ঘুমের মাঝে অসহায় যৌবনভরা এই শক্তসামর্থ শরীরখানা তার মধ্যে এক ধরনের করুণা জাগ্রত করল, যেন ওর সুরক্ষার দায়িত্ব তার। কিন্তু ঝোপের পেছনে দোয়েলের গান শুনতে শুনতে যে ভালোলাগাটুকু ছিল তা যেন আর পুরোপুরি ফিরে আসছে না।
পুরোনো দিনগুলোর কথা ভাবল সে, কোনও একটি পুরুষ একটি নারীর শরীরকে কামনার দৃষ্টি থেকেই দেখত, আর একেকটি কাহিনী কামনার তৃপ্তিতেই শেষ হতো। কিন্তু আজকাল আপনি আর নির্ভেজাল ভালোবাসা যেমন পাবেন না, নির্ভেজাল লালসাও তেমনি পাবেন না। এখন আবেগটাই খাঁটি, কারণ সবকিছুই আজ ভয় আর ঘৃণায় একাকার হয়ে গেছে। তাদের আলিঙ্গন ছিল এক যুদ্ধ, সঙ্গম ছিল সে যুদ্ধের জয়। এ ছিল পার্টির মুখে এক চরম আঘাত। আর নিঃসন্দেহে এ এক রাজনৈতিক কাজও বটে।
অধ্যায় ৩
‘আমরা এখানে আবারও আসতে পারি’—বলল জুলিয়া। ‘একেকটি গোপন স্থান দুইবার পর্যন্ত ব্যবহার চলে, তবে অবশ্যই এক-দুই মাসের মধ্যে না। ’
ঘুম ভাঙ্গার পর থেকে ওর আচরণটাই কেমন পাল্টে গেল। বেশ সতর্ক মনে হচ্ছিল, আর ভাবখানা এমন যেন কাজের কথার বাইরে কোনও কথাই তার পছন্দ নয়। কাপড় গায়ে চরাল, লাল পরিকর কোমরে বেঁধে নিল, আর কথা পাড়ল কিভাবে ফেরা হবে তা নিয়ে। এ দায়িত্ব যেন ওর ওপরই বর্তানো। তার মধ্যে কিছু একটা বাস্তব বুদ্ধিতা আছে, যা উইনস্টনের নেই। আর লন্ডনের আশেপাশের সবকিছু নিয়ে তার জ্ঞানের পরিধি যে বিশাল তাও স্পষ্ট। কমিউনিটি চাঙ্গা করার অসংখ্য কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে এই অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরেছে সে।
যে পথে এসেছিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত একটি ফেরার পথ বাতলে দিল তাকে, রেলস্টেশনটিও ভিন্ন। ‘যেই পথে বাইরে কোথাও যাবে সেই একই পথে কখনওই ঘরে ফিরবে না’—কথাটি এমন এক ভঙ্গিমায় বলল সে, যেন বাণী চিরন্তনীর কোনও এক গুরুত্বপূর্ণ নীতিবাক্য আওড়ালো। সে আগে যাবে, আর উইনস্টন ঘণ্টা আধেক অপেক্ষা করে বের হবে।
এই ফাঁকে কাজের শেষে অন্তত চারটি সন্ধ্যায় তাদের ঠিক কোথায় দেখা হতে পারে সেটাও জানিয়ে রাখল। গরীবদের আবাসন এলাকায় রাস্তার পাশের খোলাবাজারটি হবে তাদের পরের দেখা করার স্থান। সাধারণত লোকে লোকারণ্য হয়েই থাকে এই বাজার। বলে রাখল, ওখানে দোকানগুলোতে ঘুরে ঘুরে সে দেখতে থাকবে, যেন জুতোর ফিতে বা সুঁই-সুতো খুঁজছে। যদি তার মনে হয় পরিস্থিতি অনুকূলে, তাহলে উইনস্টন কাছে পৌঁছালেই নাকে শব্দ করবে, আর না করলে উইনস্টন থামবে না, না চেনার ভান করে তাকে অতিক্রম করে চলে যাবে। ভাগ্য সহায় হলে, ওই ভিড়-ভাট্টা আর শোরগোলের মধ্যে মিনিট পনের কথা বলে তারা পরের দেখা কোথায় হবে তা ঠিক করে নিতে পারবে।
‘এখন আমি যাই’—পুরো বিষয়টি উইনস্টন বুঝে নিতেই বলল সে। ‘আমাকে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার মধ্যে পৌঁছতে হবে। জুনিয়র এন্টি-সেক্স লিগের কাজ আছে। লিফলেট বিতরণসহ আরও কিছু কাজে রাতেই ঘণ্টা দুয়েক সময় দিতে হবে। তুমি আমার চুলগুলো একটু দেখ তো কিছু আটকে আছে কিনা? নিশ্চিত বলছো? তাহলে বিদায়, প্রিয়তম, বিদায়!’
