আপনি যখন জনসংযোগ করেন তখন আপনাকে আপনার বক্তব্যের মধ্যে আনুপাতিক হারে উত্তেজনা আর আবেগের মিশেল দিতে হবে। আপনার সৎ আবেগকে গলা টিপে ধরবেন না। বরং আপনার শ্রোতাদের সামনে প্রমাণ রাখুন কতখানি আগ্রহ আপনার বক্তব্য সম্পর্কে রয়েছে।
৩. আন্তরিকতা প্রকাশ করুন
আপনি যখন পায়ে পায়ে শ্রোতাদের সামনে কথা বলার জন্য এগিয়ে যান তখন কোন কিছু ঘটবে এ আশা করে এগোতে চাইবেন না। কখনই এমন ভাব দেখাবেন না যেন ফাঁসি কাঠের দিকে এগোচ্ছেন। আপনার চলার ছন্দে হয়তো কৃত্রিমতা থাকতে পারে। তবুও তা চমক সৃষ্টি করতে পারে। এতে শ্রোতাদের ধারণা জন্মাবে কোন বিষয় শোনাবার নিদারুণ আগ্রহ আপনারও রয়েছে। এরপর শুরু করার ঠিক আগে বেশ গভীর একটা শ্বাস টানুন। কোন রকম আসবাব বা চেয়ার এড়িয়ে চলুন। মাথা উঁচু আর চিবুক তুলে এগোন। আপনি একটু পরেই আপনার শ্রোতাদের প্রয়োজনীয় কিছু শোনাতে চলেছেন–তাই তাদের আপনার বক্তব্য প্রাঞ্জলভাবে শোনাবেন। এখন আপনিই রাজা। এই রকমই বলেছিলেন একদিন উইলিয়াম জেমস।
এই ভঙ্গীকে বলা যেতে পারে শরীর গরম করা। এটা যে কোন অবস্থাতেই করা চলে। ডোনাল্ড এবং এলিনর লেয়ার্ড তাদের টেকনিকস ফর এফিসিয়েন্ট রিমেমবারিং’-এ বলেছেন, প্রেসিডেন্ট থিয়োডোর রুজভেন্ট এ ধরনের কাজের মধ্য দিয়ে হয়ে উঠেছিলেন আগ্রহ আর ঐকান্তিকতার মূর্ত প্রতীক। উইলিয়াম জেমসের দর্শন অনুযায়ী টেডি রুজভেল্টকেই শ্রেষ্ঠ বলা যায়। আর তা হল : ‘আন্তরিক হোন আর তাহলেই আপনি যা করবেন তাতেই আন্তরিকতা অর্জন করতে পারবেন।’
০৫. শ্রোতাদের সঙ্গে বক্তব্য আদান প্রদান করুন
রাসেল কনওয়েলের বিখ্যাত বক্তৃতা ‘একরেস অব ডায়মন্ডস্’ প্রায় হাজার বার দেওয়া হয়। আপনি হয়তো ভাবছেন এতবার দেওয়ার ফলে বক্তৃতার প্রতিশব্দ প্রতিটা কথাই বক্তার মনে গাঁথা হয়ে গিয়েছিল। ব্যাপারটা অবশ্য তা হয়নি। ড. কনওয়েল জানতেন শ্রোতারা সাধারণত নানা ধরনের হয়। তাই ডঃ কনওয়েল সিদ্ধান্তে আসেন শ্রোতাদের বোঝাতে হবে এ বক্তৃতা কেবল তাদের জন্যই করা হচ্ছে। তাহলে তিনি কিভাবে পরের বার বক্তা, বক্তৃতা আর শ্রোতাদের মধ্যে পারস্পরির সম্পর্ক বজায় রাখেন? ডঃ কনওয়েল এ সম্বন্ধে লিখেছেন : ‘কোন শহরে যখন কথা বলার আমন্ত্রণ পাই, সেখানে বেশ আগেই হাজির হই। তারপর প্রথমে যাই সেখানকার পোষ্টামাষ্টার, ক্ষৌরকার, হোটেল ম্যানেজার, স্কুলের প্রধান শিক্ষক, কোন মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে। এরপর যাই কোন দোকানে আর লোকজনের সঙ্গে কথাও বলি। আমি জানতে চেষ্টা করি ওখানকার ইতিহাস, কি কি সুযোগ তাদের শহরে আছে, এই সব। তারপর ওখানকার শ্রোতাদের সামনে তাদের পছন্দসই স্থানীয় বিষয়ে বক্তৃতা দিই।’
