তীব্র তারস্বরে ক্রোধান্বিত গর্জন বেরিয়ে এলো টেলিস্ক্রিন থেকে। চোয়ালবিহীন লোকটি লাফ মেরে নিজের আসনের সামনে। খুলিমুখো মানুষটি দ্রুতই দুটি হাত লুকিয়ে ফেললেন পিছনে, যেন গোটা বিশ্বকে দেখিয়ে দিতে চান, ওই উপহার তিনি নিতে চান নি।
‘বামস্টিড!’ গর্জে উঠল কণ্ঠস্বর। ‘২৭১৩ বামস্টিড জে.! রুটির টুকরোটি নিচে ফেলে দাও!’
চোয়ালহীন মানুষটি রুটির টুকরোটি মেঝেতে ফেলে দিলেন।
‘ঠিক যেখানে রয়েছো সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকো’—নির্দেশ কণ্ঠস্বরের। ‘দরজার দিকে মুখ করো, আর কোনো নড়াচড়া নয়। ’
ঠিক ঠিক মানলেন চোয়ালহীন লোকটি। তার বড় ঝুলে থাকা গালদুটি থরথর করে নিয়ন্ত্রণহীন কেঁপে চলেছে। ক্যাঁচ করে খুলে গেল দরজার পাল্লা। তরুণ কর্মকর্তাটি ভিতরে ঢুকেই পাশের দিকে সরে গেলে বিশাল বাহু আর কাঁধের এক ষণ্ডামার্কা নিরাপত্তারক্ষী ঢুকল। চোয়ালহীনের ঠিক সামনে ততক্ষণে দাঁড়িয়ে সে, আর তখনই, কর্মকর্তার ইশারা পেয়ে, শরীরের সব শক্তি দিয়ে চোয়ালহীন মুখটির ওপর কষে এক ঘুষি বসিয়ে দিল। ঘুষির চোটে লোকটি মেঝেতে পড়ে ছিটকে পায়খানার প্যানের সঙ্গে ধাক্কা খেলেন। হতভম্বের মতো কিছুটা সময় সেভাবেই পড়ে থাকলেন, মুখ আর নাক দিয়ে ততক্ষণে কালো ঘন রক্ত বেরিয়ে এসেছে। একটা অতি হালকা শব্দ গুমড়ে উঠল, অসচেতনতায় তা বেরিয়ে এলো লোকটির মুখ থেকে। এরপর হাত ও হাঁটুতে ভর দিয়ে অবিন্যস্তভাবে নিজেকে তুলে ওঠালেন। রক্ত আর লালা সমেত দুই পাটি দাঁত মুখ থেকে ঝরে পড়ল।
বাকি কয়েদীরা সবাই স্থির বসে আছে। প্রত্যেকের হাত হাঁটুর ওপর আড়াআড়ি করে রাখা। হামাগুড়ি দিয়ে চোয়ালহীন মানুষটি নিজের স্থানে ফিরলেন। মুখের নিচের দিকে একটি অংশে মাংস ততক্ষণে কালচে রঙ ধরেছে। ধীরে ধীরে পুরো মুখটি চেরি-রঙা একটি কদাকার রূপ নিল, যার ঠিক মাঝখানে একটি কালো গর্ত।
একটু পর পর কিছুটা রক্ত আলখেল্লার বুকের ওপর পড়ছে। তার ধূসর চোখ দুটো তখনও মুখ থেকে মুখে ফিরছে, তাতে আগের চেয়েও বেশি অপরাধের অভিব্যক্তি, যেন আবিষ্কারের চেষ্টা করে যাচ্ছেন তার এই অপদস্থতায় অন্যদের অবজ্ঞা কতখানি।
দরজা খুলে গেলো। সামান্য ইশারায় খুলিমুখো লোকটিকে নির্দেশ করলেন তরুণ কর্মকর্তা।
‘রুম ১০১’—বললেন তিনি।
উইনস্টনের দিকটায় একটা হাঁপানি আর ব্যাকুলতার শব্দ উঠল। লোকটি তার দুই হাত জোর করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন।
‘কমরেড! অফিসার!’—কান্না জুড়ে দিলেন তিনি। ‘আমাকে ওখানে নেওয়ার প্রয়োজন নেই! আমি তো আগেই আপনাদের সব বলেছি। এর বাইরে আর কী জানতে চান আপনারা? স্বীকার করে নেওয়ার মতো আর তো কিছুই নেই, কিচ্ছু না! আমাকে বলুন আর কী জানতে চান? আমি সোজা সব স্বীকার করে নেব। লিখে দিন আমি সই করে দেই—যা কিছু! কিন্তু ওই ১০১ নম্বর রুমে নেবেন না!’
