এখন কী আমার রুমে ফিরে যাবো?
কিন্তু ইসকির ঠাণ্ডা হাসির আওয়াজ ওর মনে পড়ে গেল। ডানপাশের আয়রন ও গ্লাস ডোরের ওদিক থেকে ইসকির ক্ষিপ্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো হঠাৎ।
কিছু একটা তাকে রাগিয়ে দিয়েছে।
তাড়াতাড়ি এগোল ফিওনা। কান পাতল দরজায়।
মাংস অবশ্যই রক্তাক্ত ও টাটকা হওয়া চাই! খেঁকিয়ে উঠল ইসকি। নইলে তোকে ওর ঘরে ঢুকিয়ে দেব!
বিড়বিড় করে কে যেন মাফ চাইল। দূরে সরে গেল পায়ের শব্দ।
কাঁচের সাথে আরও ভাল করে কান পাতল ফিওনা।
ভুল কাজ।
দরজা খুলতেই মাথায় আঘাত পেল ও। হনহন করে বেরিয়ে এলো ইসকি, একদম ফিওনার দিকে এগোল সে।
কনুই মেরে ফিওনাকে একপাশে সরিয়ে দিলো।
সাথে সাথে কাজ করল ফিওনা, ওর পুরোনো দক্ষতা কাজে লাগানোর সময় হয়েছে। নিজেকে সামলে নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল ও… খুব সাবলীলভাবে করায় মোটেও মেকি মনে হলো না বিষয়টা।
দেখে-শুনে চলবি! আগুন ঝরছে ইসকির কণ্ঠ থেকে।
Ja, maitresse, মাথা আরও নুইয়ে ফেলল ও।
সর সামনে থেকে!
ঘাবড়ে গেল ফিওনা। এবার ও কোথায় যাবে? ফিওনাকে এখানে দেখে ইসকি কী ভাবছে? ফিওনা এখানে কী করছিল। ইসকি এখনও দাঁড়িয়ে থাকায় দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়নি। ইসকিকে জায়গা করে দিয়ে ফিওনা একটু ভেতরে ঢুকে পড়ল।
লুকোনো টেজারে ফিওনার হাত চলে গেল কিন্তু একটু আগে ইসকির সোয়েটারের পকেট থেকে যে জিনিসটা চুরি করেছে সেটার জন্য দেরি হয়ে গেলো। ওর চুরি করার কোনো ইচ্ছে ছিল না কিন্তু হয়ে গেছে। বদঅভ্যাস। এখন এই দেরিটাই ওর কাল হলো। টেজার বের করার আগেই বড় বড় পা ফেলে চলে গেল ইসকি। ওদের দুজনের মাঝে আয়রন ও গ্লাসের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।
নিজের ওপরেই রাগ হলো ফিওনার। এবার কী হবে? এখান থেকে বের হওয়ার আগে ওকে কিছুটা সময় অপেক্ষা করা উচিত। ইসকির পেছন পেছন আবার রওনা হলে বিষয়টা অস্বাভাবিক দেখাবে। তবে ও জানে ইসকি কোনদিকে গেছে। লিফটের দিকে এগোচ্ছে সে। দুর্ভাগ্যবশত ফিওনা এই ভবনটা ভাল করে চেনে না। নইলে বিকল্প কোনো দিক দিয়ে গিয়ে ইসকিকে আক্রমণ করার চেষ্টা করতে পারতো।
ভয় আর হতাশায় কান্না পেল ওর।
ফিওনা সবকিছু এলোমেলো করে ফেলেছে।
অপেক্ষা করার ফাঁকে চেম্বারে নজর দিলো ও। ভেতরে উজ্জ্বল আলো জ্বলছে। ছাদে লাগানো কাঁচ দিয়ে প্রাকৃতিক আলো নামছে। বড় বড় স্তম্ভগুলো ঠেকিয়ে রেখেছে ছাদকে। চমৎকার তিনটা হল আছে। চার্চের মূল অংশের মতো দেখতে ওগুলো। একটা ক্রসের আকৃতি নিয়েছে।
কিন্তু এটা তো প্রার্থনার জায়গা নয়।
