ধপাস করে একটা চেয়ারে বসেই আর্তনাদ করে উঠল সে। আচ্ছা তুমি কেন বন্দরের মাঝখানে তোমার লঞ্চের নোঙ্গর ফেল? অন্য সবার মত কেন জেটির গায়ে বেঁধে রাখো না?
ঘামে তার কোটের বিভিন্ন জায়গা ভিজে বড় বড় ছাপ ফেলেছে। স্কিত মুখের ভাজ দিয়ে দর দর করে ঘাম ঝরছে। একটা লাল সিল্কের রুমাল বের করে সে ঘাম মুছলো। তারপর পানামা হ্যাটটা খুলে সেটা দিয়ে হাওয়া খেতে লাগল। সযত্নে আচোনো পমেড মাখা চুল চপ চপ করছে। তার কালো কুতকুতে চোখ জোড় ধূর্ততায় ভরে আছে।
কেইন তার হাতে একটা ড্রিংকস দিল। ইতোমধ্যে তুমি নিশ্চয়ই আমাকে চিনেছো। আমি এই হতচ্ছাড়া শহরের কাউকে বিশ্বাস করি না। বলতে পারো আমি আমার চারপাশে একটা পরীখা রাখাটাই শ্রেয় মনে করি।’
স্কিরোজ মাথা নাড়তে লাগল। পাগল আমেরিকান। তোমাকে আমি কখনো বুঝতে পারব না। গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে সাবধানে টেবিলে নামিয়ে রাখল। আমার বিশ্বাস সেলিমের সাথে তোমার সামান্য ঝামেলা হয়েছে।’
কেইন একটা সিগারেট ধরাল। আমি একে সামান্য বলবো না। আমি কেবল আমার বোট থেকে তাকে পানিতে ফেলে দিয়েছি। আচ্ছা কবে থেকে সে তোমার হয়ে কাজ করছে বলতো?’
স্কিরোজ কাঁধে একটা ঝাঁকি দিয়ে বেশ সময় নিয়ে কালো তেলতেলে একটা চুরুট ধরাল। মাঝে মাঝে আমি তাকে কাজে লাগাই। আবার প্রয়োজন পড়লে সে আমার হয়ে ভারতে জাহাজ নিয়ে যায়। আজ বিকেলে তাকে আমি এজন্য পাঠিয়েছিলাম, কারণ অন্য একটা ব্যাপারে আমি একটু ব্যস্ত ছিলাম।
কেইন ভ্রূ কুঁচকালো। “ঠিক আছে। ওকে আর কখনো পাঠিও না। আমি ওকে সহ্য করতে পারি না। এর আগে একবার ব্রিটিশ গান বোট ওর পিছু নিলে সে চারজন ক্রীতদাসকে উপসাগরে তিন মাইল গভীরে পানিতে ফেলে দেয়। তাদেরকে আমি উদ্ধার করি।’
স্কিরোজ কাঁধে ঝাঁকি দিয়ে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে এক হাত তুলে বলল। “আচ্ছা ঠিক আছে। বুঝলাম সে যেভাবে টাকা উপার্জন করে তা তোমার পছন্দ নয়। তবে একটা কথা মনে রেখো। আজ বিকেলে তুমি তার সাথে যে আচরণ করেছো, তোমার জায়গায় আমি হলে এখন থেকে সাবধান হতাম।
কেইন পানি নিরোধক পুটলিটা টেবিলে ঠেলে বলল, আচ্ছা এখন কাজের কথায় আসা যাক।
স্কিরোজ একটা ছুরি বের করে সতর্কতার সাথে পুটলিটা কাটতে শুরু করল। তোমার কোন সমস্যা হয়নিতো?’
কেইন মাথা নেড়ে বলল, মাঝরাতের পরপরই আমরা জায়গামতো পৌঁছে গিয়েছিলাম। তবে জাহাজটা দেরি করে আসে আর ও’হারা রোজকার মতো মাতাল হয়ে পড়েছিল। নিয়ন্ত্রণ গুপ্তর হাতে ছিল। সে আমাকে একটা নতুন খবর শোনালো।
কী সেটা?
