বাইবেল আর শেকসপীয়ারের রচনাই পাতায় পাতায় ছবির মত এই কথা সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। একটা উদাহরণ দিচ্ছি : যে কোন সাধারণ লেখক বলবেন বিশেষ কোন জিনিস ‘অপ্রয়োজনীয়’–এ যেন শ্রেষ্ঠকে আরও ভাল করার চেষ্টা। শেকস্পিয়ার কীভাবে লিখেছেন? একটা আলেখ্য তিনি তৈরী করে অমরত্ব লাভ করেছেন : মসৃণ স্বর্ণকে মসৃণতা দেয়া, পদ্মফুলকে সুন্দর করা আর রজনী গন্ধার সুগন্ধি ঢালা …।’
কোনদিন কি ভেবে দেখেছেন যুগ যুগান্ত পার হয়ে যে সব প্রবাদ চালু রয়েছে তার সবই জীবন্ত ছবির মত? ‘নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো’, ‘অনিচ্ছুক ঘোড়াকে জল পান করালে খায় না ইত্যাদি।
আব্রাহাম লিঙ্কন অধিকাংশ সময়েই এই ধরনের সচিত্র কথপোকথনের অবতারণা করতেন। যখনই তিনি কোন দীর্ঘ, জটিল রিপোর্ট হোয়াইট হাউসে তাঁর ডেস্কের উপর পেতেন তখন সেগুলো সম্পর্কে তীব্র প্রতিবাদ করতেন। এগুলো কোন সময়েই আবার নীরস বাক্যবিন্যাসে নিবদ্ধ থাকত না। বরং এমন চমকার ছবির মত শব্দ ব্যবহার করতেন যা প্রায় ভোলা অসম্ভব। তিনি যেমন বলেছেন : কোন ঘোড়ার সম্পর্কে জানার সময় ঘোড়ার ল্যাজে কটা চুল আছে আমি জানতে চাই না, বরং জানতে চাই ওর গুণ কি রকম।’
আপনার দৃষ্টিতে নির্দিষ্ট আবেদন ফুটিয়ে তুলুন। মনে মনে ছবি এঁকে নিয়ে তাকে প্রকাশ করুন। এ ব্যাপারে একটা বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে–যেমন ধরুন কখনও কোন কুকুরের উল্লেখ করলে তাকে বোঝানোর জন্য আরও ব্যাখ্যার দরকার। যেমন যদি বলা যায় পানিয়েল’ ‘স্কটিশ টেরিয়ার’ বা ‘ফেট কর্নার্ড’ তাহলে নির্দিষ্ট জাতের কুকুরের একটা ছবিই শ্রোতারা চোখে ফুটে ওঠে। আরও পরিষ্কার আর
পরিস্ফুট করা যায় যদি কোন ‘ঘোড়ার’ উল্লেখ করার বদলে বলা যায় কালো টাটু ঘোড়া।
উইলিয়াম ট্রাঙ্ক, ছোট, তার ‘এলিমেন্টস অব স্টাইল’ প্রবন্ধে বলেছেন : যারা লেখার কৌশল সম্পর্কে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন তারা অন্ততঃ একটা বিষয়ে একমত হন। সেটা এই : পাঠকের নজর কেড়ে নেওয়ার নিশ্চিত পথ হল নির্দিষ্ট সঠিক আর উপযুক্ত হতে হবে। হোমার, দান্তে, শেকস্পীয়ারের মত মহান লেখকরা অমরত্ব লাভ করেন বিশেষ করে তাঁদের রচনায় নির্দিষ্ট এবং সঠিক বর্ণনা করেছেন বলেই। তাঁদের প্রতিটি বাক্যই ছবির মত দৃশ্যমান। লেখার বেলায় এটা নিছক সত্যি।
বেশ ক’বছর আগে কার্যকর বক্তৃতা সম্পর্কে একটা পাঠক্রমে পরীক্ষার ব্যবস্থা করি, আমরা ঠিক করে দিই প্রত্যেক বক্তাকে হয় কোন ঘটনা বা ব্যক্তি বা তারিখ সম্বন্ধে উল্লেখ করতে হবে। এর ফল হয়েছিল একেবারে বৈপ্লবিক। ক্লাসের ছাত্রদের মধ্যে ছোঁয়াচে রোগের মত ছড়িয়ে পড়েছিল।
ফরাসী দার্শনিক আঁলে বলেছেন, কোন বিমূর্ত ভাব সব সময়েই খারাপ। আপনার বাক্যকে সর্বদাই মানুষ, আসবাবপত্র, প্রাণীতে পূর্ণ রাখা চাই।
প্রাত্যহিক কথাবার্তাতেও এটা সত্য? আসলে এ বইয়ে যা এখন পর্যন্ত বলেছি তার প্রত্যেকটি অংশই প্রাত্যহিক কথপোকথনের ক্ষেত্রে দরকার। বর্ণনা থাকলেই বক্তব্য প্রস্ফুটিত হয়। যে কোন লোকই হোক, সে যদি কার্যকর বক্তা হতে চায় তাকে এ বইয়ের পরামর্শ মেনে চলতে হবে; তারপর সুযোগ মত তা কাজেও লাগাতে হবে। যারা দায়িত্বপূর্ণ পদে আছেন, গৃহকর্ত্রীর আর শিক্ষকরা দেখতে পাবেন শিক্ষাদান করার সময় এই পদ্ধতি কাজে লাগালে কতটা ফলপ্রসূ হওয়া যায়।
অতএব সঞ্চয়ী জ্ঞান লাভ করতে আপনাকে যত বেশি সম্ভব জ্ঞানও অর্জন করতে হবে আর তাকে কাজেও লাগাতে হবে।
.