গন্ধ পেল ফিওনা। শবঘরে থাকা মৃতদেহের তীব্র দুর্গন্ধ। ঘোট ঘোট গোঙানি আর গর্জন ভেতরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। কৌতূহল জাগল ওর। সামনে এগিয়ে দেখল তিনটা সিঁড়ি দিয়ে নিচের মূল ফ্লোরে নামা যাবে। ইসকি যে ব্যক্তিকে একটু আগে ধমক লাগিয়েছে তাকে কোথাও দেখা গেল না।
ফিওনা রুম ঘুরে দেখতে শুরু করল।
বড় বড় খাঁচা দেখা যাচ্ছে। প্রত্যেকটার সামনে আয়রন ও গ্লাসের তৈরি ঝাঁঝরি দেয়া। দরজা বলে মনে হলো। খাঁচার ভেতরে বিশালাকৃতির প্রাণী দেখা যাচ্ছে। কয়েকটা শুয়ে বিশ্রাম করছে আর ঘুরছে ফিরছে বাকিগুলো। পায়ের হাড়ের ওপর হামলে পড়ে কামড়াচ্ছে একটা প্রাণী। এগুলো সব দানবাকৃতির হায়না।
তবে এখানেই শেষ নয়।
ফিওনা অন্য খাঁচায় ভিন্নরকম দানব দেখতে পেল। খাঁচার সামনের অংশে একটা গরিলা বসে আছে। ফিওনার দিকে সোজা তাকিয়ে আছে ওটা, দেখেই বোঝা যায় দানবটা মাথায় অনেক বুদ্ধি রাখে। তবে জঘন্য বিষয় হলো, মিউটেশনের ফলে গরিলার গায়ের লোমগুলো গায়েব হয়েছে। হাতির চামড়ার মতো ভাঁজ পড়া অবস্থায় গা থেকে ঝুলছে সেগুলো।
অন্য আরেকটা খাঁচায় একটা সিংহকে দেখা গেল। এদিক-ওদিক হাঁটছে ওটা। এটার গায়ে লোম আছে কিন্তু সেগুলোর সামঞ্জস্য নেই। কোথাও হালকা তো কোথাও জমাট বাঁধা। হাঁপাচ্ছে সিংহটা। চোখগুলো লাল। বড় বড় দাঁতগুলো বাইরে বেরিয়ে এসেছে। দাঁতগুলো কাস্তের মতো বাঁকা।
অন্যান্য খাঁচায় যেসব প্রাণী আছে সবটারই বৈশিষ্ট্য অস্বাভাবিক। ডোরাকাটা হরিণ যার শিং দুটো প্যাচানো, লম্বা টিংটিঙে শিয়াল, অদ্ভুত রঙের শূকর ইত্যাদি।
তবে এগুলোর মধ্যে ফিওনার কাছে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর লেগেছে দানবাকৃতির হায়নাকে। কামড়ে ধরা পায়ের দিকে তাকাল ও। বড় কোনো প্রাণীর পা হবে ওটা। বিশাল মহিষ কিংবা হরিণের। হাড়ের সাথে এখনও একটু কালো লোম আর মাংস লেগে রয়েছে। ওটা খেয়ে নিলে পুরো হাড় নগ্ন হয়ে যাবে। ফিওনা ভাবল, গ্রে যদি ওকে না বাঁচাতো তাহলে ওই হাড়ের জায়গায় হয়তো ওর শরীর থাকতো…
কেঁপে উঠল বেচারি।
দাঁতের শক্তি পরীক্ষা করার জন্য হায়নাটা কামড় দিয়ে হাড়কে ভেঙ্গে ফেলল। হাড় ভাঙ্গার আওয়াজটা হলো পুলি ছোঁড়ার মতো।
চমকে গিয়ে লাফিয়ে উঠল ফিওনা।
দরজার দিকে এগোল ও। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছে। যে মিশন নিয়ে এসেছিল সেটা ব্যর্থ হয়ে গেছে, এখন যেখান থেকে এসেছিল সেখানে ফিরে গিয়ে লুকিয়ে থাকবে।
দরজা ধাক্কা দিলো ও।
লকড।
তালাবন্ধ হয়ে গেছে।
.
দুপুর ২টা ৩০ মিনিট।
ভারি লিভারগুলোর দিকে তাকাল গ্রে। হৃদপিণ্ড যেন ওর গলায় উঠে এসেছে। ইলেকট্রিক্যাল বোর্ডের ভেতর থেকে মাস্টার সার্কিট সুইচ খুঁজে পেতে অনেক সময় লেগেছে ওর। ও জানে বড় ক্যাবলের ভেতর দিয়ে অনেক পাওয়ার সরবরাহ হচ্ছে। গলার কাছে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফোর্স অনুভূত হচ্ছে ওর।
