এখানে কল্পনা করা হয় যে রেখাচিত্রের প্রত্যেক সমান্তরাল রেখা এক হাজার বংশ সূচিত করে, কিন্তু প্রত্যেকে দশ লক্ষ বা আরও বেশি বংশ সূচিত করতে পারে; এটি দেহাবশেষ সমেত পৃথিবীপৃষ্ঠের পর্যায়ক্রমিক স্তরগুলির একটিকেও সূচিত করতে পারে; যখন আমরা ভূতত্ত্বের অধ্যায়ে আসব তখন পুনরায় এ বিষয়ে উল্লেখ করব, এবং তখন। আমরা দেখব যে রেখাচিত্রটি বিলুপ্ত জীবদের বংশগত মিলের ওপর আলোকপাত করে, যদিও এরা এখন জীবিতদের সঙ্গে একই বর্গ, গোত্র বা গণগুলির সাধারণতঃ অন্তর্ভুক্ত হয়, তবুও এরা প্রায়শই কিছুমাত্রায় বর্তমানের গোষ্ঠীদের বৈশিষ্ট্যের মধ্যবর্তী হয়; এবং আমরা বিষয়টি বুঝতে পারি, কারণ বিলুপ্ত প্রজাতিরা সূদূর অতীতের বিভিন্ন যুগে বেঁচেছিল, যখন উদ্ভবের শাখারেখাগুলি কম ভিন্নমুখী হয়েছিল।
এখনকার ব্যাখ্যামতো কেবল গণগুলি সৃষ্টি করতে রূপান্তর প্রক্রিয়ার সীমারেখা নির্ধারণ করার কোন যুক্তি আমি খুঁজে পাই না। রেখাচিত্রটিতে, আমরা যদি কল্পনা করি যে অপসারণশীল বিন্দুখচিত রেখাদের প্রত্যেক পর্যায়ক্রমিক গোষ্ঠী দ্বারা সূচিত পরিবর্তনের পরিমাণ বিরাট হয়, তাহলে a14 থেকে p14, b14 ও f14 এবং o14 থেকে m14 চিহ্নিত আকাররা তিনটি অতিশয় ভিন্ন গণ সৃষ্টি করবে। আমরা (A)-এর বংশধরদের থেকে ব্যাপকভাবে ভিন্ন (I) থেকে উদ্ভূত দুটি ভিন্ন গণ দেখে থাকব। গণেদের এই দুটি গোষ্ঠী রেখাচিত্রে সূচিত অপসারী রূপান্তরের পরিমাণ অনুযায়ী এভাবে দুটি ভিন্ন গোত্র বা বর্ণ গঠন করবে। এবং দুটি নূতন গোত্র বা বর্গ মূল গণের দুটি প্রজাতি থেকে উদ্ভূত হয়েছে, এবং এরা আরও প্রাচীন ও অজ্ঞাত কোন আকার থেকে উদ্ভূত হয়েছে বলে মনে হয়।
আমরা দেখেছি যে প্রত্যেক দেশে বৃহত্তর গণগুলির অন্তর্গত প্রজাতিরাই প্রায়শ ভ্যারাইটি অথবা জায়মান প্রজাতিদের সৃষ্টি করে। বাস্তবিকপক্ষে এটিই অবশ্য করা যায়, কারণ অস্তিত্বের সংগ্রামে অন্য আকারদের ওপর কিছু পরিমাণ প্রাধান্য বিস্তারকারী একটি আকারের ওপর প্রাকৃতিক নির্বাচন যেহেতু ক্রিয়াশীল হয়, সেহেতু এটি সেইগুলির ওপরেই মূলতঃ ক্রিয়া করে যেগুলি ইতিমধ্যেই কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় আছে এবং যে কোন গোষ্ঠীর বিরাটত্ব থেকে বোঝা যায় যে তার অন্তর্গত প্রজাতিগুলি একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে কিছু সাধারণ উন্নতির সুফল বংশগতভাবে পেয়েছে। অতএব নূতন ও রূপান্তরিত বংশধরদের উদ্ভব বা সৃষ্টির সংগ্রাম মূলতঃ বৃহত্তর গোষ্ঠীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, যারা সকলে সংখ্যায় বৃদ্ধি