কাজ করার ফাঁকে সুযোগ পেলেই লিঙ্কন ছেঁড়া কাগজের টুকরোয়, খামের উপর যেখানেই পেরেছেন নানা ধরনের মন্তব্য লিখে রাখতেন। এর সবগুলো তিনি তাঁর মাথার টুপির মধ্যে ঢুকিয়ে রাখতেন আর অবসর সময়ে সেগুলো ঠিক মত দেখে সাজিয়ে ফেলতেন পরে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে। কোন খুঁটিনাটি তথ্যও তিনি অবহেলা করতেন না।
আপনার আমারও এটা করতে আপত্তি থাকা উচিত না।
৩. আপনার বক্তব্য উদাহরণ দিয়ে সজীব করে তুলুন
রুডলফ ফ্লেমা তাঁর ‘আর্ট অফ রিডেবল রাইটিং’ গ্রন্থে একটা পরিচ্ছেদ এইভাবে শুরু করেছেন : ‘একমাত্র গল্পই পাঠ করার যোগ্য। তিনি এরপর দেখিয়েছেন ‘টাইম’ আর ‘রিডার্স ডাইজেস্ট’ সাময়িক পত্র দুটি কিভাবে এই নীতিকে কাজে লাগায়। পত্রিকা দুইটির প্রায় প্রত্যেকটি প্রবন্ধই হয় নিছক বর্ণনা হিসেবে লেখা বা ছোটখাটো ঘটনায় পূর্ণ। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে কোন শ্রোতৃবৃন্দের সামনে কথা বলার সময় গল্পের কোন জুড়ি নেই। ঠিক তেমনই নেই কোন পত্রিকায় শেখার ব্যাপারে।
রেডিও আর দূরদর্শনের পর্দায় যাঁর বক্তব্য লক্ষ লক্ষ লোক শুনেছেন সেই নর্মান ভিনসেন্ট পীল বলেন যে তাঁর বক্তব্যের মধ্যে থাকতেই হবে কিছু উদাহরণ। এই উদাহরণ নিঃসন্দেহে শ্রোতাদের কাছে একান্ত আকর্ষণীয়। এটা তাদের আগ্রহ জাগিয়ে তোলে।
আমার বইয়ের পাঠকরাও বুঝতে পেরেছেন আমার বক্তব্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমি কিভাবে ছোট ছোট কাহিনীর অবতারণা করি। প্রতিপত্তি ও বন্ধু লাভ’ গ্রন্থটিতে এরকম যে সব উদাহরণ রেখেছি তাতে বইটির তিন-চতুর্থাংশই ভরে গেছে। বাকি এক চতুর্থাংশই মাত্র নিয়মের কথা।
তাহলে আমরা এইরকম বর্ণনামূলক উদাহরণ দেওয়ার কৌশল কিভাবে আয়ত্ত করবো? এটা করার পাঁচটি উপায় আছে। তা হল এই রকম: মানবিকভাব আনা, ব্যক্তিগত কারণ নির্দিষ্টকরণ, নাটকীয়তা আনা, আর দৃষ্টিগোচর করা।
আপনার বক্তব্য মানবিক করুন
আমি প্যারীতে একবার একদল আমেরিকার ব্যবসায়ীকে বলেছিলাম কী করে সফল হওয়া যায় নিয়ে বক্তব্য রাখতে। তাদের বেশিরভাগই কতকগুলো সাধারণ গুণের উল্লেখ করেন আর কঠিন পরিশ্রম, ধৈর্য এবং উচ্চাকাঙক্ষার কথা বলেন।
আমি তখন ক্লাসে কাজ বন্ধ করে এই রকম কিছু বলেছিলাম : আমাদের কোন বক্তৃতার প্রয়োজন নেই। কেউ সেটা পছন্দ করে না। মনে রাখবেন, আপনাদের মনোরঞ্জন করতে হলে যাই বলুন লোকে কান দেবে না। এ ছাড়াও মনে রাখবেন পৃথিবীর সবচেয়ে আগ্রহ সৃষ্টিকারী বিষয় হল বেশ মনোহারী কাহিনী। অতএব আপনারা আপনাদের পরিচিত দুজন মানুষের গল্প শোনান। আমাদের বলুন তাদের একজন কেন সফল হল আর অন্যজন কেন ব্যর্থ। আমরা এটা মন দিয়ে শুনে আনন্দ পাব আর এমনকি হয়তো তা থেকে লাভবানও হব।
