সজীবতা, প্রাণশক্তি, আগ্রহ-এই তিনটিকেই চিরকাল আমি একজন বক্তার একান্ত প্রয়োজনীয় গুণ বলেই ভেবেছি। প্রাণশক্তিতে ভরপুর বক্তার কাছেই ভিড় করে শ্রোতারা।
কিন্তু প্রাণশক্তিময় বক্তৃতা করার ক্ষমতা কিভাবে গড়ে তোলা সম্ভব? এই পরিচ্ছেদে আপনাদের বক্তৃতাকে কীভাবে এই রকম আগ্রহী আর উত্তেজনাময় সজীবতায় জুড়ে দিতে পারবেন সে কথাই বলব।
১. যাতে ঐকান্তিক আগ্রহ আছে তেমন বিষয়ই ঠিক করে নিন
তৃতীয় পরিচ্ছেদে বলা হয়েছে আপনার বক্তব্য বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া কতখানি দরকারী। আপনি যদি আপনার বক্তব্য সম্বন্ধে আবেগে জড়িত না হন তাহলে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারবেন না শ্রোতারা তাতে আদৌ আগ্রহী হবে। এটা অতি স্বাভাবিক ব্যাপার যে, যে বিষয়ে আপনার খুবই ঐকান্তিকতা আছে তেমন কোন বিষয় বেছে নিলে। যেমন আপনার অবসর বিনোদনের উপায় বা শখ ইত্যাদি যাতে আপনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাহলে দেখবেন শ্রোতাদের আগ্রহ জাগাতে আপনার কণামাত্র অসুবিধা হচ্ছে না।
ঐকান্তিকতা যে একজন বক্তার কতখানি শক্তি, সেটার প্রমাণ পেয়েছিলাম নিউ ইয়র্কে আমার এক ক্লাসে। আমি ব্যাপারটা নাম দিয়েছি ‘সবুজ ঘাস বনাম কাঠের ছাই’ এর মামলা।
শহরের এক নামজাদা প্রতিষ্ঠানের একজন বিখ্যাত সেলসম্যান বা বিক্রয় প্রতিনিধি যাচ্ছেতাই একটা বক্তব্য পেশ করেন যে, শিকড় বীজ ছাড়াই তিনি সবুজ ঘাস সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি জানালেন শুকনো ছাই গাদার মধ্যে তিনি ঘাস ফুটিয়েছেন। তার বক্তব্য হল ছাই থেকেই ওই ঘাস জন্মেছিল।
ভদ্রলোকের কথা শোনার পর আমি বেশ নম্রভাবেই তাকে বললাম, তিনি যে আবিষ্কার করেছেন তাতে তিনি লক্ষপতি হয়ে যাবেন। তাকে আরও বললাম তার আবিষ্কার তাঁকে বিশ্বের একজন নামী বিজ্ঞানীর সম্মানও এনে দেবে। তাঁকে এও বললাম আজ অবধি কোন মানুষ ছাইগাদা থেকে ঘাস জন্মাতে পারে ভাবেনি কারণ সবাই জানে জড় পদার্থ থেকে জীবন সৃষ্টি হতে পারে না।
আমি ভেবেছিলাম ভদ্রলোকের ভুলটা এতই অসম্ভব যে তিনি অবশ্যই তা বিশ্বাস করবেন। আমার কথা শেষ হতেই শ্রোতাদেরও দেখলাম ভদ্রলোকের কথার অসারতা উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। কিন্তু লোকটি নিজের ভুল আদৌ উপলব্ধি করতে পারলেন না তিনি আমার কথায় তড়াক করে লাফিয়ে উঠলেন আর তীব্র প্রতিবাদ করলেন। তিনি বেশ জোরের সঙ্গেই বললেন, তিনি যা বলছেন তা ভেবেচিন্তেই বলছেন। তিনি আবার তার আগের কথার জের টেনে জানালেন, ছাইগাদা থেকে ঘাস জন্মাতে দেখেছেন। কথাটা এবার বেশ ঐকান্তিকতা আর জোর মিশিয়েই বললেন তিনি।
