তখন সর্প বলল, তাই নাকি? এই বাগানের সব গাছের ফল খেতে ঈশ্বর তোমাদের তাহলে নিষেধ করেছেন?
নিষ্পাপ ঈভ তখন বলল, এই বাগানের মধ্যে এই একটিমাত্র গাছের ফল ছাড়া আর সব গাছের ফল আমরা খেতে পারি। ঈশ্বর শুধু বলেছেন এ গাছের ফল তোমরা খাবে না বা স্পর্শ করবে না। তাহলে তোমাদের মৃত্যু ঘটবে।
এই কথা শেষ হতে না হতে সর্পরূপী শয়তান একই সঙ্গে মানবজাতির প্রতি ভালবাসা এবং ঈশ্বরের অন্যায়ের প্রতি এক ঘৃণামিশ্রিত ক্রোধের ভাব দেখাল। তারপর প্রাচীন এথেন্স বা রোমের কোন কুশলী বাগ্মীর মতো কোন ভূমিকা না করেই আবেগের সঙ্গে বলতে লাগল, হে পবিত্র প্রজ্ঞাসম্পন্না, জ্ঞানদাত্রী বৃক্ষলতা, সকল জ্ঞানবিজ্ঞানের জননী, এখন আমি তোমার শক্তি আমার সমস্ত অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করতে পারছি। তোমার প্রসাদে শুধু জাগতিক সমস্ত বস্তু ও ঘটনার কারণ জানতে পারা যায় না, তোমার দ্বারা যাদের আমরা পরম জ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ বলে মনে করি সেই স্বর্গবাসী দেবতাদের জীবনযাত্রাপ্রণালী ও কর্মপদ্ধতির বা রীতিনীতিরও অনেক কিছু জানতে পারি আমরা।
হে বিশ্বজগতের রানী! বিধাতার কঠোর বিধানজনিত মৃত্যুর ভয় তুমি করো না। ও বিধানে বিশ্বাস করো না। মৃত্যু তোমার হতে পারে না। কেন মরবে তুমি? ঐ ফল খেয়ে? বরং তুমি ঐ ফল ভক্ষণ করে প্রভাপূর্ণ এক নবজীবন লাভ করবে। আমার দিকে একবার তাকিয়ে দেখ, আমি ঐ ফল স্পর্শ করে ও ভক্ষণ করে এখনো বেঁচে আছি। শুধু তাই নয়, বিধির বিধানে যে জীবন আমি লাভ করেছিলাম তার থেকে পূর্ণতর এক জীবন লাভ করেছি। আমি আমার বিধিনির্দিষ্ট সীমাকে লঙঘন করে ঊর্ধ্বে হাত বাড়িয়ে চেষ্টা করে এ জীবন লাভ করেছি। যে জ্ঞান পশুর কাছে উন্মুক্ত তা কি মানুষের কাছে রুদ্ধ থাকতে পারে? মৃত্যুযন্ত্রণার ভয়ের গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ ছিল যে জ্ঞান, অদম্য নির্ভীক প্রচেষ্টার দ্বারা সে জ্ঞান তুমি লাভ করবে, ঈশ্বর তোমার উপর ক্রুদ্ধ হবেন না, বরং তোমার গুণের প্রশংসা করবেন, বরং তিনি স্বীকার করবেন, মৃত্যু যে পদার্থই হোক, তার যন্ত্রণা যত দুঃসহই হোক, তার দ্বারা নিবারিত না হয়ে তুমি সেই পরম বস্তু লাভ করেছ যা তোমাকে দেবে বৃহত্তর সুখের সন্ধান, যা দেবে ভালমন্দের পরম জ্ঞান। শুধু ভালর জ্ঞানই যথেষ্ট নয়, যা কিছু মন্দ বা অশুভ, যা জীবনে একটি অতি বাস্তব ও অপরিহার্য ঘটনা, তার জ্ঞান যদি আমরা লাভ করতে না পারি তাহলে কেমন করে তাকে পরিহার করি বলতো?
