তার দেশ যুদ্ধে লিপ্ত নয়, এমন কোনও একটা সময়ের কথা উইনস্টনের মনেই আসে না। তবে শৈশবে এক দীর্ঘ শান্তিবিরতির কথা খুব মনে পড়ে। শৈশবের যত স্মৃতি মনে আসে তার অন্যতম হলো বিমান হামলার এক বিভিষীকাময় দিন। সেদিন সবাইকে বিষ্মিত করে দিয়ে সে হামলা হয়েছিলো। হতে পারে কলচেস্টারে যেবার আনবিক বোমা পড়েছিলো, সেবারেরই ঘটনা। হামলার কথা তার ঠিকঠাক মনে নেই, তবে মনে আছে বাবা শক্তহাতে তার হাতটি ধরে আছেন আর ওরা সবাই মিলে দ্রুত নিচের দিকে নামে যাচ্ছিলো মাটির গভীর সুরঙ্গ পথ ধরে ঘোরানো প্যাঁচানো একটি সিঁড়ি বেয়ে। পায়ের তলার সিঁড়িতে ধপধপ শব্দ হচ্ছিলো। আর সে এতই কাহিল হয়ে পড়েছিলো যে কান্না জুড়ে দিয়েছিলো। এক পর্যায়ে তারা কিছুক্ষণ থেমে জিরিয়েও নেয়। মা তার চিরাচরিত ধীর আর স্বাপ্নিক ভঙ্গিমার হাঁটাচলায় ঠিক কুলোতে পারছিলেন না ফলে তাদের চেয়ে অনেক পিছনে পড়ে গিয়ে এগুচ্ছিলেন। তার কোলে শিশু ছোটবোনটি- অথবা হতে পারে স্রেফ একটি কম্বলের বস্তা কাঁখে করেই তিনি নামছিলেন সেই সিঁড়ি বেয়ে। তার নিশ্চিত করে মনে পড়ে না, সে সময় তার ছোট বোনটির জন্ম হয়েছিলো, নাকি হয়নি। অবশেষে তারা একটি স্থানে গিয়ে পৌঁছালো, সেখানে ভীষণ শোরগোল আর হাজারো মানুষের ভীর। তার মনে পড়ে ওটি সম্ভবত একটি টিউব স্টেশনই ছিলো।
পাথর বসানো মেঝেতে বসে ছিলো অনেকে, কয়েকজন করে ঠাসাঠাসি হয়ে কতগুলো ধাতব মঞ্চকের ওপর বসেছিলো, একজনের ওপর দিয়ে আরেকজন। উইনস্টন ও তার বাবা-মা মেঝেতেই একটি স্থান বেছে নিয়েছিলো। আর তাদের কাছেই একটি মঞ্চকে পাশাপাশি বসেছিলো এক বৃদ্ধ আর এক বৃদ্ধা।
বৃদ্ধ লোকটির অভিজাত কালো স্যুট পরা, মাথায় কালো কাপড়ের ক্যাপটি পেছনের দিকে ঠেলে দেওয়া। তাতে তার ধবধবে সাদা চুলগুলো দেখা যাচ্ছিলো। চেহারাটা ছিলো লালচে, আর চোখ দুটো নীল, অশ্রু ছলছল। জিনের গন্ধ নাকে লাগছিলো। মনে হচ্ছিলো লোকটির শরীর থেকে ঘাম নয় জিনের গন্ধ ছড়ায়। আর তার চোখ থেকে যে অশ্রু বেরিয়ে আসছে তাও খাঁটি জিন ছাড়া কিছুই নয়। মদিরার প্রতিক্রিয়ায় কিছুটা ঝিম ধরে থাকলেও লোকটির কষ্ট স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিলো, যা মোটেই সহ্য করা যাচ্ছিলো না। উইনস্টন তার শিশুমন দিয়েই তখন বুঝে নিয়েছিলো ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটে গেছে এই বৃদ্ধের জীবনে। এমন কিছু যা ক্ষমার অযোগ্য, আবার সে ক্ষতি কোনো কিছু দিয়েই পূরণ হবারও নয়। তার কাছে এও মনে হচ্ছিলো যে সে বুঝতে পেরেছে ঠিক কি হয়েছে। বস্তুত বৃদ্ধ লোকটি যাকে খুব ভালোবাসতো- হতে পারে তার ছোট্ট নাতনিটি, সে সম্ভবত মারা গেছে। কয়েক মিনিট পরপরই বৃদ্ধ লোকটি একটি কথাই বলছিলেন: ‘ওদের বিশ্বাস করা আমাদের উচিত হয়নি। আমি পই পই করে বলেছিলাম, বলো বলিনি? ওদের বিশ্বাস করেই আজ এই ফল হলো! আমি তো গোড়া থেকেই বলেছি। আমাদের এই পায়ুকামীগুলোকে বিশ্বাস করা উচিত হবে না।’
ওদের ঠিক কোন পায়ুকামীদের বিশ্বাস করা উচিত হয়নি উইনস্টন এখন তা আর মনে করতে পারে না।