আমি আবার তার কথায় আপত্তি জানালাম। এও তাকে বললাম, আসল সত্যের হাজার মাইলের মধ্যেও তিনি আসেন নি। তিনি এবার লাফিয়ে উঠে বললেন, তিনি পাঁচ ডলার বাজি রাখতে রাজি আছেন। ব্যাপারটা আমেরিকার কৃষি দপ্তরে লেখা যেতে পারে মতামতের জন্য।
এবার কি ঘটল জানেন? শ্রোতাদের মধ্যে বেশ অনেকেই তাঁর লক্ষ সমর্থন করতে লাগল। আবার অনেকেই তার বিরুদ্ধে গেল। যদি তখন ভোট নিতাম তাহলে দেখতাম অর্ধেকেরও বেশিই তাঁর দিকে চলে গেছে। আমি তাদের কাছে জানতে চাইলাম তাদের মত বদলাবার কারণ কি? একের পর এক শ্ৰোতা জানাল বক্তার ঐকান্তিকতা আর বিশ্বাসই তাঁদের মতো পরিবর্তনে বাধ্য করেছে আর সেইজন্য তাদের সাধারণ বুদ্ধি কাজ করেনি।
যাই হোক ওই রকম একটা অবস্থায় পড়ে বিষয়টা নিয়ে আমি কৃষি দপ্তরে চিঠি লিখলাম। তাদের লিখলাম ব্যাপারটা এতই বোকার মত যে আমি লজ্জিত। তার জবাবে তারা জানাল ব্যাপারটা অবাস্তব ও অসম্ভবছাইগাদা থেকে ঘাস কখনই জন্মায় না। তারা আরও জানাল আর একটা চিঠিও তারা এ বিষয়ে পেয়েছেন। সেই বিক্রয়-প্রতিনিধি নিজের মতে এতই অবিচল ছিলেন যে তিনিই চিঠি লেখেন।
ওই ঘটনাটা আমাকে যে শিক্ষা দেয় জীবনে সেটা ভুলতে পারিনি। কোন বক্তা যদি ঐকান্তিক হয়ে কিছু বিশ্বাস করে আর সেই আগ্রহ নিয়ে তা বলে তাহলে তার কথায় আস্থা স্থাপন করার লোকের অভাব হয় না।
আর তা ছাই থেকে ঘাস জন্মানো হলেও।
অধিকাংশ বক্তাই মাঝে মাঝে ভাবনায় পড়ে যান যে তাদের বক্তব্য বিষয় শ্রোতাদের গ্রহণযোগ্য হবে কি না। শ্রোতাদের আগ্রহী করার একটা পথই আছে : আপনার বক্তব্য সম্পর্কে ঐকান্তিক হয়ে ওঠে আর আবেগ প্রকাশ করা।
ইতালিতে আমেরিকার প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত রিচার্ড পয়াসবার্ন চাইল্ডকে একবার প্রশ্ন করা হয় লেখক হিসাবে তার সফলতার কারণ কি? তিনি জবাব দেন : ‘জীবন সম্পর্কে আমার এমনই উত্তেজনা জাগে যে স্থির থাকতে পারি না। মানুষকে সে কথা আমায় জানাতেই হয়।‘ কোন বক্তা বা লেখকের ব্যাপারও তাই-শ্রোতা বা পাঠক উদ্বেল না যে পারে না।
একজনের কথা এবার বলছি। ওয়াশিংটনে আমাদের পাঠক্রমে ক্লাসে মিঃ ফ্লিন নামে একজন আসেন। এক সন্ধ্যায় তিনি ক্লাসে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী শহর সম্পর্কে বলছিলেন। তিনি আসলে যা শোনাচ্ছিলেন তা স্থানীয় কোন সংবাদপত্রে প্রকাশিত বর্ণনা থেকে ধার করা মাত্র। তাই তাঁর বক্তৃতা নেহাতই নীরস লাগছিল শ্রোতাদের। যদিও তিনি চিরকাল ওয়াশিংটনে থেকে এসেছেন তা সত্বেও একবারও বললেন না শহরটি তাঁর ভালো লাগার কারণ কী? তিনি নিছক, নীরস কতকগুলো বর্ণনা দিয়ে গেলেন।
