নির্বুদ্ধিতা, নির্বুদ্ধিতা, নির্বুদ্ধিতা! আবারও ভাবল সে। এক-দুই সপ্তাহর বেশি সময় এখানে আসা-যাওয়া করবে আর ধরা পড়বে না সেটা অচিন্তনীয়। আর এমনি নাকের ডগায় একেবারে নিজেদের করে একটা গোপন আস্তানা গেড়ে নেওয়া তাদের দুজনের জন্যই ভীষণ রকমের বাড়াবাড়ি। ওই ভাঙ্গা গির্জার ঘণ্টিঘরে দেখা হওয়ার পর আরেকটি মোলাকাত সত্যিই অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। ঘৃণা সপ্তাহ ঘনিয়ে আসার কারণে দিনের কর্মঘণ্টা বেড়ে গেল। এখনও একমাসের বেশি বাকি, তাও প্রস্তুতির বিশাল আর জটিল সব কর্মযজ্ঞ চলছে, ফলে সবারই বেশি সময় ধরে কাজ করতে হছে। অবশেষে একটি বিকেলে তাদের দুজনেরই দেখা করার ফুসরত মিলল। ঠিক করল ওই জঙ্গলেই ফের যাবে। এর ঠিক আগের সন্ধ্যায় রাস্তায় তাদের সংক্ষিপ্ত একটি সাক্ষাতের সুযোগ মিলল। আগের মতই ভিড়ের মধ্যে দুজন হাঁটছে। কিন্তু উইনস্টন জুলিয়ার দিকে তাকাচ্ছে না বললেই চলে। এরই মধ্যে খুবই ছোট্ট একটি চাহনিতে তার মনে হলো মেয়েটি আরও ফ্যাকাশে আরও মলিন হয়ে গেছে।
‘সবকিছুই বাতিল’—কথা বলার প্রথম সুযোগটি পেয়েই বিড়বিড় করে বলল জুলিয়া। ‘আমি বলছি, আগামীকালের কথা। ’
‘মানে?’
‘আগামীকাল বিকেলে। আমি আসতে পারছি না। ’
‘কিন্তু কেন?’
‘কারণ স্বাভাবিক! ব্যাপারটি এবার একটু আগেভাগে শুরু হয়ে গেছে। ’
ক্ষণিকের জন্য হলেও ভীষণ রাগ হলো উইনস্টনের। সে জানে গত একমাসে জুলিয়াকে পাওয়ার ক্ষেত্রে তার চাওয়ার ধরনগুলো পাল্টে গেছে। গোড়ার দিকে একটা ভোগের সুখাশক্তি কাজ করত। ওদের প্রথম দিনের ভালোবাসাবাসি ছিল স্রেফ ইচ্ছাপূরণ। কিন্তু দ্বিতীয়বারের পর বিষয়টি কেমন যেন ভিন্ন কিছু হয়ে উঠেছে। জুলিয়ার চুলের গন্ধ, ঠোঁটের স্বাদ, ত্বকের অনুভূতি সবকিছু যেন তার ভেতরে ঢুকে পড়েছে, অথবা ওগুলোই যেন তাকে ঘিরে থাকে। ও এখন তার জন্য হয়ে উঠেছে বড় প্রয়োজন, ওকে যে সে কেবল চায়, তা-ই নয়, মনে করে ওর ওপরই যেন তার সব অধিকার। তবে ঠিক এই মুহূর্তে ভিড়ের চাপই তাদের ঠেলে কাছাকাছি করে দিল আর দৈবক্রমে তাদের হাতেরও মিলন হলো। জুলিয়া তার আঙ্গুলের ডগায় উইনস্টনের হাতের তালুতে আঁকিবুকি করে যে ছোঁয়া দিল তাতে আহ্বান ছিল কিন্তু সে আহ্বান আকাঙ্ক্ষার নয়, ভালোবাসার।
তার ভেতরে ভাবনা কাজ করছে, যখন কেউ কোনও নারীর সঙ্গে বাস করে তখন এসব হতাশা স্বাভাবিক হয়েই ধরা দেয়, নিত্য ঘটনার অংশ হয়ে ওঠে, আর এখন এক গভীর উষ্ণতার অনুভূতি কাজ করছে, যা জুলিয়াকে নিয়ে তার ভেতরে এর আগে কখনওই হয়নি। তার মনে হচ্ছে অন্তত বছর দশেক ধরেই তাদের দাম্পত্য জীবন। তার মনে হচ্ছে অনেক আগে থেকেই তারা রাস্তায় হাত ধরাধরি করে হেঁটে আসছে, এখনকার মত গোপনে না, প্রকাশ্যে তারা রাস্তায় হাঁটে, দোকানে যায়, ঘর-গৃহস্থালির টুকিটাকি জিনিসপত্র কেনে।
