Leprakonige
কুষ্ঠরোগী। পেইন্টার খেয়াল করল বিশালদেহী গানথার যতক্ষণ পর্যন্ত দৃষ্টিসীমার ভেতরে ছিল ততক্ষণ গার্ড কিছু বলেনি। গানথারের মুখের ওপর বলার সাহস নেই ওর। তবে গানখারের ঝুলে যাওয়া কাঁধ আর বদমেজাজি স্বভাব দেখে ক্রো আন্দাজ করল, সে এই কথা এর আগেও শুনেছে।
স্নোমোবাইলে চড়ে বসলেন অ্যানা। গানখারের সিটে এক নতুন গার্ড বসল। এর হাতেও রাইফেল আছে, ওদের দিকে তাক করা। আবার রওনা হলো সবাই।
একটু ঘুরে উঠে আরও গভীর গিরিসঙ্কটের দিকে যাত্রা করল ওরা। সামনের রাস্তা জুড়ে বরফ আচ্ছাদিত কুয়াশায় ভরা, নিচে কী আছে ঠিকমতো দেখা যায় না। কুয়াশার উপরে একটি পাহাড়ের ভারী শৃঙ্গ এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে দেখে মনে হচ্ছে, এই কুয়াশাকে আগুন ভেবে হাত সেঁকছে কেউ।
কুয়াশার সমুদ্রে ডুব দিল ওরা। হেডলাইট জ্বালিয়ে দিয়েছে।
কয়েক ফুটে নেমে এসেছে দৃষ্টিসীমা। তারাগুলো আর দেখা যাচ্ছে না।
তারপর হঠাৎ করে ওরা গভীর অন্ধকারে তলিয়ে গেল। মনে হলো, ওদের মাথার উপরে ছায়ার সামিয়ানা ঝুলছে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, এরকম অবস্থায় ঠাণ্ডার প্রকোপ না বেড়ে বরং কমতে শুরু করল। সামনে এগোতে গিয়ে দেখা গেল পাথুরে পাহাড়ের গায়ে আর বরফ নেই। বড় বড় পাথরের পাশ দিয়ে বরফগলা পানি গড়াচ্ছে।
পেইন্টার বুঝতে পারল ওরা কোনো এক প্রাকৃতিক উষ্ণ এলাকায় চলে এসেছে। উত্তাপের প্রাকৃতিক উৎস আছে এখানে। হিমালয়ের ভেতরে থাকা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বসন্তের কথা এখানকার খুব কম মানুষই জানে। ভারতীয় উপমহাদেশের ভূখণ্ডের নিচে থাকা প্লেটের চাপে এরকম প্রাকৃতিক উষ্ণ অঞ্চল তৈরি হয়ে থাকে। মনে করা হয়, এরকম অঞ্চল থেকেই সাংরি-লা পৌরাণিক কাহিনির জন্ম।
তুষার কমে যেতে থাকায় সোমোবাইল রেখে দিতে বাধ্য হলো ওরা। ওগুলো পার্ক করার পর লিসা আর পেইন্টারকে স্লেজ গাড়ি থেকে মুক্ত করে কব্জিতে হাতকড়া পরিয়ে দেয়া হলো। হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো ওদের। লিসার কাছাকাছি থাকল ক্রো। দুজনের চোখেই দুশ্চিন্তা।
কোথায় ওরা? এটা কোন জায়গা?
