এক পক্ষকাল পর এমন একটা ব্যাপার ঘটলো যে মি. ফ্লিন একদম হৃদয়ে নাড়া খেলেন। তাঁর নতুন গাড়িখানা রাস্তায় দাঁড় করানো ছিল। অন্য একখানা গাড়ি তার গাড়িকে ধাক্কা মেরে ভাঙচুর করে পালিয়ে যায়। এর ফলে মি. ফ্লিনের পক্ষে কোনভাবেই বীমার টাকা আদায় করার উপায় ছিল না। এ বিষয়ে বলতে মি. ফ্লিন প্রায় ভিসুভিয়াসের মত টগবগ করছিলেন। যে ক্লাসের শ্রোতারা তার আগের কথায় কান দেয়নি তারাই আজ তাঁর কথায় দারুণ আগ্রহ দেখাল। তারা হাততালি দিয়ে সম্বর্ধনা জানাতে লাগলেন।
এই কারণেই আমি বারবার বলতে চেয়েছি সঠিক বিষয় বেছে নিয়ে বক্তব্য রাখতে পারলে আপনি কখনই ব্যর্থ হবেন না। বক্তব্যের একটা অংশ আপনাকে জয় এনে দেবেই। তাহল যে বিষয়ে আপনার ঐকান্তিকতা আছে সেটাই বলা। এই বিষয় খুঁজে পেতে আপনাকে অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াতে হবে না–এটা ভাসমান অবস্থায় আপনার চেতনার উপরে নির্ভর করে। এর কারণও পরিষ্কার–আপনি প্রায়ই এ বিষয়ে ভাবনা চিন্তা করেন।
খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, প্রাণদণ্ড সম্পর্কে একটা পরিষদীয় বিল নিয়ে টেলিভিশনে মতামত বিনিময় করা হয়। বহু সাক্ষীকে তাদের মতামত জানানোর জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়-পক্ষে বা বিপক্ষে মতামত দিতে। এদের একজন ছিলেন লস এঞ্জেলেসের পুলিশ দপ্তরের কর্মী। যিনি বিষয়টা নিয়ে প্রচুর চিন্তা ভাবনা করেছিলেন। প্রাণদণ্ডের প্রতি তার প্রচণ্ড দাবী ছিল কারণ তাঁর এগারো জন সহকর্মী অপরাধীদের সঙ্গে বন্দুকের লড়াইতে মারা যায়। তিনি এমনভাবে কথা বলতে লাগলেন যাতে বোঝা গেল এ ব্যাপারে তাঁর ঐকান্তিকতা কতটা। ইতিহাসে যে কোন আবেদনই এই ঐকান্তিকতায় নির্ভর করে এগিয়েছে। যে কোন সৎ প্রচেষ্টা বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল আর বিশ্বাসের অধিষ্ঠান মানুষের হৃদয়ে। হৃদয়ের যুক্তি আছে যে যুক্তি তা জানে না।’ কথাটা পাসকালের, আর এটা আমার ক্লাসে যাচাই করে দেখেছি। আমার বোস্টনের জনৈক আইনজ্ঞের কথা মনে পড়ছে যিনি বেশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বক্তৃতা করতেন। তাঁর চেহারাও ছিল চমৎকার অথচ তিনি বক্তৃতা শেষ করবার পর শ্রোতারা বলে উঠলেন : বেশ চালাক মানুষ। এর কারণ হল তিনি যে ছাপ রাখতেন তা ওপর ওপর ভেসে থাকত। তার বক্তৃতায় কোন হৃদয়ের অনুভুতি মেশানো থাকত না–শুধু চটকদার কিছু কথার ফুলঝুরি। ওই একই ক্লাসে আবার ছিলেন একজন বীমার বিক্রয় প্রতিনিধি। ছোট খাটো চেহারা, খুব দাগ কাটে না মনে। অথচ তিনি যখন কথা বলেন শ্রোতারা তাঁর প্রতিটি কথাই মন দিয়ে শুনতে চায়।
