুরোধ করেন। শ্রোতাটি একটা মাপ-জোপ করার ফিতে সহ উঠে এসে সেটা টেনে মঞ্চের প্রান্ত অবধি নিয়ে যায়। সেই সময় আমি বাকি শ্রোতাদের লক্ষ্য করেছিলাম। তারা দারুণ আগ্রহ নিয়ে ব্যাপারটা শুনে যেতে চাইছিল।
শ্রোতাদের অংশ গ্রহণের ব্যাপারে আমার কৌশল হল সহজে প্রশ্ন করা আর তাতেই বেশ ভালো প্রতিক্রিয়া পাওয়া। আমার কায়দা হল শ্রোতাদের কাউকে উঠে দাঁড়াতে বলে আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে বলা। পার্সি এইচ. হুইটিং তাঁর লেখা ‘হাউ টু পুট হিউমার ইন ইওর স্পিকিং অ্যান্ড রাইটিং’–অসংখ্য ভালো পরামর্শ এ ব্যাপারে রেখেছেন। তিনি বলেছেন শ্রোতাদের সামনে আপনার সমস্যা সমাধানের বিষয় রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। মি. হুইটিং বলেছেন, ‘শ্রোতাদের আমি সহকর্মী বলেই মনে করি।’ একথাটাই এই পরিচ্ছেদের মূল কথা। আপনি যদি শ্রোতাদের আপনার বক্তব্যের সঙ্গী করে নিতে পারেন তাহলেই আপনার কাজ অর্ধেকটাই সম্পন্ন হবে।
৫. নিজেকে প্রকাশ করুন
বক্তা-শ্রোতাদের মধ্যে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার মধ্যে আন্তরিকতার কোন পরিবর্তন নেই। একবার নর্মান ভিনসেন্ট পীল তার একজন সহকারী মন্ত্রীকে খুব দামী পরামর্শ দিয়েছিলেন। মন্ত্রীটি তার শ্রোতাদের একাগ্র করতে বড়ই হিমশিম খাচ্ছিলেন, তিনি তাঁদের তাঁর মতবাদ গ্রহণ করাতে পারছিলেন না। ডঃ পীল মন্ত্রীকে প্রথমেই প্রশ্ন করলেন তিনি তাঁর বিবেকের কাছে কি আদৌ জানতে চেয়েছেন তিনি শ্রোতাদের পছন্দ করেন কি না, তাঁদের সাহায্য করতে চান কি না, তাঁদের নিজের তুলনায় বুদ্ধিগত দিক থেকে নিকৃষ্ট মনে করেন কি না? ডঃ পীল বলেছেন তিনি নিজে কখনই তার শ্রোতাদের প্রতি আন্তরিক টান ছাড়া মঞ্চে ওঠেন না। কোন বক্তা মঞ্চে আসীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শ্রোতারা তাকে চুলচেরা বিচার করে ফেলার চেষ্টা করেন। বক্তা হয়তো নিজেকে তাদের তুলনায় জ্ঞানী বলেই ভাবতে চায়। তাই এসব ক্ষেত্রে শ্রোতাদের মন জয় করার সবসেরা পথই হল নিজেকে তাদের সামনে প্রকাশ করে ফেলা।
