কিছু একটা বলে মোক্ষম জবাব দিতে চাচ্ছিল গ্রে। কিন্তু মনক তো একেবারে ভুল বলেনি। গ্রে আর র্যাচেলের যখনই দেখা হয় তখন একটুও রোমান্টিক সময় কাটাতে পারে না ওরা। বিছানায় যাওয়া এক ব্যাপার, সেটার আগে একটু ডেটিং করারও দরকার আছে। আর ঘাটতিটা সেখানেই।
তোমাকে আমি কতদিন ধরে চিনি? মনক প্রশ্ন করল।
প্রশ্নকে পাত্তাই দিল না গ্রে।
তখন থেকে এপর্যন্ত কতগুলো সিরিয়াস গার্লফ্রেন্ড হয়েছে তোমার? হাত দিয়ে বড় করে শূন্য এঁকে দেখাল মনক। এটা তোমার প্রথম সিরিয়াস গার্লফ্রেন্ড। আর এর সাথে তোমার আচরণের এরকম দশা। কার সাথে রিলেশন করছ তুমি, দেখেছ একবারও?
র্যাচেল তো খুব ভাল মেয়ে।
হোক। যাক, অবশেষে মুখ খুলছ দেখে ভাল লাগছে। কিন্তু বন্ধু, এরকম অসম্ভব পরিস্থিতি আর বাধায় থেকে কী ভালবাসা হয়?
কীসের বাধা?
আটলান্টিক সাগরটাই ধরো। তোমার আর তোমার রিলেশনের মাঝে দূরত্ব তৈরি করে বসে আছে। আবার তিন আঙুল দেখাল মনক। স্ত্রী, বন্ধন আর বাচ্চা।
তুমি প্রস্তুত নও, বলল মনক। আমি যখন ক্যাটের প্রেগন্যান্ট হবার কথাটা বললাম তখন তোমার চেহারার ভাব খেয়াল করেছি। ওখানে আতঙ্ক আর ভয় ছিল। যদিও বাচ্চাটা আমার। কিন্তু ভয়ে তুমি অস্থির।
গ্রের হৃদপিণ্ড একদম গলার কাছে এসে লাফাতে লাগল। ওর নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আঘাত পেয়েছে একদম মোক্ষম জায়গায়।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল মনক। তোমার সমস্যা আছে, বন্ধু। ওগুলো নিয়ে একটু কাজ করো। কীভাবে করবে সেটা তুমি জানো।
জেটের ইন্টারকম বেজে ওঠায় কিছু বলা থেকে বেঁচে গেল গ্রে।
আমরা আর আধা ঘণ্টা পর ল্যান্ড করব। পাইলট জানাল।
ল্যান্ড করার আগপর্যন্ত আমি এগুলো নিয়ে একটু ভে, জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বিড়বিড় করল গ্রে।
শুনে ভাল লাগল।
মনকের দিকে ফিরল ও। মনককে কড়া করে কিছু একটা বলতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, আমি র্যাচেলকে ভালবাসি।
সিটে হেলান দিল মনক। ঘোঁতঘোঁত করে বলল জানি তো। আর সেজন্যই ব্যাপারটা কঠিন।
.