পেতে চেষ্টা করছে। একটি বিরাট গোষ্ঠী ধীরে ধীরে অন্য বিরাট গোষ্ঠীকে জয় করবে, তার সংখ্যা হ্রাস করবে এবং এভাবে তাদের আরও পরিবর্তন ও উন্নতির সম্ভাবনা হ্রাস করবে। একটি বিরাট গোষ্ঠীর মধ্যে, পরের ও আরও নিখুঁত উপ-গোষ্ঠীরা শাখায় বিভক্ত হয়ে, প্রকৃতিমণ্ডলের অনেক নূতন স্থান দখল করে, অনবরত পূর্বেকার ও কম উন্নত উপ-গোষ্ঠাদের স্থানচ্যুত করতে ও ধ্বংস করতে চেষ্টা করবে। ছোট ও ভঙ্গিল গোষ্ঠী এবং উপ-গোষ্ঠীরা অবশেষে বিলুপ্ত হবে। ভবিষ্যতের দিকে লক্ষ্য রেখে আমরা ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারি যে যারা এখন বিরাট ও বিজয়ী এবং যারা সামান্যতমও ভেঙ্গে যায়নি, অর্থাৎ যাদের বিলুপ্তির সম্ভাবনা কম জীবজগতের এমন গোষ্ঠীরা দীর্ঘদিন ধরে সংখ্যায় বৃদ্ধি পেতে থাকবে। কিন্তু কোন্ কোন্ গোষ্ঠী অবশেষে প্রাধান্য বিস্তার করবে তার ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব নয়, কারণ আমরা জানি যে পূর্বের অতি-উন্নত অনেক গোষ্ঠী এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আরও দূরের ভবিষ্যতের দিকে তাকালে, আমরা ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারি যে বৃহত্তর। গোষ্ঠীদের নিরবচ্ছিন্ন ও নিয়মিত বৃদ্ধির জন্য অসংখ্য ক্ষুদ্রতর গোষ্ঠী সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হবে এবং কোন রূপান্তরিত বংশধর রেখে যাবে না; ফলস্বরূপ, যে কোন যুগে জীবিত প্রজাতিদের মধ্যে অল্প কয়েকটি অদূর ভবিষ্যতে বংশধর রেখে যাবে। শ্রেণী বিভাগ অধ্যায়ে এ বিষয়ে আমাকে ফিরে আসতে হবে, কিন্তু এখানে আমি আরও বলতে পারি যে এই মতানুসারে যেহেতু আরও আদিম প্রজাতিদের অতি অল্প কয়েকটি বর্তমান। কাল পর্যন্ত বংশগতভাবে বংশধর প্রেরণ করেছে এবং যেহেতু একই প্রজাতির সমস্ত বংশধররা একটা শ্রেণী সৃষ্টি করে, তাই আমরা বুঝতে পারি কেমন করে এটি হয় যে প্রাণী ও উদ্ভিদ জগতের প্রত্যেক প্রধান বিভাগে এত অল্প কয়েকটি শ্রেণী রয়েছে। আদিম প্রজাতিদের কয়েকটি যদিও রূপান্তরিত বংশধর রেখে গেছে, তথাপি ভূতাত্ত্বিক যুগের বহু অতীতে সমগ্র পৃথিবী বর্তমান সময়ের মত অসংখ্য গণ, গোত্র, বর্গ ও শ্ৰেণীদের . প্রজাতি দ্বারা প্রায় পরিপূর্ণ হয়ে থাকতে পারে।
জৈবসংগঠনের উন্নতির প্রবণতার মাত্রা