‘রুম ১০১’—বললেন কর্মকর্তাটি।
লোকটির চেহারা ততক্ষণে ফ্যাকাশে হয়ে এমন রঙ ধরেছে যে উইনস্টনের কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকছে, এমনটা হতে পারে। নিশ্চিত আর নির্ভুলভাবে সে রঙটি ছিল সবুজাভ।
‘আমাকে নিয়ে যা মন চায় করুন’—চিৎকার করে উঠলেন লোকটি। ‘আপনারা আমাকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে না খাইয়ে রেখেছেন। এবার ক্ষ্যামা দিন, আমাকে মরতে দিন। আমাকে গুলি করুন, ফাঁসি দিন। পঁচিশ বছরের কারাদণ্ড দিন। আর কার কথা আপনারা আমার কাছে জানতে চান? বলুন কে? আপনারা যা চান আমি তাই বলব। কাউকে নিয়ে আর আমার চিন্তা নেই, কে তা নিয়েও আমি পরোয়া করি না। আমার এক স্ত্রী আর তিন সন্তান। সবচেয়ে বড়টির এখনো ছয় বছর হয়নি। আপনারা ওদেরও নিয়ে যেতে পারেন, আমার সামনেই ওদের জিহ্বা কেটে ফেলতে পারেন, আমি স্রেফ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখব। কিন্তু আমাকে ওই ১০১ নম্বর রুমে নেবেন না!’
‘রুম ১০১’—শীতল উচ্চারণ কর্মকর্তাটির।
ক্ষিপ্ত চাহনি দিয়ে কক্ষের অন্য কয়েদীদের বিঁধতে থাকলে লোকটি, চোখের ভাষা যেন বলছে, তার স্থানে এদের মধ্য থেকে আরেকজনকে পাঠিয়ে দিতে পারবেন কিনা সেটাই খুঁজছেন। এরপর চোখদুটি গিয়ে স্থির হলো চোয়ালহীন থেঁতলানো মুখটির ওপর। সব ক্ষোভ যেন তারই ওপর। ওর দিকে ক্ষীণকায় একটি বাহু ছুঁড়তে শুরু করলেন।
‘আমাকে নয়, তোমাদের উচিত ওঁকে নিয়ে যাওয়া!’—চিৎকার করে বললেন তিনি। ‘তোমরা শোনোনি, মুখখানি থেঁতলে দেওয়ার পর সে কী বলেছে। আমাকে বলতে দাও, ওর প্রতিটি শব্দ আমি তোমাদের বলে দেব। আসলে আমি নই, সেই হচ্ছে পার্টি বিরোধী। ’
নিরাপত্তা রক্ষীরা সামনে এগিয়ে এলো। লোকটির কণ্ঠ তীক্ষ্ণতর হলো, তোমরা শুনতে পাচ্ছো না আমার কথা! বারবার বলতে লাগলেন তিনি। ‘টেলিস্ক্রিনে কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। তোমরা আসলে আমাকে নয় ওকে নিতে চাচ্ছো। ওকেই নিয়ে যাও, আমাকে নয়!’
দুই রক্ষী লোকটির দুই বাহু লক্ষ করে এগিয়ে গেল আর ধরতে উদ্যত হলো। কিন্তু ঠিক তখনই মেঝেতে শুয়ে পড়লেন তিনি আর বেঞ্চিটির একটি লোহার পায়া দুই হাতে শক্ত করে ধরে ফেললেন। এবার কোনো কথা নেই। মুখ থেকে ভেসে আসছে পশুর মতো গোঙানির শব্দ। রক্ষীরা তাকে ধরে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে কিন্তু বিস্ময়কর শক্তি দিয়ে তিনি আঁকড়ে ধরে আছেন লোহার পায়া। সম্ভবত বিশ সেকেন্ড রক্ষীরা তাকে টানাটানি করল। বাকি কয়েদীরা মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন, যার যার হাত হাঁটুর ওপর আড়াআড়ি করে রাখা। প্রত্যেকেরই নিজ নিজ সম্মুখপানে দৃষ্টি। গোঙানি থেমেছে। ফাঁসিতে ঝোলানোর জন্য প্রয়োজনীয় নিঃশ্বাসটুকু ছাড়া লোকটির কাছে তখন আর অবশিষ্ট কিছুই নেই। এরপর শুরু হলো ভিন্ন রকমের কান্না। রক্ষীদের একজনের কষে মারা বুটের লাথিতে লোকটির একহাতের সবগুলো আঙুল ভেঙে গেল। এরপর তার পা ধরে ওরা দুজন তাকে টেনে হিঁচড়ে বের করল।
‘রুম ১০১’—বললেন কর্মকর্তাটি।
