‘আমি সব সময় প্রয়োজন ও ব্যবহারের চেয়ে দশ গুণ বেশি খবরাখবর জোগাড় করি; অল্প কিছুকাল আগে কথাটা বলেছিলেন জন গান্থার। জন গান্থার হলেন বিখ্যাত লেখক ভিতর থেকে দেখা’ সিরিজের বই লিখে তিনি বিখ্যাত হন। এই বইগুলো বেষ্ট সেলারের মর্যাদা পায় এই বই লেখার কাজের সবরকম খবর তাঁকে সংগ্রহ করতে হয়।
একবার কোন সময়ে কথাটার সত্যতা প্রমাণ হয়ে যায়। ১৯৫৬ সালে তিনি এক মানসিক হাসপাতাল নিয়ে ধারাবাহিক কিছু প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তিনি এজন্য মানসিক হাসপাতালে গিয়ে অধ্যক্ষের সহকারী আর রোগীদের সঙ্গেও কথা বলেন। আমার এক বন্ধু তাঁর সঙ্গে ছিলেন তিনি বলেছেন ওই কাজে তাদের অসংখ্যবার বারান্দা পার হয়ে ওপর নিচে ওঠানামা করতে হয়। অফিসে এসে মিঃ গান্থার গাদা গাদা রিপোর্ট, নোট, পরিসংখ্যান ইত্যাদি ঘাঁটাঘাঁটি করেন।
‘শেষ পর্যন্ত বন্ধুটি লিখেছিলেন : মিঃ গান্থার চারটি ছোট নিবন্ধ লেখেন, চমৎকার বক্তৃতার পক্ষে এগুলো অপূর্ব। যে কাগজে ওগুলো লেখা হয় তার ওজন ছিল বোধ হয় মাত্র কয়েক আউন্স। অথচ সেটা লিখতে মিঃ গান্থার যেসব কাগজপত্র ঘেঁটেছেন তার ওজন অন্ততঃ বিশ পাউণ্ড।’
মিঃ গান্থার জানতেন তিনি কি কাজ করছেন। তিনি এও জানতেন কোন কিছুই অবহেলা করলে চলবে না। এসব কাজে তিনি প্রাচীন অভিজ্ঞতা সারা মন প্রাণ ওই উদ্দেশ্যে ঢেলে দিয়েছিলেন।
আমার এক সার্জন বন্ধু আমায় বলেছেন : ‘তোমাকে দশ মিনিটেই শিখিয়ে দিতে পারি কি করে উপাঙ্গ বের করে ফেলা যায়। তবে কোন রকম গোলমাল হলে কি করণীয় সেটা শেখাতে আমার চার বছর লেগে যাবে।’ বক্তৃতার ব্যাপারেও ওই একই কথা : সব সময় এমনভাবে তৈরি থাকুন যাতে প্রয়োজনে কাজে লাগাতে পারেন আপনার জ্ঞান। এমনটা ঘটতে পারে পূর্ববর্তী কোন বক্তার মন্তব্যের ফলে বা আপনার বক্তৃতা শোনার পর কোন শ্রোতার প্রশ্ন।
আপনিও এই সঞ্চিত শক্তি আহরণ করতে পারবেন খুব তাড়াতাড়িই। যেদিন জনগণের সামনে বক্তৃতা করবেন তার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত শেখার কাজ ছাড়াবেন না। যে কোন সময় আপনার খবর সংগ্রহের কাজ চালাতে পারেন। মনেমনে আবার তা পর্যালোচনাও করে যাওয়া চাই। এর সবচেয়ে ভালো সময় বা অবকাশ হল আপনার অবসর মুহূর্ত–যেমন বাড়ি ফেরার সময় গাড়ি চালাতে চালাতে, বাসের জন্য অপেক্ষার সময়, পাতাল রেলে চলার ফাঁকে ইত্যাদি। এই রকম মুহূর্তেই আপনার মনে আপনার জানা তথ্য ঝিলিক মেরে যায়। আপনার অবচেতন মন আগে থেকেই আপনাকে তৈরি হতে সাহায্য করে যাবে।
