একই ধরনের কৌশল তারা নিয়েছে পিতৃ-মাতৃত্বের অভিব্যক্তিতে, মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কে। পরিবার ব্যবস্থা পুরোপুরি বিলোপ করে দেওয়া হচ্ছে না। বরং চাওয়া হচ্ছে বাবা-মা যেন তাদের সন্তানদের প্রতি স্নেহবাৎসল্যের সেকেলে মনোভাবটাই বহাল রাখেন। আর অন্যদিকে শিশুদেরকে অত্যন্ত প্রক্রিয়াগতভাবে করে তোলা হচ্ছে বাবা-মায়ের বিরোধী। মা-বাবার ওপর চরগিরি করে তাদের গোপন অসন্তোষ বা ব্যত্যয় থাকলে রিপোর্ট করে দেবে, এটাই শিক্ষা তাদের। এতে পরিবারগুলো হয়ে উঠছে থট পুলিশের বর্ধিতাংশ। এ এমন ব্যবস্থা যেখানে প্রতিটি মানুষ দিবা-রাত্রি প্রতিটি ক্ষণই চর পরিবেষ্টিত। যাদের তারা চেনে কিন্তু কিছুই বলতে পারে না।
হঠাৎই তার মনে আবার ভর করল ক্যথরিন। ক্যাথরিন যদি বোকা না হতো, তাহলে তার এসব অশুদ্ধবাদী মতগুলো ধরে ফেলত আর প্রশ্নাতীত ভাবেই তা থট পুলিশে জানিয়ে দিত। তবে এই মুহূর্তে তাকে মনে পড়ার সত্যিকারের কারণ এই বিকেলের খরতাপ, যা তার কপালে জমিয়েছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। যে ঘটনাটি ঘটেছিল, বরং বলা যায় ঘটতে গিয়েও ঘটতে পারেনি, সেটিই এখন জুলিয়াকে বলতে শুরু করেছে সে। এগারো বছর আগে সেটিও ছিল এমনই এক ঘাম ঝড়ানো বিকেল।
বিয়ে হয়েছে তখন মোটে তিন-চার মাস হবে। কেন্টের দিকে কোনও একটি এলাকায় কমিউনিটি চাঙ্গা করার কর্মসূচিতে গিয়ে দুজনই পথ হারিয়ে ফেলে। দলের অন্যদের চেয়ে মিনিট কয়েক পিছিয়ে পড়েছিল। কিন্তু একটা ভুল বাঁক নিয়ে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় দুজন। আর এক পর্যায়ে আবিষ্কার করে পুরোনো একটি চুনা পাথরের কোয়ারির পাশে দিয়ে যাচ্ছে তারা। দশ কিংবা বিশ মিটার নিচে বড় বড় পাথর দেখা যাচ্ছে। আশেপাশে কারও দেখা মিলছে না যে পথ জানতে চাইবে।
হারিয়ে গেছে এটা বুঝতে পেরে ক্যাথরিন বেশ অস্বস্তি বোধ করছিল। ভিড়-ভাট্টার বাইরে, এমনকি দলের সদস্যদের জটলার বাইরে গেলেই ওর মধ্যে একটা অপরাধ বোধ কাজ করতে থাকে। কত দ্রুত ফেরা যায় সেই ভাবনায় এদিক সেদিক পথের খোঁজ করছিল। তখনই উইনস্টনের চোখে পড়ল পাথরের ফাটল ফুঁড়ে গজিয়ে ওঠা গাছে গুচ্ছগুচ্ছ ঘাসফুল ফুটে আছে। একগুচ্ছ ফুলে আবার দুটি রঙের মিশ্রণ, কতকটা টকটকে লাল আর বাকিটা ইটরঙা যা একই মূল থেকে গজিয়ে গাছে ধরে আছে। এমনটা আর কখনওই চোখে পড়েনি তার। সে ক্যাথরিনকে ডাকল ফুলগুলো দেখার জন্য।
‘দ্যাখো ক্যাথরিন! এই ফুলগুলো দ্যাখো। ওগুলো একই মূল থেকে গজিয়ে উঠেছে। তুমি দেখতে পাচ্ছো, ফুলগুলোর যে দুটি ভিন্ন রঙ?’
