আপনার বক্তব্য যদি নাম আর ব্যক্তিগত পরিচিতিতে পূর্ণ থাকে তাহলে শ্রোতাদের সাগ্রহে শোনার আকাঙক্ষায় সন্দেহ থাকবে না। এটা হয়ে উঠবে আপনার এক অমূল্য বক্তব্য।
আপনার বক্তব্য নির্দিষ্ট আর বর্ণনায় পূর্ণ রাখুন
আপনি এবার হয়তো বলবেন, কথাগুলো ভালই, তবে কিভাবে নিশ্চিত হব আমার বক্তব্য বর্ণনায় পূর্ণ করতে পারব? এ বিষয়ে একটা পরীক্ষা করা যায়। প্রত্যেক রিপোর্টার যেভাবে পাঁচটা প্রশ্ন করে থাকে সেই ভাবেই আপনি এগোতে পারেন। সেই পাঁচটা প্রশ্ন হল এই :
১। কখন? ২। কোথায়? ৩। কি? ৪। কে? ৫। কেন?
এই প্রক্রিয়া যদি অনুসরণ করেন তাহলে আপনার উদাহরণগুলো সজীব হয়ে উঠবে। এ ব্যাপারে আমার নিজের একটা কাহিনী শোনাচ্ছি। এটা রিডার্স ডাইজেস্টে ছাপা হয় :
কলেজ ছাড়বার পর আমি দুবছর আরমাউর অ্যাণ্ড কোম্পানির হয়ে দক্ষিণ ডাকোটায় বিক্রয় প্রতিনিধি হয়ে ভ্রমণ করি। আমি আমার এলাকায় ঘোরার সময় মাল গাড়িতে ভ্রমণ করেছিলাম। একদিন রেডফিল্ডে দক্ষিণের ট্রেন ধরার জন্য পড়ে থাকতে হয়। রেডফিল্ড আমার বিক্রয় এলাকা ছিল না তাই এজন্য কোন সময় রাখিনি। এক বছরের মধ্যে আমি আমেরিকান নাটক অ্যাকাডেমীতে পড়তে যাব। তাই ঠিক করলাম ট্রেন না আসা পর্যন্ত প্ল্যাটফর্মে পায়চারি করতে করতে ম্যাকবেথের নাটক থেকে মহড়া দিতে শুরু করবো। হাত বাড়িয়ে নাটকীয় ভাবে আমি শুরু করলাম : ‘আমার সামনে যা দেখতে পাচ্ছি তা কি একটা ছোরা? এস, তোমাকে ধরতে দাও : তোমাকে স্পর্শ করিনি, তবুও তোমাকে নিরীক্ষণ করছি।’
আমি আপন মনে তখনও মহড়া দিয়ে চলেছিলাম, আর তখনই চারজন পুলিশ আমাকে ঘিরে ধরল। তারা জানতে চাইল আমি মেয়েদের ভয় দেখাচ্ছি কেন? কথাটা শুনে আমি একেবারে স্তম্ভিত, ওরা যদি বলত আমি ট্রেনে ডাকাতি করছি তাহলেও অতটা আশ্চর্য হতাম না। তারা আমায় জানাল একশ গজ দূর থেকে একজন গৃহকর্ত্রী আমাকে লক্ষ্য করে পুলিশে খবর দেন। এরকম কাণ্ড তিনি আগে কখনও দেখেন নি। আমি ছোরার কথা বলছিলাম বলে এই ব্যাপার হল।
‘আমি পুলিশদের জানালাম আমি শেক্সপীয়ারের কবিতা আবৃত্তি করছি। আমাকে আমার কোম্পানীর কার্ড দেখাতে হল। তবেই ছাড়া পেলাম।’
এবার দেখুন, ওই পাঁচটি প্রশ্ন কেমন কাজ করছে। অবশ্য অতিরিক্ত বর্ণনা আবার খারাপ : আমরা সকলেই বেশি বাড়াবাড়ি রং ঢং পছন্দ করি না।
কথপোকথন সহ আপনার বক্তব্য নাটকীয় করুন
ধরুন, আপনি কিভাবে একজন ক্রুদ্ধ ক্রেতাকে ঠাণ্ডা করার জন্য মানবিক সম্পর্কের কোন দিক কিভাবে কাজে লাগিয়েছেন তা বর্ণনা করতে চান। তাহলে এইভাবে শুরু করতে পারেন।