একথা বলেই উইনস্টনের বাহুতে ঝাপিয়ে পড়ল সে, সহিংস একটা চুমু বসাল তার মুখে, আর পরমুহূর্তেই নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে চারাগাছের ভেতর দিয়ে গভীর জঙ্গলে অনেকটা নিঃশব্দে হারিয়ে গেল। এত কিছু হয়ে গেল, কিন্তু মেয়েটির ডাক নামটি জানা হলো না, জানা গেল না তার ঠিকানাও। তাতে অবশ্য কিছু আসে যায় না, কারণ তাদের কখনওই গৃহমাঝে দেখা হবে কিংবা চিঠি লিখে হবে কোনও ভাব বিনিময়—এমনটা হবার নয়।
বাস্তবে যা ঘটল, জঙ্গলের গভীরের ওই ফাঁকাস্থানে তাদের আর যাওয়া হয়নি। গোটা মে মাসে তারা আর মাত্র একবারই ভালোবাসাবাসি করার সুযোগ পেয়েছে। তা অন্য এক গোপন স্থানে, আর সেটিও ছিল জুলিয়ারই চেনা। গ্রামের দিকে অনেক নির্জন এলাকায়, বিধ্বস্ত একটি গীর্জার ঘণ্টিঘরে। বছর ত্রিশেক আগে ওই এলাকায় একটি আনবিক বোমা ফেলা হয়েছিল। গোপন স্থান হিসেবে অসাধারণ, তবে তা কেবল জায়গামত পৌঁছানোর পরেই। কিন্তু পৌঁছানোর পথটি ভয়াবহ বিপদের। এর বাইরে তাদের মাত্র দুই দফা দুটি ভিন্ন সড়কে সন্ধ্যার দিকে দেখা হয়েছে। আর, কোনও দেখাতেই আধাঘণ্টার বেশি সময় একসঙ্গে থাকা সম্ভব হয়নি। রাস্তায় কথা বলা চলে, কিন্তু মন ভরে না। যখন ওরা কোনও ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ে, তখন খুব যে পাশাপাশি থাকা যায়, তাও নয়। আর একজন অন্যজনের দিকে তাকায়ও না।
এরই মধ্যে তাদের কথাবার্তা এগোয় যা বাতিঘরের আলোর মত এই চলে এই বন্ধ হয়ে যায়। দলের ইউনিফর্ম পরা কারও দেখা পেলে কথা বন্ধ, কাছাকাছি টেলিস্ক্রিন থাকলে তো কথাই নেই। আবার যখন কয়েক মিনিট পরে কথার সুযোগ মেলে তখন আগের বাক্য যেখানে শেষ সেখান থেকেই শুরু হয়। আর এভাবে পরের দিন যখন দেখা হয় তখন আগের দিন যেখানে শেষ হয়েছিল সেখান থেকে কথা শুরু হয়। জুলিয়াকে মনে হয় এভাবে কথা বলায় বেশ অভ্যস্ত সে। এর একটা নামও দিয়েছে—‘কিস্তিতে কথা বলা’।
মেয়েটির আরেকটি অদ্ভুত দক্ষতারও পরিচয় মিলল। ঠোঁট না নাড়িয়ে অবিরাম কথা বলতে পারে সে। এভাবেই প্রায় একমাস দেখাদেখির পর স্রেফ একবার তারা একটি চুমু বিনিময় করতে পেরেছিল। সে রাতে ওরা একটি পার্শ্ব-সড়কে নীরবে হাঁটছিল (মূলসড়কে না থাকলে জুলিয়ার মুখ থেকে একটি শব্দও কখনও বের হয় না) তখনই কানে তালা লাগানো ভীষণ গর্জন শোনা গেল। মাটি কেঁপে উঠল, চারিদিক অন্ধকার হয়ে এলো। উইনস্টনের যখন সম্বিত ফিরল দেখল মাটিতে শুয়ে, কুঁকড়ে আছে, গা-ভর্তি আঘাতের ব্যথা। নিকটেই কোথাও রকেট বোমা পড়েছে। ঠিক তখনই কয়েক সেন্টিমিটারের মধ্যেই জুলিয়ার মুখটি দেখতে পেল সে, মৃত-সাদা রঙ ধরে আছে, যেন মুখটিতে চক ঘষে দেওয়া হয়েছে। এমনকি ওর ঠোঁট দুটোও সাদা। মনে হলো, মেয়েটি কি মরেই গেল! কাছে টেনে আনলো তাকে, আর আবিষ্কার করল সে এক জীবন্ত উষ্ণ ঠোঁটেই চুমু দিচ্ছে। এতে মেয়েটির ঠোঁটেও লেগে গেল সাদা পাউডারের মত কিছু একটা। আসলে তাদের দুজনেরই চেহারা পলেস্তারার ধুলোয় ঢেকে গিয়েছিল।