ততক্ষণে ক্যাথরিন চোখ ঘুরিয়ে ফিরে যেতে ধরেও আবার ঘুরল, তবে চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ। তারপরেও সে পাথরের ফাটলটির দিকে তাকাল আর ঝুঁকে পড়ে দেখার চেষ্টা করছিল কী সে দেখাতে চাইছে। উইনস্টন ঠিক তার পেছনটাতে দাঁড়ানো। ক্যাথরিন যাতে পড়ে না যায় সে জন্য দুই হাতে তার কোমর ধরে রাখল। তখনই তার মাথায় এলো, কী দারুণ একা এখানে তারা দুজন। চারিদিকে কোনও মানবসন্তানের অস্তিত্ব নেই, একটি গাছের পাতাও নড়ছে না, এমনকি নেই কোনও পাখির ডাকও। এমন একটি স্থানে গোপন মাইক্রোফোন বসানো থাকার সম্ভাবনাও ক্ষীণ, আর যদি মাইক্রোফোন থাকেও তা শব্দই কেবল ধারণ করবে, আর কিছু নয়। প্রচণ্ডতম গরমে স্থির হয়ে থাকা এক বিকেল। তার মুখমণ্ডলেও জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। আর তখনই আরেকটি ভাবনা এসে মনের গহীনে আঘাত হানলো…
ওকে ধরে একটা ধাক্কা দিলে না কেন?’—প্রশ্ন জুলিয়ার। ‘আমি হলে দিতাম। ’
‘হ্যাঁ প্রিয়তমা, তুমি হলে দিতে। আমিও দিতাম, যদি আমি ঠিক এখন যেমন তখনও তেমনটি থাকতাম। অথবা আমি হয়ত দিতামই—আমি ঠিক নিশ্চিত নই। ’
‘কাজটি না করার জন্য এখন কি তোমার দুঃখবোধ হয়?’
‘হ্যাঁ, সবমিলিয়ে আমি কাজটি না করার জন্য দুঃখবোধই করি। ’
ধূলাকীর্ণ মেঝেতে ওরা পাশাপাশি বসে। জুলিয়াকে বাহুর কাছে টেনে আনলো সে। মাথাটি কাঁধের ওপর রাখল, কবুতরের বিষ্ঠার তীব্রতাকে হার মানিয়ে চুলের দারুণ গন্ধ এসে নাকে লাগল। তরুণী এই মেয়ে, ভাবল সে, জীবন থেকে এখনও তার অনেক কিছুই জানার আছে। এই মেয়ে জানে না, ভিন্ন মতের একটি মানুষকে খাদের মধ্যে ফেলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে কিছুই সমাধান হওয়ার নয়।
‘আসলে তাতে কিছু যেয়ে আসত না’—বলল সে।
‘তাহলে কাজটি না করার জন্য এখন তোমার দুঃখবোধ কেন?’
‘একটাই কারণ, আমি নেতিবাচকতার চেয়ে ইতিবাচকতাকেই বেছে নেই। এই যে খেলা আমরা খেলছি, এতে আমরা জয়ী হব না। তারপরেও কিছু কিছু পরাজয় রয়েছে যা অন্য পরাজয়ের চেয়ে অপেক্ষাকৃত ভালো, এটুকুই, আর কিছু না। ’
ওর কাঁধের ঝাকুনিতে এই কথায় তার দ্বিমতের প্রকাশই টের পেল সে। যখনই সে এ ধরনের কিছু বলে ও তার বিরোধিতা করে। ব্যক্তির হারই প্রকৃতির বিধান, এ কথা সে মানতে চায় না। একভাবে সে বুঝতেও পারে যে, সে নিজেই ভেঙ্গে গেছে, খুব শিগগিরই, নয়ত আরও পরে একদিন থট পুলিশ তাকে ধরে ফেলবে আর হত্যা করবে। কিন্তু তার মনের অপর অংশটি দিয়ে সে প্রাণপনে বিশ্বাস করতে চায়, কোনও না কোনওভাবে একটি গোপন জগত গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে তুমি তোমার মন যা চায় তাই করতে পারবে। মনে করে, এ জন্য প্রয়োজন স্রেফ ভাগ্যের সহায়, চাতুর্য আর দৃঢ়তা। সে বুঝতেই পারে না, সুখ বলে আর কিছু নেই, বিজয় যদি থেকেও থাকে তা এখনও সুদূরে, আপনার-আমার মৃত্যুর অনেক অনেক পরের বিষয়। এখন পার্টির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা, কল্পনায় নিজের মৃতদেহ দেখারই সামিল।