প্রত্যেক জীব সারা জীবন ধরে জৈব ও অজৈব পরিবেশের প্রভাবাধীন থাকার ফলে উপকারী পরিবৃত্তিগুলির সংরক্ষণ ও সঞ্চয়নের মাধ্যমে প্রাকৃতিক নির্বাচন কাজ করে। সর্বশেষ ফলটি এই হয় যে প্রত্যেক জীব তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আরও বেশি বেশি করে উন্নত হওয়ার চেষ্টা করে। সারা পৃথিবী জুড়ে বিরাট সংখ্যক জীবের দেহগঠনের ক্রমশঃ উন্নতি ঘটাতে অনিবার্যরূপে প্রভাবিত করে। কিন্তু আমরা এখানে একটি অতি জটিল বিষয়ে প্রবেশ করেছি, কারণ দেহগঠন বা জৈব সংগঠনের অগ্রগতির অর্থ কী, সে বিষয়ে প্রকৃতিবিদরা পরস্পরের সন্তুষ্টির জন্য কোন সংজ্ঞা নির্ধারণ করেননি। মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে বোধশক্তির মাত্রা ও দেহগঠন মানুষের নিকটবর্তী হওয়াটা স্পষ্টতঃ একটি ভূমিকা পালন করে। ভাবা যেতে পারত যে ভূণাবস্থা থেকে পূর্ণাবস্থায় এদের ক্রমবিকাশের জন্য বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের পরির্তনের পরিমাণই তুলনামূলক বিচারের একটি পর্যাপ্ত মান হবে। কিন্তু কোন কোন পরজীবী খোলকী প্রাণীদের সম্পর্কে কয়েকটি ঘটনা রয়েছে, এদের দেহের কয়েকটি প্রত্যঙ্গ এত অসম্পূর্ণ যে পূর্ণবয়স্ক প্রাণীটিকে তার লার্ভার তুলনায় উচ্চ পর্যায়ের বলা যেতে পারে না। ভন বেয়ারের মানদণ্ডটিই সম্ভবতঃ সবচেয়ে ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য ও সর্বোৎকৃষ্ট, সেটি হচ্ছে পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় একই জীবের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের প্রভেদের পরিমাণ এবং ভিন্ন ভিন্ন প্রক্রিয়ার জন্য তাদের বিশিষ্টতা; অথবা মিলনে এডওয়ার্ড যেমন বলেন সেটি হচ্ছে শারীরবৃত্তীয় শ্রমবিভাগের সম্পূর্ণতা। কিন্তু আমরা দেখব এই বিষয়টি কতটা অস্পষ্ট। যেমন হয় মাছগুলিকে লক্ষ্য করলে। এদের মধ্যে কিছুকে কয়েকজন প্রকৃতিবিদ উচ্চস্তরের বলে অভিমত ব্যক্ত করেন, এরা আবার হাঙ্গরের মতো উভচরদের কাছাকাছি; অন্যদিকে অন্য প্রকৃতিবিদরা সাধারণ অস্থিময় অথবা টেলিয়োস্টিয়ান মাছেদের উচ্চ শ্রেণীভুক্ত করেছেন, কারণ এরা অতি সঠিকভাবে মাছের মতো ও অন্য মেরুদণ্ডী শ্রেণীদের থেকে অতিশয় ভিন্ন। উদ্ভিদদের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় এই বিষয়টির অস্পষ্টতা আরও বেশি। এদের বুদ্ধির মান নিশ্চয় সম্পূর্ণরূপে বর্জিত হয়েছে এবং কয়েকজন উদ্ভিদবিজ্ঞানী সেই সব উদ্ভিদদের উচ্চ পর্যায়ভুক্ত করেছেন, যাদের প্রত্যেক ফুলের প্রত্যেক অঙ্গ, যেমন বৃত্যাংশ, পাপড়ি, পুংকেশর, স্ত্রীকেশর সম্পূর্ণভাবে বিকশিত হয়েছে; অন্যদিকে অন্য উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা, সম্ভবতঃ যাঁরা আরও সঠিক, সেই সব উদ্ভিদদের উচ্চ শ্রেণীভুক্ত করেছেন যাদের অঙ্গ অতিশয় রূপান্তরিত হয়েছে ও সংখ্যায় হ্রাস পেয়েছে।
