ও’ব্রায়েনের আঙুলের ফাঁকে ততক্ষণে একটি সংবাদপত্রের ছেঁড়া অংশ। সম্ভবত উইনস্টনের দৃষ্টিসীমার মধ্যে পাঁচ সেকেন্ডের মতো সেটি ধরা ছিল। এটি একটি ছবি, আর সেটি কিসের সে নিয়ে প্রশ্নেরই কোনো অবকাশ নেই। এ তো সেই ছবিটিই। জোন্স, অ্যারনসন ও রাদারফোর্ডের নিউইয়র্কের পার্টি অনুষ্ঠানের আরেকটি কপি, যা তার হাতেও পড়েছিল আর তাৎক্ষণিকভাবে স্মৃতিগহ্বরে ফেলে ধ্বংসও করে দিয়েছিল। চোখের সামনে মাত্র একবার দেখা গেল আর দ্রুতই তা দৃষ্টি থেকে সরে গেল। কিন্তু সে এটি দেখেছে, প্রশ্নাতীতভাবেই সে ওটা দেখেছে! শরীরের উপরের অংশটা সামান্য একটু নাড়ানোর ব্যথার্ত চেষ্টাই সে করল। কিন্তু কোনো একদিকেও এক সেন্টিমিটার পর্যন্ত নড়া সম্ভব ছিল না। এইক্ষণে ডায়ালটির কথাও ভুলে গেল সে। তার মনজুড়ে তখন একটাই ইচ্ছা, ওই ছবিটিকে আরো একবার যদি আঙুলের ফাঁকে পেয়ে যায়, নয়ত অন্তত একবার সেটি দেখতে পায়।
‘ওটি এখনো আছে!’—বিস্ময়ের প্রকাশ তার মুখে।
‘না, নেই’—বললেন ও’ব্রায়েন।
এবার কামরার ওদিকটায় হেঁটে গেলেন। উল্টোদিকের দেয়াল ঘেঁষে একটি স্মৃতি গহ্বর। ও’ব্রায়েন আস্তে করে ওপরের লোহার ঢাকনাটি তুললেন। আর দেখা না গেলেও ঠিক বুঝে নেওয়া যায়, কাগজের টুকরোটি ততক্ষণে তপ্তবায়ুর স্রোতে পড়ে খাবি খাচ্ছে আর আগুনের লেলিহান শিখায় তা ছারখার হয়ে যাচ্ছে। দেয়াল থেকে মুখ ঘোরালেন ও’ব্রায়েন।
‘স্রেফ ভস্ম’—বললেন তিনি। যে ভস্ম আর চিহ্নিত করারও নয়। এর কোনো অস্তিত্ব নেই, ছিল না কোনোকালেই। ’
‘কিন্তু এর অস্তিত্ব ছিল! অস্তিত্ব আছে! স্মৃতিতেই টিকে আছে এর অস্তিত্ব। আমার ঠিক স্মরণ আছে। আপনারও স্মরণে আছে। ’
‘কই আমার তো স্মরণে নেই’—বললেন ও’ব্রায়েন।
‘উইনস্টনের হৃদয়খানি অতল গহ্বরে তলিয়ে গেল। ওটাই দ্বৈতচিন্তা। ভীষণরকম অসহায়বোধ হতে লাগল তার। যদি নিশ্চিত হতে পারত ও’ব্রায়েন মিথ্যা বলছেন তাহলে সমস্যা ছিল না। কিন্তু এটাও সত্যিই সম্ভব, ও’ব্রায়েন ঠিকই ছবিটির কথা ভুলে গেছেন। আর তা যদি হয়, তাহলে তো এইমাত্র তিনি বিষয়টি মনে থাকার কথা যে অস্বীকার করলেন তাও ভুলে যাবেন, আর এই ভুলে যাওয়ার বিষয়টিও ভুলে যাবেন। কে কিভাবে নিশ্চিত হবে এসবই কূট-কৌশল? হতে পারে মনের এই মতিভ্রম সত্যিই ঘটে; আর এসব ভাবতে ভাবতে নিজেকে তার পর্যুদস্ত মনে হচ্ছিল।
ঠিক ওর দিকেই তাকিয়ে ও’ব্রায়েন, চাহনিতে কিছু একটা বোঝার চেষ্টা স্পষ্ট। পণ্ডিত মশাই ভাবটা অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে এখন বেশি বলেই মনে হলো তার। স্কুলে বেয়াড়া কিন্তু মেধাবী শিশু ছাত্রটির প্রতি শিক্ষক যেভাবে তাকান তেমনই।
‘অতীতের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে পার্টির একটা স্লোগান আছে’—বললেন তিনি। ‘দয়া করে আরেকবার বলবে। ’
‘অতীত যার নিয়ন্ত্রণে, ভবিষ্যতেরও নিয়ন্ত্রক তিনি: বর্তমান যার নিয়ন্ত্রণে, অতীতেরও নিয়ন্ত্রক তিনি’—বাধ্য ছেলের মতো আওড়ে গেল উইনস্টন।
‘বর্তমান যার নিয়ন্ত্রণে অতীতেরও নিয়ন্ত্রক তিনি’—মৃদু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন ও’ব্রায়েন। ‘এটা তোমার মত, উইনস্টন, তুমি বলতে চাও অতীতের সত্যিই অস্তিত্ব রয়েছে?’
একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ মনই কেবল বাস্তবতা দেখতে পায়, উইনস্টন। তুমি মনে করো বাস্তবতা বস্তুগত, বাহ্যিক, আর তার নিজের অধিকারে অস্তিত্ব পায়। তোমার এও বিশ্বাস বাস্তবতা স্ব-প্রমাণে ভাস্বর। যখন তুমি কোনো কিছু দেখতে পাচ্ছো বলে নিজেকে কোনো ভাবনায় মগ্ন করো, তখন তুমি ধরে নাও তুমি যেমনটা দেখছো, অন্যরাও তাই দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু আমি তোমাকে বলছি, উইনস্টন, বাস্তবতা বাহ্যিক কিছু নয়। বাস্তবতা মানুষের মনের মাঝে থাকে, আর কোথাও নয়।
আবারও একটা অসহায়বোধ উইনস্টনকে পেয়ে বসল। তার চোখ ডায়ালে স্থির হয়ে আছে। ব্যথা থেকে পরিত্রাণ পেতে ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’র কোনটা হবে উত্তর, সেটা কেবল জানে না তাই নয়, সে এও জানে না, এর মধ্যে কোন উত্তরটি সঠিক বলে সে নিজে বিশ্বাস করে।
ও’ব্রায়েনের মুখে মৃদু হাসি। ‘তুমি অধিবিদ্যায় বিদ্বান নও, উইনস্টন’—বললেন তিনি। ‘এই মুহূর্ত অবধি অস্তিত্ব বলতে কী বোঝায় তা নিয়ে তুমি কখনোই ভাবোনি। আমি বিষয়টি আরো সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরছি। অতীত কি সুনির্দিষ্টভাবে টিকে থাকে, মহাকাশে? অন্য কোথাও কিংবা আর কোনোখানে, এই পদার্থের বিশ্বে, যেখানে অতীত এখনও ঘটে চলেছে?’
‘না। ’
‘তাহলে কোথায় অতীতের অস্তিত্ব, যদি আদৌ তা থেকে থাকে?’
‘নথিতে। লিখিতভাবে। ’
‘নথিতে। আর—?’
‘মনে। মানুষের স্মৃতিতে। ’
‘স্মৃতিতে। খুব ভালো, তাহলে। আমরা, এই পার্টি, সব নথিই নিয়ন্ত্রণ করি, এবং আমরা সকল স্মৃতিও নিয়ন্ত্রণ করি। তাহলে আমরা অতীতকেও নিয়ন্ত্রণ করি, নয় কী?’
‘কিন্তু কোন পথে আপনারা মানুষকে অতীত মনে করা থেকে বিরত রাখতে পারবেন?’—ডায়ালের কথা এক মুহূর্তের জন্য বিস্মৃত হয়ে বেশ জোর কণ্ঠেই বলল উইনস্টন। ‘এটা স্বেচ্ছাকর্ম, নিজস্বতারও বাইরে। আপনি কী করে স্মৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করবেন? আপনি তো আমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি!’
ও’ব্রায়েনের চেহারা ফের কঠোর হয়ে উঠল। হাতটি ডায়ালের ওপর রাখলেন তিনি।