ডঃ কনওয়েল ভালই জানতেন সফল আদান-প্রদান নির্ভর করে বক্তা কিভাবে শ্রোতাদের কাছে বক্তব্য পৌঁছে দিলে তারাও তাতে অংশ গ্রহণ করবে। আর এই কারণেই আমাদের কাছে একরেস অব ডায়মণ্ডের’ আসল কোন কপি নেই। ব্যাপারটা অবশ্যই বুঝতে পারছেন। মানব চরিত্র সম্পর্কে অত্যন্ত অভিজ্ঞ হওয়ায় ডঃ কনওয়েল কখনই এক বক্তৃতা দুবার দেননি–অথচ তিনি একই বিষয় নিয়ে অন্তত ছ’ হাজার বার আলাদা শ্রোতাদের সামনে বক্তৃতা দেন। বিশেষ ধরনের শ্রোতাদের কথা মনে রেখে আপনার বক্তব্য তৈরী করে শোনাতে এই অভিজ্ঞতাকে আপনিও কাজে লাগাতে পারেন। নিচে আপনার সঙ্গে একাত্মতা গড়ে তোরার কতকগুলো সহজ নিয়ম উল্লেখ করছি।
১. শ্রোতাদের পছন্দ বিষয়ে বক্তব্য রাখুন
ডঃ কনওয়েলও ঠিক তাই করতেন। তিনি তার বক্তব্যে মিশিয়ে দিতেন স্থানীয় বহু আগ্রহের বিষয়। তাঁর শ্রোতারা খুব আগ্রহ বোধ করতেন কারণ তাঁর বক্তৃতা শ্রোতাদের পছন্দসই বিষয়ে ভরপুর থাকতো। শ্রোতাদের সঙ্গে বক্তার এই যে একাত্মতা এটাই বক্তার জনপ্রিয়তা আনতে পারে। আমেরিকার চেম্বার অব কমার্সের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আর পরবর্তীকালে মোশন পিকচার অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট এরিক জনস্টন যত বক্তৃতা দেন তার সব কটিতেই এই কৌশল প্রয়োগ করেন। ওকলাহোমা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেওয়ার সময় তিনি কিভাবে স্থানীয় জনগণের আগ্রহের বিষয় কাজে লাগিয়েছিলেন দেখুন:
……ওকলাহোমা একদিন হতাশার অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছিল, তাকে প্রায় বাতিলের পর্যায়েই ফেলতে চাওয়া হয়েছিল।
১৯৩০ সালে অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়ায় যে উড়ন্ত দাঁড়কাকের দলও ওকলাহোমাকে পাশ কাটিয়ে যেতে চায়। ওকলাহোমাকে আমেরিকার দিগন্ত প্রসারী মরুভূমির অংশ বলেই প্রচার হতে থাকে…। সবাই বলতে থাকে এখানে আর কোনদিনই সবুজের ছোঁয়া লাগবে না।
কিন্তু ১৯৪০ সালে ওকলাহোমাই হয়ে ওঠে এক সুন্দর বাগান–আবার ক্ষেতের বুকে বাতাসে দোলে গমের শিষ, বাতাস বয়ে আনে আগামী বর্ষণের ইশারা।
…এখানে খুঁজে পেয়েছি আশার আলো। ওকলাহোমার ভবিষ্যৎ। এখানে শুধুই ভবিষ্যৎ আশাভরা জীবনের প্রতিশ্রুতি।
শ্রোতাদের মনের মত বক্তৃতার এমন চমৎকার নিদর্শন আর নেই। এরিক জনস্টন শ্রোতাদের জীবনের অতীত ঘটনাবলি থেকেই তার বক্তৃতার রসদ জোগাড় করেছিলেন। তিনি শ্রোতাদের বুঝতে দিয়েছিলেন তার বক্তৃতা কোন প্রতিবেদন মাত্র নয়-এটা তাদের জন্যই সৃষ্টি করা। কোন শ্রোতার দল, যে বক্তা তাদের আগ্রহের বিষয়ে বলেন, তার কথা না শুনে পারেন না।