আক্ষরিক অর্থে অনেকটা সেই সময় থেকেই যুদ্ধটা চলছে। তবে সত্যি বটে, যুদ্ধটা সবসময় একই রকম ছিলো না। তার ছেলেবেলায় মাসের পর মাস লন্ডনের রাস্তায় রাস্তায় যখনতখন সংঘর্ষ বেঁধে যেতো, এর কোনো কোনোটির কথা স্পষ্ট মনে পড়ে উইনস্টনের। তবে পুরো সময়ের ইতিহাস ঘেঁটে, কে ঠিক কখন কার সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিলো তা বলা অসম্ভব। কারণ কোনো লিখিত দলিল নেই, নেই কোনো বলে রাখা কথাও। ঠিক এখন যে যুদ্ধ চলছে তার বাইরে আর কোনও কিছুর কথাই কখনো উচ্চারিত হয় না। এই সময়ে, এই ১৯৮৪ সালে (যদি এটা ১৯৮৪ সাল হয়ে থাকে) ওশেনিয়া ইউরেশিয়ার বিরু্দ্ধে যুদ্ধে রত আর ইস্টেশিয়ার সঙ্গে তার মিত্রতা। কোনও সরকারি কিংবা ব্যক্তিগত উচ্চারণে কখনো কি স্বীকার করা হবে যে একদা এই তিন শক্তির সম্পর্কটি ছিলো ভিন্ন ধারায়। উইনস্টন ভালো করেই জানে, মাত্র চার বছর আগে ওশেনিয়ার যুদ্ধ ছিলো ইস্টেশিয়ার বিরুদ্ধে আর ইউরেশিয়া ছিলো মিত্রশক্তি। তবে এ নিতান্তই এক গোপন জ্ঞান, যা সে ঘটনাক্রমে ধারন করছে, কারণ তার স্মৃতি সন্তোষজনকভাবে নিয়ন্ত্রিত নয়। অংশীদারীত্বের এই পরিবর্তন কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে হয়নি। ওশেনিয়া ইউরেশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে; মানেই হচ্ছে ইউরেশিয়ার বিরুদ্ধে তার যুদ্ধ সবসময়ের। এখন যার সঙ্গে তার শত্রুতা, সেই শত্রুতাই শেষ কথা। তার সঙ্গে সন্ধি না ভবিষ্যতে সম্ভব হবে, না অতীতে সম্ভব ছিলো।
কাঁধ দুটি ব্যাথাতুর করে তুলে পিছনের দিকে ঠেলে দিলো উইনস্টন (পশ্চাৎদেশের ওপর দুই হাত চেপে ধরে কোমড়ের উপরের অংশের গোটা শরীর মোচড়ানোর এক ধরনের ব্যায়াম পীঠের পেশিগুলোর জন্য উত্তম) আর তখন সম্ভবত দশ সহস্রতমবারের মতো তার মনে হলো, আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে, এ সব সত্য হতে পারে কিন্তু পার্টি যদি তার হাত অতীত পর্যন্ত বিস্তৃত করে, আর বলে দেয়, এমনটা কখনোই ঘটেনি- তাহলে নিশ্চিতভাবেই তা হবে এই সামান্য নির্যাতন বা মৃত্যু চেয়েও ভয়াবহ।
পার্টি বলছে ওশেনিয়া কখনোই ইউরেশিয়ার সঙ্গে জোট বাঁধেনি। আর সে, উইনস্টন স্মিথ, ভালো করেই জানে, ওশেনিয়া মাত্র চার বছর আগেই ইউরেশিয়ার মিত্র ছিলো। কিন্তু সে জানার অস্তিত্ব কোথায়? তা কেবলই তার সচেতনতায়, যা যেভাবেই হোক যথাশীঘ্র ধ্বংস করে দেওয়া হবে। আর যদি অন্য সবাই দলের চাপিয়ে দেওয়া মিথ্যা মেনে নেয়- যদি সকল নথিপত্র একই গল্প বলে- তাহলে এই মিথ্যাই ইতিহাসে পর্যবসিত হবে আর তা সত্য বনে যাবে। দলের স্লোগান বলে, ‘অতীত যার নিয়ন্ত্রণে…ভবিষ্যতেও তার নিয়ন্ত্রণ’, ‘বর্তমান যার নিয়ন্ত্রণে, অতীতেও নিয়ন্ত্রণ তারই’। তবে অতীত কখনোই পাল্টায় না। আজ যা সত্য তা চিরদিনের জন্যই সত্য। খুবই সহজ এ সত্য প্রতিষ্ঠা। যা প্রয়োজন, তা হচ্ছে অব্যাহতভাবে আপনার নিজের স্মৃতিকে জয় করে চলা। ‘বাস্তবতাকে নিয়ন্ত্রণ’ যাকে নিউস্পিকে ওরা বলে ‘দ্বৈতচিন্তা’।
