কোন বক্তব্য রাখার আগে নিজেকে একবার প্রশ্ন করে নিন আপনার বলার বিষয় শ্রোতাদের সমস্যা সমাধানে কতখানি সহায়ক হতে পারে। তারপরেই এগিয়ে চলুন। যেমন ধরুন, আপনি যদি অ্যাকাউন্ট্যান্ট হন তাহলে এই ভাবেই শুরু করতে পারেন : ‘আমি আপনাদের দেখাতে চাই করের ব্যাপারে আপনারা কিভাবে পঞ্চাশ বা একশ ডলার বাঁচাতে পারেন…।’ অথবা আপনি যদি একজন আইনজ্ঞ হন তাহলে শ্রোতাদের উইল করার কলা কৌশল সম্বন্ধে বলতে পারেন, আগ্রহী শ্রোতার অভাব হবে না।
লর্ড নর্থক্লিফকে যখন প্রশ্ন করা হয় ‘মানুষের আগ্রহ জাগে কিসে’ তিনি জবাব দেন : ‘শ্রোতারা নিজেরাই নিজেদের আগ্রহ জাগায়’। এই একটি বিশ্বাসে নির্ভর করেই তিনি সংবাদ পত্রের বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন।
‘মাইন্ড ইন দি মেকিং’-গ্রন্থে জেমস হার্ভে রবিনসন অবকাশকে ‘চিন্তার ক্ষেত্রে এক স্বতঃস্ফূর্ত ভাব’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে অবকাশের ফাঁকে মানুষের ধ্যানধারণা একটা নির্দিষ্ট রূপ পেয়ে চলে। আমাদের নিজেদের কাছে নিজেদের চেয়ে আগ্রহের বিষয় আর কিছুই নেই।
ফিলাডেলফিয়ার হ্যারল্ড ডোয়াইট একবার আমাদের পাঠক্রমের এক ক্লাসের শেষ পর্যায়ে ভারি চমৎকার একটি ভাষণ দেন। তিনি তাঁর টেবিলে উপস্থিত সমস্ত লোকের সঙ্গেই এক এক করে কথা বলেন। তাঁদের প্রত্যেকের সম্পর্কেও বলেন। তাঁরা কি রকম উন্নতি করেছেন, কি ত্রুটি আছে তাদের তার অনেকখানি আবার নকল করেও দেখান। এতে বেশ হাসির ধূম পড়ে যায়। প্রত্যেকে দারুণ উপভোগ করে ব্যাপারটা। ব্যাপারটা সত্যিই আদর্শ। মি. ডোয়াইট জানতেন কিভাবে মানুষের চরিত্র নাড়াচড়া করতে হয়।
কিছুকাল আগে আমেরিকান ম্যাগাজিনের এক উঁচু কর্মী জন শিডলের সঙ্গে আমার কথাবার্তা হয়। তিনি বলেছিলেন, মানুষ বড়ই স্বার্থপর। তারা কেবল নিজেদের নিয়েই মাথা ঘামায়। তারা সরকার কিভাবে রেল চালাবেন তা নিয়ে ভাবতে চায় না। তারা শুধু জানতে চায় কিভাবে উন্নতি হবে, কি ভাবে মাইনে বাড়তে পারে, কি করে স্বাস্থ্যরক্ষা হবে ইত্যাদি। আমি যদি কাগজের সম্পাদক হতাম তাহলে আমি তাদের জানাতাম কি করে দাঁতের পরিচর্যা করা যায়, গরমে শীতল হওয়া যায়, কি করে উঁচু পদে ওঠা যায়, কর্মচারিদের কিভাবে শায়েস্তা করতে হয়, ব্যাকরণ ভুল কী করে বন্ধ করা যায় এই সবই। মানুষ কেবল মানুষের কথাই আগ্রহ নিয়ে শুনতে চায়। তাই আমি জানাতে চাইতাম কোন লোক কিভাবে কোটিপতি হয়েছে…।’
এরই কিছু পরে শিডলকে কাগজের সম্পাদক করা হল। সাময়িক পত্রটির প্রচার সংখ্যা ছিল সামান্য। শিডল যা যা বলেছিলেন সম্পাদক হয়ে তিনি ঠিক তাই করলেন। এর ফল কি রকম হল জানেন? একেবারে অত্যাশ্চর্য। প্রচার সংখ্যা বেড়ে উঠল প্রায় দুলক্ষে। তারপর তিন চার থেকে একদম পাঁচ লক্ষে। তারপর দাঁড়াল দশ লক্ষে। এর কারণ, সম্পাদক শিডল পাঠকদের ব্যক্তিগত চিন্তা আর স্বার্থের কথাই বলেছিলেন তাঁর কাগজে।