০৫. বক্তব্য প্রাণবন্ত করে তোলা
প্রথম মহাযুদ্ধের ঠিক পরে আমি লন্ডনে থেকে লাওয়েল টমাসের সঙ্গে কাজ করছিলাম। লাওয়েল টমাস, ‘অ্যালেনবী’ আর ‘লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’ সম্বন্ধে চমৎকার কিছু বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। সভায় সে সময় তিল ধারণের জায়গা থাকত না। এক রবিবার আমি হাইড পার্কে মার্বেল আর্চের কাছে হাজির হলাম। সেখানে নানা মতবাদের মানুষ নানা বিষয়ে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। বর্ণ, রাজনীতি ইত্যাদি নানা বিষয়ে নানা জাতের বক্তার সেখানে আইনরক্ষকদের বাধা ছাড়াই বক্তৃতা দানের ব্যবস্থা ছিল। এক মুহূর্তে আমি শুনলাম একজন ক্যাথলিক বোঝাচ্ছেন পোপই সর্বশ্রেষ্ঠ। তার কখনও ভুল হয় না। সেখান থেকে সরে গেলাম আর এক মঞ্চে-সেখানে একজন সমাজতন্ত্র আর কার্ল মার্কসের তত্ত্ব ব্যাখ্যায় ব্যস্ত। এবার তৃতীয় এক বক্তার সামনে শ্রোতাদের মধ্যে দাঁড়ালাম। সেখানে বক্তা বোঝাচ্ছেন চারটি স্ত্রী রাখার যৌক্তিকতা কি। এরপর সরে এসে তিনটি দলের দিকেই তাকালাম।
ব্যাপারটা কি বিশ্বাস করবেন? যে লোকটি চারটি স্ত্রী রাখার সুবিধার কথা বলছিল তার শ্রোতার সংখ্যা সবচেয়ে কম মাত্র কয়েক জনই। অথচ বাকি দুজন বক্তার শ্রোতার সংখ্যা প্রচুর, আর ক্রমশঃ বাড়ছিল। নিজেকে প্রশ্ন করতে চাইলাম এর কারণ কি? বিষয় বস্তু আলাদা হওয়ার জন্য? তা কিন্তু মনে হোলনা.। এরপর বক্তাদের ভাল করে লক্ষ্য করেই এর ব্যাখ্যা মিলে গেল। তাদের মধ্যেই এর উত্তর ছিল। যে লোকটি চারটি স্ত্রী রাখার কথা বলছিল সে নিজেই বোধহয় চার স্ত্রী রাখতে আগ্রহী নয় বলেই বোঝা যাচ্ছিল। কিন্তু বাকি দুজন বক্তা সম্পূর্ণ বিপরীত বিষয়ে একান্তভাবেই ব্যস্ত ছিলেন। তাঁরা সজীব আর জীবন্ত ভঙ্গীতে কথা বলছিলেন। মাঝে মাঝেই তাঁদের হাত নড়ছিল। তাঁদের কণ্ঠস্বর দৃঢ় প্রত্যয়ী ছিল। তাঁদের মধ্যে থেকে যেন আগ্রহ আর সজীবতা বিচ্ছুরিত হতে চাইছিল।