‘একদিন আমার অফিসে একজন এসেছিলেন। তিনি প্রায় ক্ষিপ্ত, কারণ গত সপ্তাহে আমরা তাকে যে যন্ত্রটা পাঠাই সেটা কাজ করছিল না। আমি তাঁকে জানালাম এ সম্পর্কে যা করণীয় সবাই আমরা করব। কিছুক্ষণ পরে ভদ্রলোক খানিকটা ঠাণ্ডা হলেন কারণ তিনি বুঝেছিলেন আমরা সত্যিই সাহায্য করতে ইচ্ছুক।’ এই সত্য কাহিনীর একটা গুণ আছে। এটা বেশ নির্দিষ্ট, তবে এতে কোন নাম, বর্ণনা আর সবার উপর কোন নির্দিষ্ট কথপোকথন নেই যেটা থাকলে এটি সজীব হতে পারত। সে রকম হলে কি দাঁড়াত এবার দেখা যাক :
‘গত সপ্তাহে আমার অফিস ঘরের দরজাটা হাঁ করে খুলে গেল, মুখ তুলতেই আমাদের পরিচিত ক্রেতা চার্লস্ ব্লেক্সামের ক্রুদ্ধ মূর্তি দেখতে পেলাম। তাকে বসতে বলার আগেই তিনি বলে উঠলেন, এড, এই শেষবার। এখনই একটা ট্রাক পাঠিয়ে আমার বাড়ি থেকে কাপড় কাঁচার মেশিনটা আনবার ব্যবস্থা কর।‘
‘আমি তাকে প্রশ্ন করলাম ব্যাপারটা কী? তিনি বললেন, যন্ত্রটা কাজ করছে না। সব কাপড় জামা জড়িয়ে যাচ্ছে, আমার স্ত্রী বিরক্ত হয়ে গেছে।’
‘আমি তাঁকে ব্যাপারটা ভালো করে বুঝিয়ে দিতে বললাম। তিনি চিৎকার করে বললেন; আমার সময় নেই অফিসের দেরী হয়ে যাবে। জিনিসটা এখান থেকে কেনাই উচিত হয়নি। তিনি টেবিলে এমন ঘুসি মারলেন যে আমার স্ত্রীর ছবিটা উল্টে পড়ল।
‘দেখ, চার্লি’ আমি বললাম, ‘সব কথা যদি বুঝিয়ে বল তাহলে যা বলবে তাই করব।’ এ কথায় চার্লি শান্তভাবে সব জানাতে ব্যাপারটা সমাধান হয়ে গেল।
আপনার পক্ষে হয়তো সব সময় কথার মধ্যে কথপোকথন ঢোকানো সম্ভব নাও হতে পারে। তবে উপরের লেখা থেকে এটা নিশ্চয়ই বুঝেছেন বক্তব্য কতখানি নাটকীয় হতে পারে। বক্তার যদি নকল করার ক্ষমতা থাকে তাহলে তো কথাই নেই, আরও সজীব হতে পারে বক্তব্য। এই ধরনের বক্তব্য বেশ বিশ্বাসযোগ্যও হয়ে ওঠে।
যা বলেছেন তাকে ছবিতে জীবন্ত ফুটিয়ে তুলুন
মনস্তত্ববিদরা বলেন আমাদের জ্ঞানের শতকরা পঁচাশি ভাগই আসে দর্শন থেকে। এই কারণেই মনোরঞ্জনের মাধ্যম হিসেবে দূরদর্শনের এত সাফল্য, বিজ্ঞাপন হিসেবেও তাই। জনসংযোগের ব্যাপারেও দর্শন আর শ্রবণের মূল্য অনেকখানি! আশ্চর্যের কথা প্রচুর বক্তাই এটাকে ঠিক অনুসরণ করেন না। গড় পড়তা বক্তাই দর্শনের মূল্য নিয়ে মাথা ঘামাতে চান না। এটা নেহাতই ভুল। আমি এখানে বলতে চাই বক্তব্যের মাঝখানে ছবি সৃষ্টি করার কথা। সেই বক্তার কথাই শ্রোতারা মন দিয়ে শুনে থাকেন যিনি ছবি তৈরী করে হাজির করতে পারেন।
ছবি। ছবি। ছবি। যে বাতাসে শ্বাস টানছেন এগুলো তার মতই মুক্ত। আপনার কথার মাঝখানে তাকে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুন। ছবির মাধ্যমে আপনার বক্তব্য জীবন্ত করে তুলুন।