এরপর যখন কোন শ্রোতাদের মুখোমুখি হবেন আপনারও চেষ্টা করা উচিত তাদের মনের কথা জেনে সেই বিষয়েই বক্তব্য রাখা। যে বক্তা এই সুযোগ গ্রহণ করতে অপারগ তিনি দেখবেন তাঁর শ্রোতারা অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছেন। তাঁরা সভাস্থল ছেড়ে যেতেই উদগ্রীব।
২. সৎ ঐকান্তিক প্রশংসা করুন
শ্রোতারা এক একজন আলাদা মানুষেরই সমষ্টি। তারা আলাদা মানুষের মতই ব্যবহার করতে চান। খোলাখুলিভাবে কোন শ্রোতাদের একবার সমালোচনা করে দেখুন। তাঁরা সঙ্গে সঙ্গেই সে বিষয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবেন। আবার কোনভাবে তাঁদের প্রশংসা করুন দেখবেন তাদের হৃদয় মন্দিরে ঢোকার অনুমতি পেয়ে গেছেন। অবশ্য এটা করতে গেলে আপনার ক্ষেত্রে কিছুটা গবেষণা চালাতে হবে। অথচ কেউ যদি বলেন, ‘এমন চমৎকার বোদ্ধা শ্রোতা আমি আগে দেখিনি’ তাহলে কিন্তু কাজ হবে না, কারণ বুদ্ধিমান শ্রোতারা এমন তোষামোদে খুশি হন না।
বিখ্যাত বক্তা চন্সি এম. ডিপিউ বলেন ‘শ্রোতাদের সম্পর্কে এমন কিছু বলুন যা আপনি জানেন তাঁরা ভাবতেই পারবেন না।’
এসব ক্ষেত্রে এমন কিছু জানানো ঠিক হবে না যাতে আপনি ভুল করছেন মনে হবে। সেটা করলে শ্রোতাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়াই ঘটবে। এক্ষেত্রে এটা এড়িয়ে চলাই ভালো।
৩. শ্রোতাদের একজন হয়ে উঠুন
শ্রোতাদের সামনে কোন কথা উচ্চারণ করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এমন কথা উচ্চারণ করুন যেন তাদের সঙ্গে আপনার একটা সম্পর্ক রয়েছে। আপনাকে বক্তৃতা দিতে আমন্ত্রণ জানিয়ে যদি সম্মানিত করা হয়ে থাকে সে কথা বলুন। হ্যারল্ড ম্যাকমিলান যখন ইন্ডিয়ানায় ডি পাও বিশ্বাবিদ্যালয়ে স্নাতক ক্লাসে বক্তৃতা দিয়েছিলেন তখন এই ভাবেই শুরু করেছিলেন।
‘আপনাদের সাদর অভ্যর্থনায় আমি অভিভূত’, তিনি আরম্ভ করেছিলেন। কারণ গ্রেট বৃটেনের কোন প্রধান মন্ত্রীকে এইভাবে আপনাদের বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রণ জানানো অত্যন্ত সম্মানের ব্যাপার। তবে আমার মনে হয় প্রধানমন্ত্রী পদই এই আমন্ত্রণের একমাত্র কারণ অবশ্যই নয়।
এরপর তিনি জানালেন তার মা একজন আমেরিকান মহিলা, জন্মেছেন ইণ্ডিয়ানাতেই আর তাঁর বাবা এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই প্রথম আমলের স্নাতক।
তিনি আরও বলেন, আমি আপনাদের কথা দিতে পারি ডি পাও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িত হয়ে আমি গর্বিত এবং আমার গর্ব হচ্ছে এর সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক আছে বলে এবং তাকে আবার নতুন করে ভাবতে উদ্দীপনা পাচ্ছি।’
