‘যুদ্ধ’ নামের শব্দটি তাহলে নিজেই হয়ে পড়েছে বিভ্রান্তিকর। এটা বলা যথার্থ হতে পারে যে, টানা যুদ্ধের মানেই হচ্ছে যুদ্ধহীনতা। সেই নব্যপ্রস্তর যুগ থেকে শুরু করে বিংশ শতকের গোড়ার দিকটা পর্যন্ত যে অদ্ভুত চাপ মানব সন্তানের ওপর ফেলেছিল এই যুদ্ধ, তা আজ অতি ভিন্ন কিছু দিয়ে প্রতিস্থাপিত। তিন প্রধান রাষ্ট্র আজ যদি একে অন্যের বিরুদ্ধে অন্তহীন যুদ্ধ না করে তার পরিবর্তে অন্তহীন শান্তির সম্পর্কের দিকে যায়, প্রত্যেকেই যদি নিজেদের সীমারেখার ভেতরেও থাকে অলঙ্ঘিত তার প্রভাবও অনেকটা অভিন্ন হবে। তাহলেও প্রত্যেকেই হয়ে থাকবে এক স্বয়ংসম্পূর্ণ শক্তির বলয়, বাহ্যিক বিপদের পরিমিত প্রভাব থেকেও থাকবে সম্পূর্ণ মুক্ত। একটি সত্যিকারের স্থায়ী শান্তি প্রক্রিয়াও হবে স্থায়ী যুদ্ধের সম। এটাই—যদিও পার্টির অধিকাংশ সদস্য কেবল ভাসা ভাসা বুঝতে পারে—তারপরেও এটাই ইনার পার্টির স্লোগান: ‘যুদ্ধই শান্তি’র প্রকৃত অর্থ।
এক দণ্ডের জন্য পড়া থামাল উইনস্টন। ঠিক তখনই অনেক দূরে কোথাও সশব্দে রকেট বোমা পড়েছে। টেলিস্ক্রিনবিহীন একটি কক্ষে নিষিদ্ধ বই হাতে একাকীত্বের এই স্বর্গীয় অনুভূতিতে তা চিড় ধরাতে পারল না। একাকীত্ব আর নিরাপত্তার বোধ তার শরীর জুড়ে, তার সঙ্গে মিশে আছে শরীরের ক্লান্তি, কেদারার আরাম, জানালা বেয়ে আসা মৃদুমন্দ বাতাসের ছোঁয়া, যা খেলে যাচ্ছে তার গালের ওপর। বইটি তার মন কেড়েছে, অথবা আরো নির্দিষ্ট করে বলা চলে, দিয়েছে দৃঢ় আশ্বাস। এক অর্থে এ থেকে সে যা জানল তা তার কাছে নতুন কিছু নয়, কিন্তু আকর্ষণ করেছে ভীষণভাবেই। এখানে তাই বলা হয়েছে যা সেও বলে আসছে, তার বিক্ষিপ্ত চিন্তাগুলো একসঙ্গে করে সাজিয়ে বলতে পারলে তা হবে এই কথাগুলোই।
এও বলা চলে, যিনি লিখেছেন তিনিও তার মতোই এক অভিন্ন মননশীলতা ধারণ করেন, কিন্তু নিঃসন্দেহে লেখকের মনটি অনেক বেশি ক্ষমতাধর, অনেক বেশি গোছানো, অনেক কম ভীত-সন্ত্রস্ত। তার মনে হলো, সেরা বইগুলোতে আসলে তাই থাকে যা আপনি আগে থেকেই জানেন। পাতা উল্টে আবারও সে প্রথম অধ্যায়ে ফিরে গেল, ঠিক তখনই সিঁড়িতে শুনতে পেল জুলিয়ার পায়ের শব্দ। আর চেয়ার থেকে উঠে তাকে দেখার উদ্দেশে এগোলো। ঘরে ঢুকেই খাকি রঙের টুলব্যাগটি মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলল জুলিয়া আর নিজেকে উজিয়ে দিলে উইনস্টনের বাহুতে। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় পর যে দেখা হলো দুজনায়!