‘ওরা ক্যাটালিনাকে সাগরের ত্রিশ মাইল গভীরে একটা পর্তুগিজ কার্গো জাহাজ থেকে মাল খালাস করতে দেখেছে।’
স্কিরোজ হেসে উঠল। “আচ্ছা তাহলে রোমেরোও হাত ময়লা করছে। বেশ ইন্টারেস্টিং! আচ্ছা আসার পর কাস্টমসে কোন সমস্যা হয়েছে?”।
কেইন বলল, সেখানে কোন সমস্যা হয়নি। গনজালেস লঞ্চে উঠেনি। শুধু শুধু তেলের টিনটা জাহাজের নিচে বেঁধে নিয়ে আসাটা কেবল সময়ের অপচয় হয়েছে।
স্কিরোজ মাথা নেড়ে বলল। এই কাজে কোন কিছুই সময়ের অপচয় নয়। হয়তো একদিন যখন তুমি মোটেই আশা করবে না তখন সে হয়তো নিয়ম মাফিক দায়িত্ব পালন করতে শুরু করবে।
কথা বলতে বলতে সে পুটলিটার উপরের আবরণ সরিয়ে এক বান্ডিল ভারতীয় রুপি বের করল।
স্কিরোজ টাকা গণনা শুরু করতেই কেইন মাথা নাড়তে লাগল। আমি কোনদিন তোমার এই ধান্দা বুঝতে পারবো না। ভারতে সোনা পাচার করে সেখান থেকে ভারতীয় রুপি স্মাগলিং করে আনা।
স্কিরোজ মৃদু হাসল। এটা হল বিনিময়ের বিষয়। আজকের এই আধুনিক জগতে টাকা কামানো আসলে খুবই সহজ। চুরি করার দরকার পড়ে না।
আবার তার সারা মুখ ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে উঠেছে। সে ব্যাংক নোটগুলোর উপর আলতো হাত রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আহা আমার বন্ধু, তুমি যদি জানতে টাকা আমার উপর কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ছয় মাস আগে যখন গোয়া থেকে এখানে চলে আসি তখন আমার ধারণা ছিল না এই জায়গাটা একটা সোনার খনির মত।
কেইন নিজের গ্লাসে আরেকটা ড্রিংকস ঢাললো। এই টাকার কিছুটা মাঝে মধ্যে খরচ করো না কেন?
স্কিরোজ কাঁধে একটা ঝাঁকি দিল। আমার জীবন শুরু হয়েছে উত্তর গ্রিসে একটা পাহাড়ি খামারে। সেখানে জমিতে মাটির চেয়ে পাথর বেশি। আমার মা পঁচিশ বছর বয়সেই বুড়ি হয়ে যান। আর এক বছর অনাবৃষ্টির কারণে ক্ষেতে ফসল ফলেনি। আমার দুই বোন অনাহারে মারা গেল। এই ঘটনা আমি কোনদিন ভুলতে পারব না। সেজন্য আমি বেঁচে আছি শুধু টাকা কামাবার জন্য। আমার ব্যাংক ব্যালেন্স স্ফিত হলেই আমি খুশি হই। একটা পেনি হাতছাড়া করতেও আমার মায়া লাগে।
কেইন এবার দাঁত বের করে হাসল। টাকার কথা যখন উঠলই তখন আমার পাওনাটা মিটিয়ে দাও। যদি কিছু মনে না করো সবসময়ের মতো ডলারেই দিও।
ফিরোজ আবার হেসে উঠতেই তার বিশাল দেহের মাংসপেশিগুলো কেঁপে উঠল। তবে আমি কিন্তু কখনো ভুলিনা তুমি হচ্ছো আমার এই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যাকে তোমরা বলে থাকো কিং পিন, তাই না?’
‘গ্যাস দেওয়া ছেড়ে এবার ক্যাশ বের করো।’ কেইন বলল।
স্কিরোজ একটা পেটমোটা ওয়ালেট বের করে একশো ডলারের নোটগুলো গুনতে শুরু করল। তার হাত ঘেমে উঠল আর বেশ অনিচ্ছা নিয়ে—- সে একটা একটা নোট টেবিলে রাখতে লাগল। বিশটা নোট রাখার পর একটু থেমে আরো পাঁচটা নোট তার সাথে যুক্ত করে বলল, এই নাও বন্ধু, আমাদের মাঝে চুক্তি হয়েছিল দুই হাজার। তবে আমি তোমাকে আরো পাঁচশো ডলার বোনাস হিসেবে দিলাম। কেউ যেন বলতে না পারে স্কিরোজ ভাল কাজের পুরস্কার দেয় না।’