সুতরাং ঈশ্বর তোমার কোন ক্ষতি করতে পারেন না, বরং তিনি ন্যায়সম্মত আচরণ করবেন। ঈশ্বর যদি ন্যায়পরায়ণ না হন তাহলে তিনি ঈশ্বরই নন। তাহলে কেন কে ভয় করবে? কেন তাঁকে মান্য করে চলবে? তোমার এই অর্থহীন মৃত্যুভয়ই অন্য সকল ভয় দূরীভূত করে দিচ্ছে।
একবার ভেবে দেখতো, এই ফল কেন নিষিদ্ধ হয়? কেন ভীতি প্রদর্শন করা য়? তুমি তার ভক্ত ও উপাসিকা হলেও নে তোমাকে নীচু ও অজ্ঞ করে রাখা হবে? তিনি জানেন যেদিন তুমি ঐ ফল ভক্ষণ করবে সেদিন তোমার ঐ ম্লান চক্ষুদুটি পরিষ্কার ও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে এবং তুমি তখন দেবতাদের মতোই ভাল-মন্দ সব কিছুই জানতে পারবে। আমি যেমন পশু হলেও অন্তরের দিক থেকে মানুষের গুণ লাভ করেছি, মানুষের মতো কথা বলতে পারছি তেমনি মানুষ হয়েও তুমি দেবতাদের গুণ লাভ করবে। তাদের সব জ্ঞানের অধিকারিণী হবে। আর তাতে যদি তোমার মৃত্যুও ঘু অহলে সে মৃত্যুর অর্থ হবে তোমার এই মানবজীবন ও মানবদেহ ত্যাগ করে দৈবজীবন লাভ করা। সে মৃত্যু মোটেই খারাপ হবে না। দেবতাদের এমন কি গুণ আছে যা মানুষ লাভ করতে পারবে না? মানুষ তো দেবতাদেরই দেহের অনুরূপ। দেবতাদের খাদ্য তারাও কেন গ্রহণ করতে পারবে না?
তাছাড়া আমরাই দেবতাদের বড় করে দেখি। আমাদের বিশ্বাস তারা আমাদের থেকে শ্রেষ্ঠ। তারাই সব কিছু সৃষ্টি করে, দান করে। এই শ্রেষ্ঠত্বের সুযোগ নেয় তারা।
কিন্তু আমি এসব বিশ্বাস করি না। এই সুন্দর পৃথিবীতে সূর্যালোক পতিত হয়ে সব বস্তু সৃষ্টি করে, স্বর্গলোকে তা করে না। ঈশ্বর বা দেবতারাই যদি সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা, তাহলে ভালমন্দের জ্ঞানসমন্বিত এই জ্ঞানবৃক্ষ কে সৃষ্টি করল? যে বৃক্ষের ফল খেয়ে দেবতাদের অনুমতি ছাড়াই সব জ্ঞান লাভ হবে সে বৃক্ষ সৃষ্ট হলো কেন এবং কার দ্বারা? মানুষ যদি জ্ঞান লাভ করে, ভালমন্দের কারণ জানতে পারে, তবে তাতে অপরাধ কোথায়? তাতে ঈশ্বর বা দেবতাদেরই বা কি ক্ষতি হবে? আর সকল বস্তুই যদি ঈশ্বরের দ্বারা সৃষ্ট হয়, তাঁর বিধান মেনে চলতে বাধ্য হয় তাহলে এই বৃক্ষ কি শুধু অর সে বিধানের বাইরে? এ বৃক্ষ তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেনই বা নিষিদ্ধ ফল দান করে? এখানে কোন বাধা নেই। আমি তো ইচ্ছামতো সে ফল তুলে খেয়েছি। এই বৃক্ষ তো আমায় বাধা দেয়নি। কোন অসম্মতি প্রকাশ করেনি। তবে কি শুধু মানবজাতির প্রতি ঈর্ষাবশতই ঈশ্বর এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন? কিন্তু ঈর্ষা ঈশ্বরের মনে থাকবে কেন? যিনি সমস্ত গুণের আকর তিনি ঈর্ষার মত একটি কুটিল দোষকে লে পোষণ করে রাখবেন আঁর বুকে?
সুতরাং গেমার এই সুন্দর ফলভক্ষণের যে প্রয়োজন আছে সে প্রয়োজন সিদ্ধ করার পিছনে অনেক কারণ অনেক যুক্তি আছে। অতএব হে মানবরূপিণী দেবী, তুমি অবিলম্বে ঐ ফল অবাধে ভক্ষণ করে।