সকাল ৭টা ০৫ মিনিট।
হুলুহুলুই-আমফলোজি প্রিজার্ভ।
চায়ে চুমুক দিল খামিশি টেইলর। যদিও চা-টায় মধু মেশানোয় বেশ সুস্বাদু হয়েছে। কিন্তু ও কোনো স্বাদ পেল না।
তাহলে মারসিয়ার বেঁচে থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই? পলা কেইন প্রশ্ন করলেন।
মাথা নাড়ল খামিশি। যা সত্য সেটা বলাই ভাল। প্রধান ওয়ার্ডেন ওকে বরখাস্ত করেছে বলে ও এখানে আসেনি। প্রিজার্ভের এক প্রান্তে থাকা নিজের এক রুমের বাসা থেকে জিনিসপত্র সরিয়ে নেয়ার জন্য এসেছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়ার্ডেনদের জন্য ওরকম ঘোট ঘোট বাসা বানিয়ে রাখা আছে এখানে। বরখাস্ত হয়েছে, তারপর যখন চাকরি একেবারে চলে যাবে তখন তো আর এখানেও থাকতে পারবে না। চাকরি চলে যাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার।
তবে সরাসরি বাসায় না ফিরে পলা কেইনের বাসায় এসে হাজির হয়েছে খামিশি। পার্কে যাওয়ার অর্ধেক রাস্তায় গবেষকদের জন্য নির্মিত অস্থায়ী বাসস্থান পাওয়া যায়। অর্থ যতদিন পর্যন্ত শেষ না হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত এখানে থাকবে গবেষকরা।
খামিশি বেশ কয়েকবার এই দোতলা বাসায় এসেছে। এখানে থাকা দুইজন গবেষকের কখনও অর্থাভাব হয়নি। আগেরবার পলা কেইনের এই বাসায় থাকার ১০ম বর্ষপূর্তি উদযাপনের জন্য এখানে এসেছিল খামিশি। হুলুহুলুই-আমলোজি-র বিজ্ঞান কমিউনিটিতে এই জন একদম চেনা মুখ ছিলেন।
কিন্তু এখন আছেন মাত্র একজন।
নিচু টেবিলের অপরপাশে থাকা ছোট্ট আসনে বসেছেন ড. পলা কেইন। তার চোখ ছলছল করলেও গাল এখনও শুকনো আছে।
ঠিক আছে। বললেন তিনি। দেয়ালে থাকা ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে সুখী জীবনের স্মৃতিগুলোর ওপরে চোখ বুলালেন। খামিশি জানে এরা দুজন অক্সফোর্ড থেকে পরিচিত। আমি খুব একটা আশা রাখিনি।
ছোটখাটো আকৃতির এই পলা কেইনের শরীর স্বাস্থ্য বেশ হালকা। চুলগুলো কালো, স্কয়ার কাট দিয়ে কাঁধ পর্যন্ত রাখা। খামিশি জানে এই মহিলার বয়স প্রায় ৬০ ছুঁই ছুঁই করছে, কিন্তু তাকে দেখতে আরও ১০ বছর কম মনে হয়। তার চেহারায় অন্যরকম সৌন্দর্য আছে, যেটা মেকি মেক-আপ দেয়া চেহারাগুলোকেও হার মানায়। কিন্তু আজ সকালে তার ভিন্ন চেহারা। নিজের ভূতুড়ে সংস্করণে হাজির হয়েছেন, চেহারা থেকে কিছু একটা চলে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে এই খাকি প্যান্ট আর ঢোলা সাদা ব্লাউজ পরেই ঘুমিয়েছিলেন তিনি।
তার মনের বেদনা দূর করার জন্য খামিশি কোনো উপযুক্ত শব্দ পেল না। শুধু সমবেদনা জানিয়ে বলল, আমি দুঃখিত।
ওর দিকে তাকালেন পলা। আমি জানি, আপনি আপনার সাধ্যমত চেষ্টা করেছেন। বাইরের আওয়াজ আমার কানে এসেছে। সাদা চামড়ার নারী মারা গেছে, কালো মানুষ বেঁচে আছে। এখানে বিষয়টা খুব একটা ভাল চোখে দেখা হবে না।
খামিশি বুঝতে পারল তিনি প্রধান ওয়ার্ডেন-এর কথা বলছেন। ওই লোকটির সাথে পলা ও মারসিয়ার বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎ হয়েছে। ওয়ার্ডেনের ব্যাকগ্রাউন্ড, জানাশোনা সম্পর্কে অন্যদের মতো তিনিও জানেন। তবে এখানে বর্ণবৈষম্য করলেও বনের ভেতরে তো আর সেটা চলে না। ওখানে সবাই সমান।
ওঁর মৃত্যুতে আপনার কোনো দোষ নেই। খামিশির চেহারার অভিব্যক্তি দেখে বললেন পলা।
খামিশি অন্যদিকে তাকাল। উনি ওকে বুঝতে পেরেছে ভেবে ওর ভাল লাগছে কিন্তু একই সাথে ওয়ার্ডেনের অভিযোগও দগ্ধ করছে ওকে। যৌক্তিকভাবে বিবেচনা করলে, ড. ফেয়ারফিল্ডকে বাঁচানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা ও করেছে। কিন্তু ঘটনা হলো, জঙ্গল থেকে ও বেঁচে ফিরতে পারলেও ফেয়ারফিল্ড পারেননি। আর সমস্যা এখানেই।