‘বইটি আমি হাতে পেয়ে গেছি’—প্রগাঢ় আলিঙ্গনে জড়াজড়ি করা অবস্থায় বলল উইনস্টন।
‘ও! পেয়ে গ্যাছো? খুব ভালো’—জুলিয়ার কণ্ঠে অনুচ্ছ্বাসের অভিব্যক্তি, আর দ্রুতই সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল তেলস্টোভে কফি বানাবে বলে।
বিছানায় তাদের আধাঘণ্টা কেটেছে এর মধ্যে আর বইয়ের বিষয়ে ফেরেনি কেউ। চাদর গায়ে জড়িয়ে শুয়ে থাকার জন্য যথেষ্টই ঠাণ্ডাময় এক সন্ধ্যা। নিচ থেকে ভেসে আসছে পরিচিত গান আর পাথুরে মেঝেতে বুটের শব্দ। সেই বাদামি রঙা লালবাহুর নারীটি যেন এই আঙিনার এক স্থায়ী চলমান মূর্তি। প্রথম যেদিন এসেছিল সেদিনই নারীটিকে দেখেছে উইনস্টন। মনে হয়, দিনের আলো যতক্ষণ থাকে ততক্ষণই কাপড় কাচার পাত্র থেকে শুকানোর রজ্জুর মাঝে চলে তার আসা-যাওয়া। কাপড় লটকানোর পেগগুলো মুখে নিলে মাঝে মাঝে থেমে যায় তার জোরালো গানের সুর।
জুলিয়া ততক্ষণে পাশ ফিরে ঘুমের প্রস্তুতিতে। মেঝেতে পড়ে থাকা বইটি হাতের নাগালে পেল উইনস্টন। সেটি তুলে নিয়ে শিথানের দিকে হেলান দিয়ে বসল সে।
‘আমাদের অবশ্যই এটা পড়া উচিত’—বলল সে। ‘তোমারও। ব্রাদারহুডের সকল সদস্যেরই এটা পড়া উচিত। ’
‘তুমি পড়ো’—বলল সে। ততক্ষণে তার দুচোখ বোজা। ‘একটু জোরে শব্দ করে পড়ো। সেটাই সবচেয়ে ভালো। পড়তে পড়তে তুমি আমাকে ব্যাখ্যা করেও বলতে পারবে। ’
ঘড়ির কাটা ছয়টার ঘরে, মানে সন্ধ্যা ছয়টা। তাদের হাতে তিন কিংবা চার ঘণ্টা সময় আছে। বইটি হাঁটুর ওপর রাখল সে আর পড়তে শুরু করল:
অধ্যায় ১
অবজ্ঞাই শক্তি
যতদিনের কথা নথিভুক্ত রয়েছে ততদিন ধরে, অথবা বলা যায় নব্যপ্রস্তর যুগের পর থেকেই পৃথিবীতে উচ্চ, মধ্য আর নিম্ন এই তিন শ্রেণির মানুষ বাস করে আসছে। এরা আরো নানাভাবে উপ-বিভক্ত হয়ে, ভিন্ন ভিন্ন অগুনতি নাম পেয়েছে, তাদের আপেক্ষিক সংখ্যা, একের প্রতি অন্যের আচরণ যুগে যুগে পাল্টেছে, কিন্তু সমাজের অপরিহার্য কাঠামোটি থেকে গেছে অপরিবর্তিত। বড় বড় অভ্যুত্থান আর আপাতদৃষ্টিতে অপরবর্ত্য পরিবর্তনের পরেও, এই একই ব্যবস্থা নিজের মতো করেই সমাজ কাঠামোয় আবার স্থান করে নিয়েছে, মাপযন্ত্রের কাটা যেভাবে এদিক-ওদিক করে প্রতিবারই একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় ফিরে আসে ঠিক তেমনি…
‘জুলিয়া জেগে আছো?’—বলল উইনস্টন।
‘হ্যাঁ, প্রিয়তম, আমি শুনছি। তুমি পড়তে থাকো। অসাধারণ এই লেখা। ’
সে পড়তে থাকল:
এই গোষ্ঠীগুলোর লক্ষ্য পুরোপুরোই পরস্পর পরাহত। উচ্চশ্রেণির লক্ষ্য হচ্ছে তারা যেমন আছে তেমনই থাকবে। মধ্য শ্রেণির লক্ষ্য উচ্চ শ্রেণিতে রূপান্তর। আর নিম্ন শ্রেণির লক্ষ্য হচ্ছে, যখন তাদের লক্ষ্য কিছু থাকে—কারণ নিম্ন শ্রেণির একটি বশ্যতার চরিত্র রয়েছে, তা দিয়ে তারা বোঝে শ্রম দিয়ে যাওয়াই তাদের কাজ ফলে নিজেদের জীবনের বাইরে কোনো কিছু আছে বলে যখন তখন ভুলে যায়—সকল ভেদাভেদ ভেঙ্গে দিয়ে এমন এক সমাজ নির্মাণ যেখানে সব মানুষই হবে সমান। এভাবেই ইতিহাসের ভাঁজে ভাঁজে একটি সংগ্রাম চলে এসেছে যার বাহ্যিক কাঠামোটি বারবার ছিল একই রকম। দীর্ঘকাল উচ্চ শ্রেণি নির্বিঘ্নভাবে ক্ষমতার একক ভাগীদার হয়ে থাক, কিন্তু খুব দ্রুত নতুবা কিছু পরে হলেও একটি সময় এসে যায় যখন এরা নিজেরাই নিজেদের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে অথবা হারিয়ে যায় তাদের শাসন পরিচালনার ক্ষমতা, অথবা উভয়ই। তখন মধ্যশ্রেণি তাদের হটিয়ে দেয়, আর নিম্নবিত্তদের পাশে টানে আর বলতে শুরু করে, তাদের সংগ্রামটিও স্বাধীনতা আর ন্যয় বিচারের জন্যে। আর মধ্যবিত্তরা যখন তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করে ফেলে তখনই তারা নিম্নবিত্তকে ফের তাদের পুরনো দাসত্বের অবস্থানে ঠেলে দেয়, আর তারা নিজেরা হয়ে ওঠে উচ্চবিত্ত।