বিখ্যাত বক্তা নর্মান টমাস যিনি তাঁর বিরোধী রাজনৈতিক শ্রোতাদের সশ্রদ্ধ নজর কেড়ে নিতেন, তিনি বলেছেন : কোন বক্তৃতা যদি গুরুত্বপূর্ণ করতে হয় তা হলে বক্তাকে তার বক্তব্য বিষয় বারবার মনে মনে আলোচনা করে যেতে হবে। তিনি আশ্চর্য হয়ে যাবেন কিভাবে অবসর সময়ে, কাগজ পড়ার ফাঁকে, রাস্তা চলার সময়, শুতে যাওয়ার সময় তাঁর মন নতুন নতুন নিদর্শনে আচ্ছন্ন হয়ে যায়। সাধারণ স্তরের কোন বক্তৃতার পরিণতি যা তাইই হয়, এটা হলো অসাধারণ চিন্তাভাবনারই প্রতিফলন আর বক্তব্য বিষয় সম্বন্ধে অসম্পূর্ণ ধ্যান ধারণার পরিণতি।
এ ধরনের প্রক্রিয়ায় আপনি যখন নিবিষ্ট থাকেন তখন আপনার মধ্যে জোরালো একটা আকর্ষণ জাগবে প্রতিটি শব্দ এবং বক্তব্যকে একটা কাগজে লিখে ফেলার। কখনও এমন কাজ করবেন না। কারণ এ রকম কিছু করে ফেললেই আপনার সন্তুষ্টি আসবে আর সেটাই আঁকড়ে ধরতে চাইবেন আপনি। এর অবধারিত পরিণতি হবে গঠনমূলক চিন্তাধারা আর কাজ করবে না। এর পরেও একটা আশঙ্কা থেকে যাবে–আর তা হল আপনার বক্তব্য কণ্ঠস্থ করতে চাইবেন আপনি। মার্ক টোয়েন এ ধরনের মুখস্থ করার সম্পর্কে বলেছেন : লিখিত বিষয় বক্তৃতার জন্য নয়, তাদের চরিত্র আর গঠন হল সাহিত্যমূলক। এ হল কঠিন, অনমনীয় আর জিভের আড়ষ্টতা এড়িয়ে স্পষ্ট উচ্চারণও সম্ভব হয় না। এর উদ্দেশ্য যদি হয় মনোরঞ্জন শেখানো তাহলে একে ভেঙে সহজ কথ্য ভাষায় এনে কথাবার্তার ভঙ্গীতে বলে যেতে হবে, না হলে তা শুধু শ্রোতাদের বিরক্তিই উদ্রেক করবে–তাদের মনোরঞ্জন করতে পারবে না।
চার্লস্ এফ. কেটারিং যার আবিষ্কারের প্রতিভায় নির্ভর করেই গড়ে ওঠে বিখ্যাত জেনারেল মোটরস প্রতিষ্ঠান। তিনি ছিলেন আমেরিকার একজন আদরের বক্তা। তাঁকে একবার প্রশ্ন করা হয় তিনি তার বক্তব্য লিখে রাখতেন কি না? তিনি জবাব দেন : আমার মনে হয় আমি যা বলতে চাই তা লেখার চেয়ে ঢের বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমি আমার শ্রোতাদের মনে সাড়া জাগাতে চাই, চাই তাদের আবেগে দাগ রাখতে। একখণ্ড কাগজ আমার আর আমার ইচ্ছার মাঝখানে পথ আটকে থাকতে পারে না।
লিঙ্কন কীভাবে বক্তৃতা তৈরি করতেন
লিঙ্কন কিভাবে তাঁর বক্তৃতা তৈরি করতেন? সৌভাগ্যবশত এটা আমাদের জানা, আর বিগত এক শতাব্দীর চার ভাগের তিন ভাগ ধরে তিনি যেভাবে মানুষকে মুগ্ধ করে রেখেছিলেন তা ডীন ব্রাউনের বক্তৃতাতে জানা গেছে। লিঙ্কনের অন্যতম বিখ্যাত বক্তৃতা হল যেটা তিনি ঋষিকল্প হয়ে ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলেন : যে গৃহের অধিবাসীরা নিজেরাই বিভক্ত তা কখনও টিকে থাকতে পারে না। আমি বিশ্বাস করি অর্ধেক ক্রীতদাস আর অর্ধেক মুক্ত অবস্থায় এ জাতিও টিতে থাকতে পারবে না। আব্রাহাম লিঙ্কন এই বক্তৃতাটি সারাক্ষণ মনে মনে পর্যালোচনা করে চলতেন। খাওয়ার সময়, পথ চলতে চলতে, বাগান পরিচর্যার সময়ও।