তার আরও মনে হলো, একটি জায়গা যদি থাকত—যেখানে তারা একসঙ্গে থাকতে পারে, যেখানে কোনও বাধা থাকবে না, সংশয় থাকবে না, যখন চাইবে একসঙ্গে কাটাতে পারবে। এসব নিয়ে যখন ভাবছিল ঠিক তখনই নয়, ওর পরের দিন তার মাথায় মি. চ্যারিংটনের দোতলার কামরাটি ভাড়া নেওয়ার আইডিয়াটি এলো। কথাটি জুলিয়ার কাছে পাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সে রাজি হয়ে গেল, এতটা সহজে রাজি হবে বলে সে ভাবেও নি। তারা দুজনেই জানে এই সিদ্ধান্ত স্রেফ নির্বোধের পাগলামো। অনেকটা এমন যে, দুজনে মিলেই কবরের দিকে পা বাড়ালো। বিছানার কিনারায় পা ঝুলিয়ে বসে আজ আরও একবার সে ভালোবাসা মন্ত্রণালয়ের কয়েদখানাগুলোর কথা ভাবল। এমন অবধারিত ভীতি কী করেই কারও সচেতন মনে এমন আসা-যাওয়া করে—সে এক কৌতূহলেরই বিষয়।
এমনটাই। ভবিষ্যৎ এভাবেই নির্ধারিত। ৯৯’র পরে যেমন আসে ১০০ ঠিক তেমন নিশ্চয়তায় নির্ধারিত হয়ে আছে মৃত্যু। কারও পক্ষেই তা এড়িয়ে যাওয়ার নয়, কেউ কেউ চাইলে বড়জোর কিছুটা সময়ের জন্য স্থগিত করে রাখতে পারে। তবে কেউ যখন মৃত্যুর নিশ্চয়তা জেনেই যায় তখন আর এই বিরতিটা বাড়াতে চায় না, বরং যত তাড়াতাড়ি হয়ে যায় সেটাই কাম্য।
নিচের সিঁড়িতে দ্রুত বেয়ে ওঠা পায়ের শব্দ। আর তখনই কক্ষে জুলিয়ার সশব্দ উপস্থিতি। মোটা খাকি রঙের একটি টুলস-ব্যাগ হাতে, মন্ত্রণালয়ে মাঝে মধ্যেই ব্যাগটি ওর হাতে চোখে পড়েছে। একটু এগিয়ে গেল বাহুবন্দি করবে বলে, কিন্তু জুলিয়ার পক্ষ থেকে সমান সাড়া মিলল না, হতে পারে হাতের ব্যাগটিই তার কারণ।
‘আধা সেকেন্ড’—বলল সে। ‘আমি কী এনেছি একটু দেখাতে দাও। তুমি নিশ্চয়ই ওই ঘিনঘিনে ভিক্টরি কফি নিয়ে এসেছো। আমি ভেবেছিলাম তুমি এই কাজই করবে। ওগুলো তুমি এবার ছুঁড়ে ফেলতে পার, কারণ, আমাদের আর ওগুলোর দরকার হচ্ছে না। এগুলো দ্যাখো। ’
হাঁটু গেড়ে বসল জুলিয়া, ঝপ করে ব্যাগটি মেঝেতে রাখল, আর এর উপরের দিকে রাখা কতগুলো স্প্যানার আর স্ক্রু-ড্রাইভার তুলে আনলো। নিচে কতগুলো পরিষ্কার কাগজের প্যাকেট। প্রথম প্যাকেটটি উইনস্টনের দিকে এগিয়ে দিলে এক অদ্ভুত, অস্পষ্ট পরিচিত অনুভূতি বয়ে গেল তার ভেতর। ভেতরে ভারী বালুর মত ঝুরঝুরে কিছু একটা, যেখানেই চাপ পড়ছে, দেবে যাচ্ছে।
‘চিনি নিশ্চয়ই!’—বলল সে।
‘খাঁটি চিনি। স্যাকারিন, চিনি না। আর এখানে এক টুকরো রুটি… খাঁটি সাদা রুটি, আমাদের ওইসব ফালতু রুটি না… এই হলো ছোট এক পট জ্যাম… আর এটা হলো এক টিন দুধ… কিন্তু এটা দ্যাখো… এটা পেয়ে বেশ গর্বই বোধ করছি। বাইরে থেকে একটু পেঁচিয়ে নিতে হয়েছে, কারণ…’