ওয়াশিংটনের এক নাট্যশালায় আব্রাহাম লিঙ্কনের হত্যাকাণ্ডের পর প্রায় এক বছর কেটে গেছে অথচ তার জীবনে নীতিবোধ আর তাঁর কথা আজও আমাদের কাছে উজ্জ্বল হয়ে আছে। আইন সম্পর্কে তাঁর চেয়েও অভিজ্ঞ মানুষ হয়তো ছিলেন তা সত্ত্বেও যে একনিষ্ঠতা আর সততা নিয়ে তিনি গেটিসবার্গে বক্তৃতা দিয়েছিলেন ইতিহাসে আজ পর্যন্ত তা কেউ অতিক্রম করতে পারেন নি।
একবার, আপনারা যেমন বলেন সেইভাবে একজন বলেছিলেন, তাঁর কোন বিষয়েই তেমন আগ্রহ জাগে না। আমি তাকে বলেছিলাম যে-কোনো একটা বিষয়ে আগ্রহী হতে! যেমন, একটা উদাহরণ দিন তো? ভদ্রলোক একটু অবাক হয়েই প্রশ্ন করেছিলেন। আমি উত্তর দিই, ধরুন পায়রা?’ ভদ্রলোক আরও অবাক। হ্যাঁ, পায়রা’, আমি উত্তর দিয়েছিলাম। বাইরে গিয়ে পায়রার ঝাঁক কোথাও পেলে তাদের খাওয়ান। লাইব্রেরীতে তাদের সম্বন্ধে বই পড়ে নিন তারপর এখানে এসে সে কথা শোনান। লোকটি তাই করেছিল। সে এসে যখন পায়রা নিয়ে কথা আরম্ভ করল তাকে বাধা দেওয়াই কঠিন হয়ে উঠল। অদ্ভুত দক্ষতায় আর আবেগে সে যে বক্তব্য রাখল এমন চমৎকার বক্তৃতা আর শুনিনি।
আর একটা পরামর্শ রাখছি : যতটা পারেন আপনার জানা আর প্রিয় বিষয়ে শিখুন এবং এটা করলেই দেখতে পাবেন আপনি কতখানি আবেগ আর সজীবতা লাভ করেছেন। বিক্রয়ের পাঁচটি বিখ্যাত নিয়ম বইয়ের লেখক পার্সি এইচ হুইটিঙ বিক্রয় প্রতিনিধিদের তার ওই বইয়ে পরামর্শ দিয়েছেন তাদের পণ্য সম্পর্কে জানার কাজে কখনই অবহেলা না করতে। মিঃ হুইটিঙ বলেছেন, কোন ভাল পণ্য সম্পর্কে যত জানবেন, ততই আপনি আগ্রহী হবেন। অন্যান্য সব বিষয় সম্পর্কেও একই কথা-সেগুলো সম্বন্ধে আপনি যতই জানবেন ততই আপনার উৎসাহ বাড়বে।
২. নিজের বক্তব্যের অনুভূতিকে জীবন্ত করে তুলুন
ধরুন আপনি শ্রোতাদের সামনে শোনাচ্ছেন, নির্ধারিত গতিবেগের এক মাইল বেশি গতিতে চালানোর ফলে একজন পুলিশ আপনাকে থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। ঘটনাটা আপনি বেশ শীতলভাবেই তৃতীয় ব্যক্তিকে শোনাতে পারেন। কিন্তু ব্যাপারটা আপনার জীবনেই ঘটেছে আর সে সময় আপনার কিছু অনুভূতিও জন্মায়। তৃতীয় ব্যক্তিকে বর্ণনা শ্রোতাদের তেমন মনোরঞ্জন করতে পারে না। অতএব ঘটনাটা যে ভাবে আপনার জীবনে ঘটেছে ঠিক সেই ভাবে বর্ণনা করলে, তাকে জীবন্ত করে তুললে তা ঢের বেশি হৃদয়গ্রাহী হবে।
আমরা যে নাটক বা সিনেমা দেখতে যাই তার কারণ হল আমরা আবেগের প্রকাশ দেখতে আগ্রহ বোধ করি। আমরা নিজেদের আবেগ সকলের সামনে প্রকাশ করে এতই ভয় পাই যে নাটক বা ছবি দেখে আমাদের সেই আকাঙক্ষা দমন করি।