ওই পাঠক্রমে একজন সদস্য ছিলেন যিনি কোন ভাবেই ক্লাসের কাউকে বা নিজেকেও খুশি করতে পারতেন না। আজকের রাতে অবশ্য তিনি মানবিক আগ্রহের ব্যাপারটা শুনে আমাদের তার দুজন কলেজ বন্ধুর গল্প শোনালেন। এক বন্ধু ছিল একটু রক্ষণশীল-সে শহরের নানা দোকান থেকে সার্ট কিনত আর একটা তালিকা তৈরি করে কোন দোকানের সার্ট ভাল তার হিসাব রাখত। নিজের সম্বন্ধে তার এতই উঁচু ধারণা ছিল যে ইঞ্জিনিয়ার হয়েও সে জীবনে ব্যর্থ হল। তার আশা ছিল বিরাট কোন সুযোগ তার জীবনে আসবে–অথচ সে সুযোগ আর আসেনি। সাধারণভাবেই তাকে জীবন কাটাতে হল।
বক্তা এরপর শোনালেন অন্য বন্ধুর কথা। সে ক্লাসের সকলেরই প্রিয় ছিল। সকলের সঙ্গেই সে মেলামেশা করত। সব সময় তার একটা উচ্চাকাঙক্ষা ছিল। সে সযোগ খুজত। একজন ড্রাফটসম্যান হিসেবে সে জীবন আরম্ভ করে। সেই সময় নিউইয়র্কে বিশ্ব মেলার আয়োজন করা হচ্ছিল। সে জানত ওখানে ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাপারে কাজ থাকবে। তাই সে ফিলাডেলফিয়ার চাকরি ছেড়ে নিউইয়র্ক রওনা হল। সেখানে এক বন্ধুর সঙ্গে সে কন্ট্রাকটরের কাজ নিল। টেলিফোন কোম্পানির অনেক কাজ করায় সেই কোম্পানীই মোটা মাইনেয় তাকে কাজে লাগায়।
বক্তার কাহিনী মোটামুটি ভাবেই আমি শোনালাম। সে কাহিনী শোনানোর সময় বেশ সরস কিছু উদাহরণও দেয়। তার কথা বলার সময় ছিল মাত্র দু মিনিট, অথচ কথা শেষ হলে দেখা গেল দশ মিনিট কেটে গেছে। বক্তৃতাটি এতই সুন্দর হয় যে শ্রোতারা তা খুবই উপভোগ করে।
এই ঘটনা থেকে প্রায় সকলেই উপকৃত হতে পারেন। সাধারণ যে কোন বক্তৃতাই লোকের মনে ছাপ ফেলতে পারে তার মধ্যে যদি মানবিক স্পর্শ থাকে। বক্তার দরকার কেবল কথার মধ্যে ছোট খাটো ঘটনার উল্লেখ। এ ধরনের বক্তৃতা কখনও ব্যর্থ হয় না।
অবশ্যই এটা ঠিক যে মানবিক আগ্রহ জাগতে পারে এমন সব কাহিনীর উৎস হল আপনার জীবনেরই অতীত। নিজের সম্বন্ধে বলতে আপত্তি আছে ভেবে কখনই এসব শোনাতে পিছিয়ে যাবেন না। শ্রোতারা কারও নিজের কথা তখনই শুনতে আপত্তি করে যখন তার মধ্যে থাকে অহং ভাব। এ ছাড়া শ্রোতারা সবসময়েই বক্তার জীবনের নানা ঘটনার কথা শুনতে আগ্রহী হয়। এ হল শ্রোতাকে আকর্ষণ করার নিশ্চিত পথ, এটাকে অবহেলা করবেন না।
নাম উল্লেখ করে বক্তৃতাকে ব্যক্তিগত স্পর্শ দিন
যখন কোন কাহিনী শোনাবেন সব সময় সে কাহিনীর চরিত্রগুলো পরিচয় দেবেন নাম জানিয়ে। ‘সে’ বা তারা না বলে ‘মিঃ ব্রাউন’ বা ‘মিঃ স্মিথ’ বললেও চলবে আসল নাম যদি জানাতে না চান। রুডলফ ফ্লেশ বলেছেন, কোন কাহিনীর বাস্তবতা তখনই সম্পূর্ণ হয় যদি নাম পরিচয় রাখা যায়। এমন কোন কাহিনীর কথা ভাবুন যার নায়কের কোন নাম নেই।