রাইফেল আর পারকাঅলা গার্ড দ্বারা বেষ্টিত হয়ে বাকি পথ এগোল ওরা। তুষারের বদলে ওদের পায়ের নিচে ভেজা পাথর উদয় হলো। পাথর কেটে সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে, বরফ গলা পানি গড়াচ্ছে এখানে। সামনে আর আগের মতো পুরু কুয়াশার চাদর নেই।
কয়েক পা এগোতেই সামনের আঘো অন্ধকারে একটি খাড়া পাহাড়ের মুখ দেখা গেল। পর্বতের আশ্রয়ে ওটার অবস্থান। প্রাকৃতিকভাবে তৈরি একটি গভীর গুহা। এটা কোনো স্বর্গউদ্যান নয়… জায়গাটি কালো গ্রানাইটে ভরপুর, গরমে ঘামছে ওগুলো।
সাংরি-লার চেয়েও বেশি গরম এখানে।
ক্রোর পাশে হোঁচট খেল লিসা। হাত বাঁধা থাকার পরও ক্রো যতদূর সম্ভব ওকে ধরে রাখার চেষ্টা করল। তবে ও বুঝতে পারল লিসা দুর্বলভাবে পা ফেলছে।
সামনে জলীয় বাষ্পের পর্দা ফুড়ে একটি ক্যাসলের (অট্টালিকা) উদয় হলো।
ঠিক পুরো না, তবে আধা ক্যাসল বলা যায়।
কাছে এগোতেই পেইন্টার বুঝতে পারল এটা অট্টলিকার সম্মুখভাগ। চলে গেছে একদম গুহার শেষ অংশ পর্যন্ত। কামান-গোলা নিক্ষেপের জন্য ছিদ্রবিশিষ্ট দুটো বড় টাওয়ার দাঁড়িয়ে আছে দুপাশে। মোটা কাঁচের জানালার পেছন থেকে আলো আসছে।
GranitschloB, ঘোষণা করলেন আনা। ওদের সবাইকে নিয়ে প্রবেশ পথের দিকে এগোলেন। তার চেয়ে দ্বিগুণ উচ্চতার গ্রানাইট বীরগণ প্রবেশ পথে দাঁড়িয়ে আছে।
কালো লোহার পাত দিয়ে মোড়ানো ভারী ওক কাঠের একটি দরজা প্রবেশপথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে। দলটি এগোতেই কপিকল উপরে উঠতে শুরু করে প্রবেশদ্বার খুলে দিল।
বড় বড় পা ফেলে এগোলেন অ্যানা। চলো সবাই। অনেক রাত হয়ে গেল।
অস্ত্রের মুখে প্রবেশদ্বারে ঢুকল লিসা ও ক্রো। গুহার ছাদ, কিনারা, পাঁচিল ও ধনুকাকৃতির জানালাগুলো পর্যবেক্ষণ করল পেইন্টার। পুরো মেঝেতে থাকা গ্রানাইট ঘেমে ভিজে উঠেছে। কালো তেলের মতো পানি গড়াচ্ছে। মনে হলো, এই ক্যাসল বোধহয় চোখের সামনে গলে কালো পাথুরে চেহারায় ফিরে যাচ্ছে।
কয়েকটি জানালা থেকে বের হওয়া আলো ক্যাসলের মেঝেকে নরকের মতো উজ্জ্বল করে তুলেছে। এই দৃশ্য দেখে ক্রোর হিরনিমাস বস-এর পেইন্টিঙের কথা মনে পড়ে গেল। পঞ্চদশ শতাব্দীতে এই শিল্পী নরকের বিভিন্ন ছবি আঁকার ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। যদি বসক-কে আন্ডারওয়ার্ল্ডের গেইটের ভাস্কর্য করতে দেয়া হতো তাহলে এই ক্যাসলের মতো করতেন তিনি।
অ্যানার পিছু পিছু ক্রো বাধ্য হয়ে এগোল। ক্যাসলের ধনুকাকৃতির প্রবেশদ্বারের নিচ দিয়ে প্রবেশ করল ওরা। উপরের দিকে তাকাল ক্রো। আন্ডারওয়ার্ল্ডের গেইটে থাকা দান্তের কথাগুলো হয়তো এখানে লেখা থাকতে পারে।
এখানে যে ঢুকবে তার আর কোনো আশা নেই।
কিন্তু কথাগুলো লেখা নেই এখানে… তবে এখানে কোনো আশাও নেই।
কোনো আশা নেই…
এই ক্যাসলে যে ঢুকবে তাদের আর কোনো আশা নেই।
.
রাত ৮টা ১৫ মিনিট।
কোপেনহ্যাগেন, ডেনমার্ক।
হোটেলে বিস্ফোরণের শব্দ মিলিয়ে যেতেই ফিওনার হাত ধরে দোকানের বাইরে বেরিয়ে এলো গ্রে। উৎসাহী জনতার ভিড় ঠেলে পাশের গলির দিকে রওনা হলো।
সাইরেনের আওয়াজ ভেসে এলো দূর থেকে।
আজ সারাদিনে কোপেনহ্যাগেনের দমকল কর্মীদের অনেক দৌড়াতে হলো।
